ইতিপূর্বেও পালদের পতন-যুগে আমরা বৌদ্ধ বজ্ৰমান, সহজ যান (তন্ত্র ও যোগ) প্রভৃতি পেয়েছি। সেন-রাজাদের দুর্দিনে পেয়েছি একদিকে চণ্ডী-মনসা প্রভৃতি, অপরদিকে শেখশুভোদয়া, গীতগোবিন্দ ইত্যাদি। (রাধাকৃষ্ণ লীলারূপ পঙ্ক থেকে পঙ্কজ হল বৈষ্ণব মত)। পাঠান পরাজয়ে পেলাম ধর্মঠাকুর, দক্ষিণরায়, কালুরায়, বড়গাজী, সত্যপীর প্রভৃতি আর মুঘল-শক্তির পতনে পেলাম বিদ্যাসুন্দর, কবি-গান, পুথিসাহিত্য। এ হচ্ছে স্রোতে ভেসে যাওয়া লোকের তৃণ ধরে বাঁচবার প্রয়াস।
নবাবী আমলে চট্টগ্রাম, ঢাকা, মুর্শিদাবাদ ও কলকাতা শহরে, শহরতলীতে ও তৎসন্নিহিত অঞ্চলে সিপাহী, রাজকর্মচারী, ব্যবসায়ী এবং আরো নানা পেশার অবাঙালি লোক-লস্কর এসে বসবাস করেছে! উর্দু-হিন্দি তথা হিন্দুস্তানীই ছিল তাদের মাতৃভাষা, স্বদেশের সঙ্গে যোগাযোগের অভাবে ও দেশীলোকের প্রভাবে বিকৃত হয়ে গেল তাদের বুলি। ঐ ভাষা এদেশে অবজ্ঞার্থে খ্যাত হল খোট্টাভাষা নামে। এসব খোট্টাভাষী বিদেশীরা প্রাত্যহিক জীবনের গরজে এদেশীয় লোকের ভাষাও আয়ত্ত করল অপটুভাবে। ফলে যে-কারণে [ অর্থাৎ প্রয়োজনানুরূপ শব্দসম্পদ আয়ত্ত করতে না পারার ফলে] ফরাসি-হিন্দির মিশ্রণে উর্দুর সৃষ্টি হল, অনুরূপ কারণে খোট্টাদেরও একটি বাঙলাভাষার উৎপত্তি হল। এর বিশেষত্ব হচ্ছে বাঙলা শব্দের বিকৃত উচ্চারণ এবং অপরিমেয় হিন্দুস্তানী শব্দের ব্যবহার ও বাভঙ্গির প্রয়োগ। এ ভাষা এখনো চালু রয়েছে উক্ত শহরগুলোতে।
হিন্দুস্তানী ও বিদেশাগতদের পারস্পরিক অক্ষমতার ফলে ফারসি-হিন্দি মিশ্রিত যে ভাষা চালু হল Linguafranca হিসেবে, তা ফারসি অক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে নতুন নামে আলাহিদা ভাষারূপে দাঁড়িয়ে গেল। উর্দুর (তবু) ভাষা পরিণামে কয়েক কোটি লোকের ঘরোয়া বুলিতে পরিণত হল। কালে সাহিত্যের বাহন হবার গৌরব অর্জন করেছে উর্দু।
এভাবে দক্ষিণভারতেও সৃষ্টি হয়েছে দাখিনী উর্দু। খোট্টা বাঙালিরাও হয়তো ফারসি হরফে তাদের মিশ্রবাঙলা লিপিবদ্ধ করে উর্দুর মতো পৃথক একটা ভাষা তৈরি করতে পারত; কিন্তু বাঙলা দেশে বিদেশাগত হিন্দু-মুসলমানের সংখ্যাল্পতার দরুন এবং বাঙলা ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চল হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি কিংবা এর জন্য নওয়াবী আমল দীর্ঘায়িত হওয়ার প্রয়োজন ছিল। এ প্রসঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন যে আরবি-হরফে অনুলিখিত যে-কয়টি বাঙলা পুথি মরহুম আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ কর্তৃক সংগৃহীত হয়েছে, সেগুলো দোভাষী পুথি নয়, সুতরাং একে উর্দুর মতো আলাহিদা ভাষা সৃষ্টির প্রয়াস বলে মনে করবার হেতু নেই। আরবি হরফে বাঙলা লিখবার অন্য স্থানীয় ও পারিবেশিক কারণ ছিল। ওগুলো বাঙলা বর্ণজ্ঞানহীন মাদ্রাসা-শিক্ষিত মৌলবাদীদের জন্যই। প্রতিবর্ণীকৃত। সে আলোচনা এখানে অবান্তর।
সুতরাং খোট্টা বাঙালির শহুরে বাঙলায় যে-সাহিত্য পলাশীযুদ্ধের পাঁচ-সাত বছর পর থেকে কলকাতা, হাওড়া, হুগলী ও মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে রচিত হতে থাকে, তার সাথে বাঙালির কোনো যোগ ছিল না। চৌদ্দ-পনেরো শতক থেকে বিশুদ্ধ বাঙলায় যে-সাহিত্য রচিত হচ্ছিল এরা সে ভাষাশৈলীই সাম্প্রত কাল পর্যন্ত অনুসরণ করে চলেছে। দোভাষী পুথির কোনো প্রভাব যে পল্লীবাসী মুসলমানদের উপর পড়েনি, তার প্রমাণ এদের রচিত পুরোনো বা নতুন গানে, গাথায়, ছড়ায়, রূপকথায়, কাহিনী-কাব্যে সে ভাষার কোনো নিদর্শন নেই। আমাদের উক্তির সমর্থন পাওয়া যাবে হারামণি, ময়মনসিংহ ও পূর্ববঙ্গ গীতিকা প্রবাদ-সংগ্রহে এবং পাঁচালিগুলোতে।
পল্লী অঞ্চলে দোভাষী পুথি বহুলপঠিত হত বলে বিশ্বাস করবারও কারণ নেই। চকবাজার ও শহুরে বস্তিতে এর উদ্ভব ও প্রচার সীমাবদ্ধ বললে সত্যের বিশেষ অপলাপ হবে না। উনিশ-বিশ শতকের দোভাষী উপাখ্যানগুলো কারা, কাদের আদেশে, কোনো প্রেরণায় রচনা করেছেন ও করছেন তার উল্লেখ অনেক পুথির সমাপ্তিভাগে রয়েছে–বটতলার প্রকাশকের আদেশ, আর্থিক প্রেরণা এবং খোট্টা পাঠকদের চাহিদাই রয়েছে এগুলো রচনার মূলে। অতএব এ-সাহিত্যের সঙ্গে বাঙালির আন্তর বা বাহ্য যোগ কোথায়? অবশ্য বিশুদ্ধ ভাষায় রচিত ছাপা পুথির অভাবে গাঁয়ের লোকেরাও দোভাষী পুথি পড়েছে–শুনেছে কিন্তু সে-ভাষা অনুকরণ করেনি। কাজেই দোভাষী পুথি সাহিত্যের ঐতিহ্য-উত্তরাধিকারের প্রশ্নই অবান্তর। কল্যাণকর ইসলামী আবেশ বা মুসলিম ঐতিহ্যের আবহ পুথিতে দুর্লভ ও দুর্লক্ষ্য। দোভাষী পুথির আদি রচয়িতা ফকির গরীবউল্লাহ্ স্বয়ং ছিলেন পীর পূজারী। দেবগুণাধিকারী বড় খান গাজী ছিলেন তাঁর জীবন-নিয়ন্তা। এখানে উল্লেখযোগ্য যে মুঘল আমলে আগত ধনিক ও বণিক অভিজাত মুসলমানগণের ঘরোয়া ভাষা আজো উর্দু, এবং বাঙালি মুসলমানদের মুখপাত্র হয়ে তাঁরাই উনিশ শতকে ও বিশ শতকের প্রথমদিকে প্রচার করেছিলেন যে, বাঙালি মুসলমানদের মাতৃভাষা উর্দু।
সতেরো শতকের কবি কৃষ্ণরাম দাস তাঁর রায়মঙ্গলে সংস্কৃত নাটকের অনুকরণে সংলাপে বাস্তবরূপ দান করবার বাসনায় সত্যপীরের মুখে হিন্দুস্থানী ভাষা দিয়েছিলেন। ভারতচন্দ্র রায়মঙ্গলের সে দৃষ্টান্ত স্মরণ করেই লিখেছেন :
মানসিংহ পাদসায় হইল যে বাণী।
উচিত যে আরবি পারসী হিন্দুস্তানী ॥
পড়িয়াছি যেই মত বর্ণিবারে পারি।
কিন্তু সে সকল লোকে বুঝিবারে ভারি ॥
না রবে প্রসাদ গুণ না হবে রসাল।
অতএব কহি ভাষা যাবনী মিশাল।
