.
০৩.
সত্যনারায়ণ এদেশের লৌকিক দেবতা। মুসলিম প্রভাবেই এ দেবতার উদ্ভব। শাসিত হিন্দুশাসক মুসলমানের প্রীতি ও প্রসন্নদৃষ্টি লাভের বাঞ্ছবশে এ দেবতা সৃষ্টি করেছে। মুসলমানেরা এঁকে পীরের মর্যাদা দিতে দ্বিধা করেনি। আসলে প্রমূর্ত সত্যই (Truth) সত্যনারায়ণ তথা সত্যপীর। সত্যপীরের পূজা-শিরনী উপলক্ষে এদেশের দুঃখী জনগণ এক মিলন-ময়দানে একত্রিত হতে চেয়েছে, খুঁজেছে দুর্যোগে-দুর্ভোগে যন্ত্রণায়-নির্যাতনে নিশ্চিত আশ্রয়,জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা। সত্যনারায়ণ মূলত মুসলমান পীর, সে কারণে অবাঙালি,–এ ধারণা ছিল হিন্দুমনে বদ্ধমূল। তাই সতেরো শতকে কবি কৃষ্ণরামদাস যখন রায়মঙ্গল (১৬৮৭) রচনা করেন, তখন দক্ষিণরায়ের প্রতদ্বন্দ্বী বড় খা গাজী এবং উভয়ের মান্যজন সত্যনারায়ণের উক্তিতে ভাঙা হিন্দুস্তানী ও বিকৃত বাঙলা ব্যবহার করেন তিনি। পাত্রপাত্রীর শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী সংলাপের ভাষা প্রয়োগ নাটকের বিশেষ আঙ্গিক। কৃষ্ণরামদাসের রায়মঙ্গলে এই নাট্যরীতির অনুসরণ ছিল! তাঁর প্রদর্শিত রীতি প্রায় নিষ্ঠার সাথে অনুসরণ করেছেন সত্যনারায়ণ পাঁচালির পরবর্তী রচয়িতারা। ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ প্রমুখ কবি বিদ্যাসুন্দর কাব্যেও মাধবভাটের জবানিতে এমনি ভাষা প্রয়োগ করেছেন, যখন মাধবভাট বিদ্যার পণের কথা ঘোষণা করেছে উত্তরভারতীয় রাজদরবারগুলোতে। ভারতচন্দ্রের মানসিংহ খণ্ডেও মানসিংহ-জাহাগীরাদির সংলাপের ভাষা এমনি মিশ্র করে তৈরি। এখানে উল্লেখ্য যে কৃষ্ণরাম, ভরতচন্দ্র, রামপ্রসাদ, বিদ্যাপতি, রাধাচরণ গোপ প্রভৃতি হুগলী, বর্ধমান, হাওড়া ও চব্বিশ পরগনার লোক তথা বন্দর এলাকার অধিবাসী।
এভাবে দোভাষীরীতি হিন্দুকবিদের লেখনীপ্রসূত হলেও এর বহুল প্রচলন ও জনপ্রিয়তার জন্যে ফকির গরীবুল্লাহর (১৭৬০-৮০) প্রতিভা ও পরিচর্যার প্রয়োজন ছিল। তিনিই প্রথম দোভাষীরীতি প্রয়োগে তার সব-কয়টি গ্রন্থ রচনা করেন। একে তো তাঁর নিজের বুলি ছিল এ রীতির পরিপোষক, তার উপর ব্রজবুলির মাধুর্য আর উপযোগও হয়তো তার অবচেতন প্রেরণার উৎস ছিল। তাকে প্রথম অনুসরণ করেন সৈয়দ হামজা (১৭৮৮–১৮০৫)। তারপরে মালে মুহম্মদ, মুহম্মদ খাতের, জনাব আলী, আবদুর রহিম, মনিরুদ্দিন, আয়েজুদ্দিন, মুহম্মদ মুন্শী, তাজউদ্দিন, দানিশ, আরিফ, রেজাউল্লাহ, সাদ আলী, আবদুল ওহাব প্রভৃতি প্রায় শতাধিক শায়ের আজ অবধি কয়েকশ কাব্য রচনা করেছেন এ ভাষা-শৈলীর প্রয়োগে।
.
০৪.
হ্যালহেড ১৭৭৮ সনে রচিত তার বাঙলা ব্যাকরণের ভূমিকায় বলেছেন, বাঙলা ক্রিয়াপদযোগে আরবি-ফারসি শব্দবহুল বাক্য ব্যবহারই ছিল তাঁর সমকালে সংস্কৃতিবানতার পরিচায়ক।
আবার ১৮৫৫ সনে পাদ্রী লঙ তাঁর গ্রন্থ-তালিকায় (Descriptive catalogue of Bengali Books) লিখেছেন : আরবি-ফারসিবহুল ভাষা মাঝিমাল্লাদের মধ্যেই প্রচলিত এবং এটি মুসলমানী বাঙলা, আর এ ভাষায় রচিত সাহিত্য মুসলমানী বাঙলা সাহিত্য।
সময়ের দিকে লক্ষ্য রাখলে দুটো তথ্যই নির্ভুল বলে মানা যাবে। ১৭৭৮ সনেও দেশে মুসলিম প্রভাব অক্ষুণ্ণ ছিল, তাই সে-যুগের শিক্ষিত হিন্দু-মুসলমান ফারসি মিশ্রিত ভাষায় কথা বলতে গৌরববোধ করত, আর তা দরবাররি ভাষার বহুল চর্চায় স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল, যেমনটি একালে ইংরেজি শিক্ষিত লোকেরা ইংরেজি মিশানো বাঙলা বলে : ডাক্তার blood examine করে report দিয়েছেন, একটা medicine ও prescribe করেছেন। কিন্তু তবু মনে হয় exact diagonosis হয়নি। আজকাল হাসপাতালে admission না নিলে ভালো treatment আর regular diet ও নিখুঁত nursing-এর ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। রাজনারায়ণ বসুদের মতো রুচিবান রক্ষণশীলদের নিন্দা সত্ত্বেও আজও শিক্ষিত লোকমাত্রই ঘরে-বাইরে এমনি মিশ্রভাষাতেই কথা বলে। ১৮৩৫ সনে ফারসি নিঃশেষে হারায় দরবাবি ভাষার মর্যাদা ও অধিকার। আর ১৮৫৫ সনে কলকাতা শহরে নগণ্য ছিল না ইংরেজিতে উচ্চশিক্ষিত লোকের সংখ্যা। তার উপর সুন্দর গদ্যশৈলী সৃষ্টি-লক্ষ্যে কেরী থেকে বিদ্যাসাগর অবধি লিখিয়ে লোকদের অর্ধশতাব্দব্যাপী সচেতন ও সুপরিকল্পিত সাধনা বাঙলাকে কেবল সংস্কৃত-ঘেঁষা নয়–করে তুলেছিল প্রায় সংস্কৃত-সম। কাজেই নগরের মুসলমান ও গঙ্গাভাগীরথীর মাঝিমাল্লাদের মুখেই এ এককালের নগরবন্দরের বহুল প্রচলিত জনপ্রিয় ভাষা সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে, তাতে বিস্ময়ের নেই কিছু।
.
০৫.
দোভাষীরীতির উদ্ভবের একটি অনুমিত ইতিহাস আছে। যে-কারণে এবং যেভাবে উর্দুভাষা অবয়ব পেয়েছে, এও গড়ে উঠেছে অনেকটা সেভাবেই।
তুর্কী বিজয়ের পর থেকেই ধীরে ধীরে মুসলিম সংস্কৃতির ও ধর্মের প্রভাব পড়তে থাকে এদেশে। তেরো-চৌদ্দশতক থেকেই ফারসি দরবাবিভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছিল। ফলে, জনগণের প্রাত্যহিক জীবনের বুলিতেও নতুন ভাব ও বস্তু নির্দেশক কিছু সংখ্যক ফারসি-তুর্কী এবং সেগুলোর মাধ্যমে আরবি শব্দ মিশে যায়। তাই শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের সাহিত্যিক ভাষাতেও আমরা পাচ্ছি গোটা বারো ফারসি-তুর্কী শব্দ। এদেশে ফারসির চর্চা বৃদ্ধি পায় মুঘল শাসনকালে; শিক্ষিতমাত্রই একালের ইংরেজি-জানা লোকের মতোই জানত ফারসি। তার উপর প্রশাসক ও পদস্থ চাকুরেরা ছিল সাধারণত উত্তরভারতীয় ও ইরানি। এদিকে হিন্দুস্তানী ভাষায় বিপুল হয়ে উঠে ফারসি প্রভাব এবং কথ্য উর্দু চালু হয় সতেরো শতকেরও আগে, আর শালীন সাহিত্যের বাহনের মর্যাদা পায় উর্দু সতেরো শতকের শেষার্ধ থেকেই। দক্ষিণভারতে দাখিনী উর্দুর উদ্ভবও ঘটে এভাবে।
