প্রাগুক্ত গ্রন্থসমূহের ভাষায় গ্রাম্যতাদুষ্ট (Slang) শব্দ আর কিছু আরবি-ফারসি শব্দও রয়েছে, কিন্তু সমাসবদ্ধ সংস্কৃত শব্দ নেই। অপরিহার্য রূপে কয়েক হাজার আরবি-ফারসি শব্দ বাঙলাভাষায় চালু আছে। আরো দু-দশটা শব্দ হয়তো আসবে কিন্তু তা প্রয়োজনের তাগিদে স্বাভাবিকভাবেই আসবে, জোর করে চালু করলে চলবে না।
বিদেশাগত মুসলমান শাসকগোষ্ঠী ঘরে তুর্কী, দপ্তরে ফারসি, মসজিদে আরবি এবং সামাজিক ব্যবহারে আরবি-তুকী-ফারসি মিশ্রিত হিন্দুস্তানী ভাষা ব্যবহার করতেন। তাই মুসলমান আমলে যেমন ব্যবহারিক ও দরবারি জীবনে আরবি-ফারসি-তুর্কী শব্দ ঘরোয়া ও পোশাকি কথায় প্রতিশব্দ বা পরিভাষার অভাবে অপরিহার্যরূপে ব্যবহৃত হয়েছে, ইংরেজ আমলেও তেমনি আমাদের কথাবার্তায় অসংখ্য ইংরেজি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, এবং ক্রমে ক্রমে পরিভাষা সৃষ্টি করে বা সংস্কৃত থেকে শব্দ সগ্রহ করে আমরা ইংরেজি শব্দের ব্যবহার সংকুচিত করেছি, অন্তত সাহিত্যের ভাষায় আমরা পারতপক্ষে ইংরেজি ব্যবহার করিনে। হাসপাতালে Admission নেওয়া, স্কুল-কলেজে পড়া, Examine দেওয়া, পাস করা, Refer করা, Report বা Return দেওয়া, Graduate হওয়া point বলা, Suggestion নেওয়া প্রভৃতি আজো শিক্ষিত বাঙালির ঘরোয়া কথাবার্তার ও চিঠিপত্রের ভাষার অপরিহার্য অঙ্গ। কিন্তু সাহিত্যে এদের যে-পরিভাষা গ্রহণ করেছি, তার একটাও বাঙলা বা দেশী শব্দ নয়–সবগুলোই সংস্কৃত। যেমন ভর্তি, পরীক্ষা, স্নাতক, প্রবেশিকা, উত্তীর্ণ, বিশ্লেষণ, সমীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ প্রভৃতি। এমনকি আরবি-ফারসি ভাষার ঐতিহ্যবাহী মুসলমানদের সৃষ্ট পরিভাষাও আরবি-ফারসি নয়, বরং সংস্কৃত। এখন যেমন অসাহিত্যিক বাঙালি জনসাধারণ কথাবার্তায় ও চিঠিপত্রে প্রায় প্রতি বাক্যে দু-একটা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে, তেমনি পূর্বে এরূপক্ষেত্রে আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করা হত। এখনকার যুগের জনসাধারণের কথাবার্তার বা চিঠিপত্রের ভাষা যেমন সাহিত্যে স্থান পায়নি, তেমনি তখনকার যুগেও মিশ্রভাষাও সাহিত্যে স্থান করে নিতে পারেনি, তার প্রমাণ আমাদের সেকালীন পদ্যসাহিত্য। যে-সব আরবি-ফারসি বা ইংরেজি শব্দের প্রতিশব্দ বাঙলা-সংস্কৃতে পাওয়া যায়নি অথবা পরিভাষা সৃষ্টি সম্ভব হয়নি সেগুলো এখনও আমাদের সাহিত্যের ভাষায় চালু রয়েছে এবং খুব সম্ভব থাকবেও।
সুতরাং চিঠিপত্র বা দলিল-দস্তাবিজের অসাহিত্যিক ভাষার দ্বারা কোনো ভাষার গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করতে যাওয়া অসমীচীন। অতএব কেরী-বিদ্যাসাগরী প্রচেষ্টার পূর্বে বাঙলা সাহিত্যের ভাষা আরবি-ফারসি মিশ্রিত হবার প্রবণতা লাভ করেছিল বলে যারা মনে করেন, তাঁদের ধারণা তথ্যভিত্তিক নয়। এ যুগে কেউ বলে যে বাঙলা ভাষা ইংরেজি শব্দের দ্বারা পুষ্ট ও সুষ্ঠু হবার প্রবণতা দেখাচ্ছে, তা যেমন ভুল, পূর্ব-ধারণায়ও রয়েছে তেমনি ধরনের অসঙ্গতি। বস্তুত বিদেশী বিভাষার শব্দ গ্রহণ যে-কোনো ভাষার দীনতারই পরিচায়ক। সগোত্রীয় সংস্কৃতের ঋণ স্বীকার করে বাঙলা সে-দীনতা ঘুচিয়েছে; কাজেই বিদেশী শব্দে তার প্রয়োজন সামান্য।
.
০২.
এবার আঠারো শতকের শেষার্ধে আমাদের জাতীয় অধঃপতন যুগে উর্দু-বাঙলা মিশ্র শৈলীতে রচিত দোভাষী পুথি সম্বন্ধে আমাদের অনুসন্ধান-লব্ধ ধারণা পেশ করে আমাদের আলোচনা শেষ করব।
নবাব সরফরাজ খান রাজ্যশাসনে উদাসীন ছিলেন। তার শাসন-শৈথিল্যের সুযোগে রাজ্যের প্রধানগণ উচ্ছল, লোভী ও আত্মপরায়ণ হয়ে উঠে। খলশ্রেষ্ঠ জগৎ শেঠের নেতৃত্বে স্বার্থপর অমাত্যগণ উড়িষ্যার নায়েব-সুবাদার আলীবর্দী খাঁকে বসালেন বাঙলার মসনদে। এদের সহায়তায় নবাবী লাভ হল বলে তিনি এঁদের মন যুগিয়ে চলতেন। ফলত এসব স্বার্থপর, উচ্ছল অত্যাচারী সামন্তগণই ছিলেন প্রকৃতপক্ষে রাজ্যের ভাগ্যনিয়ন্তা। তদুপরি বর্গীয় উৎপাত তো ছিলই। শাসক যেখানে দুর্বল, শাসিতগণ সেখানে যথেচ্ছাচারী হবেই। সিরাজদ্দৌলা আমীরদের মন ও মান রক্ষা করে চলতে জানলেন না বা পারলেন না। কাজেই পলাশীতে অবশ্যম্ভাবী বিপর্যয় ঘটল।
মানুষ চিরকাল আদর্শপ্রবণ ও পরানুকারী। ধনে-জনে-মানে যারা প্রধান, জনজীবনে তাদের আচার-আচরণই অনুকৃত হয়। ফলে এ সময় দেশব্যাপী স্বার্থপরতা, নীতিহীনতা এবং ভোগ ও নগ্ন লালসার স্রোত বয়ে চলেছিল। এ কদর্যতার স্রোত অবশ্যম্ভাবীরূপে প্রবেশ করেছিল সাহিত্যেও। এজন্যেই তারল্য, কৃত্রিমতা, বর্ণনায় নির্জীবতা–অলঙ্কারের ঘটা ও ছন্দের বহু বিচিত্র সম্ভার সত্ত্বেও ভারতচন্দ্রের রচনাকে করেছে কলঙ্কিত। ভারতচন্দ্রের পরে বাংলার রাষ্ট্রিক, নৈতিক ও সামাজিক অবস্থা আরো খারাপ–আরো ক্লেদাক্ত হয়ে উঠেছিল, সে-প্রমাণ শুধু ইতিহাস থেকেই নয়, সাহিত্য থেকেও পাচ্ছি। আঠারো শতকের এই শাসনতান্ত্রিক শৈথিল্যের, রাষ্ট্রিক ভাগ্য-বিপর্যয়ের এবং নীতি-নিষ্ঠাহীন বাঙালির অবনতি-প্রবণ সমাজের বিকৃতির অভিব্যক্তি স্বরূপ আমরা হিন্দু রচিত কবি গান, পীর পাঁচালী এবং মুসলমান রচিত দোভাষী পুথিগুলো পাচ্ছি। হিন্দুকবি রচিত পীর পাঁচালীর অনেকগুলোই দোভাষী পুথির অন্তর্গত। নির্বীর্য বাঙালির সামাজিক রুচিবিকৃতি ও নৈতিক অধঃপতনের দিনে মানসিক বিপর্যয় ও সাংস্কৃতিক বন্ধ্যাত্বের সুযোগে নতুন বন্দর কলকাতা এবং পুরোনো শহর মুর্শিদাবাদকে কেন্দ্র করে হিন্দু ও মুসলমানের গড়ে উঠে যথাক্রমে উক্ত দু-ধারার সাহিত্য। হিন্দুদের যেমন ধর্মসংপৃক্ত কবিগান, সত্যনারায়ণ পাঁচালী, মুসলমানদেরও তেমনি হামজা-হোসেন-হানিফা প্রভৃতি জেহাদ কাহিনী ও পীর-দরবেশের উপকথা নিয়ে গড়ে উঠে এ সাহিত্য। তখন রাজশক্তির লীলাভূমি কলকাতা, মুর্শিদাবাদ ও এদের সন্নিহিত অঞ্চলের হিন্দু মুসলমানদের আধ্যাত্মিক দেউলে ভাবও প্রকট হয়ে উঠে। মানুষ যখন উচ্চ নৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় আদর্শ হারিয়ে ফেলে তখন আত্মবিশ্বাস রক্ষা করে আত্মনির্ভর হতে পারে না। তখন সে হয়ে পড়ে একান্তভাবে দৈবনির্ভর, ভীরু এবং শক্তি-পূজক। এজন্যে এসময় এখানকার হিন্দুদের মধ্যে দক্ষিণরায়, সত্যনারায়ণ, কালুরায় ও ধর্মঠাকুরের পূজা ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়, মুসলমানদের মধ্যেও সত্যপীর, বড় খাঁ গাজী, ইসমাইল গাজী, মোবারক গাজী, বনবিবি প্রভৃতি মানবভাগ্য নিয়ন্তা বলে শ্রদ্ধা-শিরনি পেতে থাকেন। রাজধানীর অধিবাসীরাই সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্য দুটোই সমভাবে ভোগ করে। বাঙলার কলঙ্কিত দুর্দিনের সাক্ষ্য রেখে গেছে এরাই।
