.
০২.
বিশ শতকের তৃতীয় দশক থেকে কাজী দৌলত, আলাউল, সৈয়দ মুহম্মদ আকবর, আবদুল হাকিম, হায়াত মাহমুদ প্রভৃতির অবিমিশ্র বাঙলায় রচিত কাব্যগুলোর প্রকাশনার আগ্রহ দোভাষীরীতি-প্রিয় প্রকাশকদের কমে যায়, সম্ভবত পাঠক-শ্রোতা মহলেও এগুলো জনপ্রিয়তা হারায়। এর অনুমিত কারণ দুটো। এক. এসব কাব্যের কলেবর স্থূল, ভাষা পরিসুত ও সংস্কৃতঘেঁষা, ভাব ক্ষেত্রবিশেষে দুরূহ, এবং অলঙ্কার বৈদগ্ধ্যাঙ্কিত। দুই. দোভাষীরীতি-প্রিয় প্রকাশকরা তর্জমা নয়–উর্দু রোমান্সগুলোর কাহিনীর সংক্ষিপ্ত পদ্যায়ন প্রকাশ করে ছাড়লেন বাজারে। পাঠক ও শ্রোতারা বিকল্প পাঠ্য-উপকরণের অভাবেই হয়তো নতুন রীতির পুথিগুলো কিনতে বাধ্য হল, কিংবা দোভাষী পুথির আদর বেড়ে গিয়েছিল তাদের কাছে। কেননা এগুলো অবসরের এক বৈঠকেই শেষ করা সম্ভব, ভাবের দুর্বোধ্যতাও ছিল না, ছিল না শব্দের দুরূহতা। (কারণ শতেক হিন্দুস্তানী শব্দের পৌনঃপুনিক প্রয়োগেই এসব পুথি রচিত। ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে প্রয়োগের আনুমানিক হার শতকরা ৩২টি)। তারপর এই আদলে নানা বিষয়ে কয়েকশত গ্রন্থ রচিত হয়েছে গত দেড়শ বছরের মধ্যে। আলাউল প্রভৃতির কাব্যগুলোকে বাজারছাড়া করে এগুলোই।
গণচাহিদা মিটানোর জন্যে রচিত প্রাকৃতজনের এ সাহিত্য যখন নগর-গ্রামের সর্বত্র চালু, তখন ইংরেজি শিক্ষার প্রসারের ফলে আধুনিক জীবনচেতনা প্রবল হয়ে উঠে বাঙালি মুসলিম সমাজে। এই শতকের চতুর্থদশকেই তার শুরু। মুসলিম সমাজের দারিদ্র্য, মহাজনি, জমিদারি ও চাকরির ক্ষেত্রে হিন্দু-সমাজের একাধিপত্য এবং সুদে-ঘুষে হিন্দু-সাধারণের সাচ্ছল্য মুসলমানদের ক্ষোভ, ঈর্ষা ও দারিদ্র্যদুঃখ বৃদ্ধি করে।
অর্থোপার্জনের ক্ষেত্রে এই অসম প্রতিযোগিতা হৃতসর্বস্ব পরাভূত মুসলমান সমাজে রাজনৈতিক চেতনা করে তীক্ষ্ণ আর সংস্কৃতিক্ষেত্রে স্বাতন্ত্রবোধ হয়ে ওঠে তীব্র। তখন বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যক্ষেত্রে মুসলিম স্বাতন্ত্র্য ও ঐতিহ্য-সূত্র আবিষ্কারের প্রেরণাবশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজে এবং আজাদ পত্রিকা-অফিসে গড়ে ওঠে পাকিস্তান রেনেসা শোসাইটি। এখানেই শুরু হয় পুথির চর্চা। তাঁরাই মুসলিম রচিত আধুনিক সাহিত্য থেকে দোভাষী পুথির পার্থক্যজ্ঞাপক পুথি-সাহিত্য নামটি চালু করেন। এর প্রয়োজন ছিল। কেননা এ ভাষাকেই বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা তথা ঘরোয়া আটপৌরে ভাষা বলে প্রচার করলেন তাঁরা! কাজেই দোভাষী পুথি বলার আর উপায় ছিল না, সেক্ষেত্রে তাদের আন্দোলন ও উদ্দেশ্য দু-ই হত ব্যর্থ!
সেই থেকে গত পঁচিশ-ত্রিশ বছর ধরে পুঁথি সাহিত্য বলতে মুসলমানেরা দোভাষী পুথিকেই নির্দেশ করে। অভিধার দিক দিয়ে পুঁথি সাহিত্য কথাটি অর্থহীন। কেননা, বই সাহিত্য যেমন হয় না, পুথি সাহিত্যও হওয়া উচিত নয়, কিন্তু এটি এখন একটি যোগরূঢ় বিশেষ নাম। সেজন্যে আর আপত্তি করা চলবে না। আজ পুথি সাহিত্য আর দোভাষী পুথি সমার্থক এবং একটি অপরটির প্রতিশব্দ।
ইদানীং দোভাষী পুথি নামটার ব্যবহার বেড়ে গেছে। কেননা যে প্রয়োজনে এ নামটি পরিবর্তিত বা লোপ করবার প্রয়াস ছিল, পাকিস্তানোত্তর যুগে তা অনুপস্থিত। কিন্তু এ রীতিকে দোভাষীরীতি বলতে কোনো কোনো বিদ্বানের আপত্তি আছে। তাঁদের মতে তথাকথিত দোভাষীরীতিতে মিশ্রণ ঘটেছে আসলে,–আরবি-ফারসি-তুর্কী, হিন্দুস্তানী ও বাঙলা শব্দের অতএব দ্বিভাষা নয়, অন্তত পঞ্চভাষার মিশ্রণ রয়েছে। কাজেই একে মিশ্ররীতি আখ্যাত করাই যৌক্তিক।
কিন্তু তাঁদের ধারণা যথার্থ নয়। কেননা এ-কথা আজকাল কেউ অস্বীকার করে না যে ভারতীয় ভাষায় কোনো আরবি শব্দই সোজাসুজি আসেনি, এসেছে ফারসির মাধ্যমে। ফারসি ও তুর্কী এদেশের ভাষায় গৃহীত হয়েছে শাসকদের প্রয়োগে ও প্রভাবে। ফারসি (কিছু তুর্কী) শব্দের আধিক্যে গড়ে উঠেছে আধুনিক উর্দু ভাষা, আর এর বিপুল প্রভাব রয়েছে হিন্দিভাষায়। এ দুটোর আদি সাধারণ নাম ছিল হিন্দুস্তানী এবং মুসলিম আমল থেকেই দিল্লী সাম্রাজ্যে Lingua Franca হিসেবে চালু ছিল এ ভাষা। এই হিন্দুস্তানী তথা উর্দুর সঙ্গে বাঙলার মিশ্রণে গড়ে উঠেছে আমাদের দোভাষীরীতি। অতএব, দোভাষীরীতিই এর যোগ্য ও যথার্থ অভিধা। একটি উদাহরণ নেয়া যাক। যদি বলি : There stands a rickshaw in front of Gulistan restaurant in the Jinnah Avenue.–এ বাক্যে জাপানি, ফরাসি, গুজরাটি, ফারসি ও ল্যাটিন শব্দ থাকা সত্ত্বেও একে ইংরেজি বলে জানি ও মানি। শব্দের জাতিনির্ণয় কিংবা ব্যুৎপত্তি নিরূপণ করা বক্তা কিংবা শ্রোতার সাধ ও সাধ্যের অন্তর্গত নয়। অপর ভাষার শব্দ আত্মস্থ করেনি, তেমন ভাষা জগতে নেই। কিন্তু তাতেই কোনো ভাষা মিশ্রভাষা হয় না। দোভাষীরীতিতে মিশ্রণ ঘটেছে বাঙলা ও হিন্দুস্তানীর। আর হিন্দুস্তানীতে আগেই মিশেছিল প্রচুর আরবি-ফারসি-তুর্কী শব্দ ফারসির মাধ্যমে। এখন বিদ্বানের বিশ্লেষণে যদি দোভাষীরীতির ভাষা অলক্ষ্যে প্রবিষ্ট আরবি, ফারসি ও তুর্কীশব্দ বের হয়, তাতে এ রীতির নাম পালটানোর কারণ ঘটে না। রচনায় আরবি-ফারসি তথা বিদেশী শব্দের বাহুল্যই রচনাশৈলীকে দোভাষী করে না, যদি তা-ই হত তাহলে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, মোহিতলাল মজুমদার, নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ–সবাই দোভাষী শায়ের বলে পরিচিত হতেন। অতএব দোভাষী রীতির বৈশিষ্ট অন্যবিধ। একে মুসলমানী বা ইসলামী বাঙলা কিংবা খিচুড়ি বাঙলা বলাও ঐ একই কারণে অসঙ্গত।
