ভারত চন্দ্র-রামপ্রসাদ ছাড়া বিদ্যাপতি, শ্রীকবি বল্লভ, কৃষ্ণহরি দাস প্রভৃতি সত্যনারায়ণ পুথি রচয়িতাগণ এবং জঙ্গনামা রচয়িতা রাধাচরণ গোপ তাদের পাঁচালিতে মিশ্রভাষা প্রয়োগ করেছেন। বলা বাহুল্য, এঁরাও কলকাতা সন্নিহিত অঞ্চলের লোক।
কৃষ্ণরামদাসের হিন্দির নমুনা :
শোতে হো দক্ষিণরায় এছা দাগাবাজী।
বাধকে নে আনেছে তবে হাম গাজী ॥
কালানল শেরকু তোড়নে কহে কান।
সিতাব দেখনে চাই কেছাই সয়তান ॥
বিদ্যাপতির রচনা :
হইআ বান্দার বান্দা নুঙাইয়া শির।
বন্দিব বড় খা গাজী পীর দস্তগীরা
একদিলে বন্দিব দরদস্তা পীব।
বড় খাঁ গাজী যেই করিল জাহির ॥
শ্ৰীকবি বল্লভের রচনা :
শুনহ বেইমান রাজা বাত কহু তোরে।
রাখ্যাছ গোলাম মেরা কিসের খাতিরে ॥
সাত হাজারের মার্তা লইয়াছে ভাড়া।
মহল ভিতরে নাচে সাতশত ন্যাড়া
জঙ্গনামা রচয়িতা রাধাচরণ গোপের রচনা :
ইলাহি কহেন জীবরিল কর আর কি।
আছামান জমীন ডুবাইছেন রসুলের ঝি
সিতাব করিয়া এখন দুনিয়াকে যাও।
বিবি ফাতেমাকে তুমি যাইঞা সমজাও ॥
সম্ভবত এঁদেরই অনুকরণে গরীবউল্লাহ ১৭৬০ থেকে ১৭৮০ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে তার কাব্যগুলো রচনা করেন। দ্বিতীয় কবি মুহম্মদ এয়াকুব (?) গরীবুল্লাহর অসমাপ্ত হোসেন মঙ্গল বা জঙ্গনামা সমাপ্ত করেন ১৭৯৪ খ্রীস্টাব্দে। তৃতীয় কবি সৈয়দ হামজা ১৭৮৯-১৮০৫-৮ খ্রীস্টাব্দে তাঁর গ্রন্থগুলো রচনা করেছেন। আঠারো শতকের শেষার্ধে মাত্র এই তিনজন দোভাষী পুথি লেখকের আবির্ভাব হয়েছে। উনিশ শতকে, বিশেষ করে বিশ শতকে প্রায় শতাধিক কবি বটতলার প্রকাশকদের অনুরোধে অর্থের বিনিময়ে নানা বিষয়ক পুথি রচনা করে দিয়েছেন। এদের অনেকেই পেশাদার লেখক। তাই পুথিগুলো প্রায় সবদিক দিয়েই বিশেষত্ব বর্জিত। পদ্যে কোনোরকমে কাহিনী বা বক্তব্য লিপিবদ্ধ হয়েছে মাত্র। বহুগ্রন্থ প্রণেতা হিসেবে এদের মধ্যে উড়িষ্যার অবদুল মজিদ খান ভূঁইয়া, জনাব আলী, মালে মুহম্মদ, মুহম্মদ খাতের, আবদুর রহিম, মুহম্মদ মুনশী, শেখ আয়েজুদ্দিন, মনিরুদ্দিন প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য। এবং এঁদের অনেকেরই নিবাস দক্ষিণরাঢ়ে তথা হাওড়া, হুগলী ও চব্বিশ পরগনাঞ্চলে।
এসব দোভাষী পুথি কাদের জন্যে লিখিত হয় তার আভাস পাওয়া যাবে কয়েকটি উদ্ধৃতি থেকে।–কবি মালে মুহম্মদ তার সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামাল পুথি রচনার কারণ স্বরূপ বলেছেন:
এই পুথি সায়ের ছিল আগুন যমানায়।
সংস্কৃত সাধু ভাষায় হৈল তৈয়ার ॥
পড়িতে বুঝিতে লোকে বড়ই কাছেল্লা।
তেকারণে অধীন করে চলিত বাঙ্গালা।
রসিক লোকের দেখে বহুত কাগতি।
বারশও পঁয়ত্রিশ সালে লেখি এই পুথি ॥
বারোশ পঁচাত্তর বাঙলা সনে হুগলী সন্তোষপুর নিবাসী কবি বেলায়েতকে তাঁর ফেসানায়ে আজায়েব বা আঞ্জুমান আরা জানে আলম রচনাকালে তার বন্ধু ভাষা সম্বন্ধে যে উপদেশ দিয়েছিলেন তা এরূপ :
বোলচাল সব তুমি লেখ আমাদের।
সকলের বুঝিতে পারে কী কহিব ফের ॥
রঙ্গিন করিতে তুমি এই যে কাহিনী।
শক্ত শক্ত লভূজো কিছু না লেখ আপনি ॥
এমত না হয় যেন আমা সবাকায়,
মানে পুছে ফিরি মোরা পণ্ডিত সবায় ॥
কলকাতা শহরের কড়োয়া নিবাসী কবি শেখ আমীরুদ্দিন মনসুর হাল্লাজ পুথির প্রারম্ভে লিখেছেন :
মাসাএখ মনসুরের কেচ্ছা ফার্ছিতে।
লিখিয়াছিলেন কোনো ফাজেল লোকেতে।
সেই তো রেছেলা ফের এছলামি বাঙ্গালায়।
লিখিতে এরাদা হইল খাহেস আমায় ॥
বাঙ্গালা লোকের কেচ্ছা শুনিতে বাসনা।
তেকারণে বাঙ্গালাতে করিনু রচনা ॥
এতেই বোঝা যাবে এঁরা কোনো বাঙালির জন্যে কোনো বাঙলায় পুথি রচনা করেছেন। আজ পর্যন্ত যারা দোভাষী পুথি রচনা করে চলেছেন, যাঁরা এ-পুথির প্রকাশক আর যারা পাঠক, তাঁদের সঙ্গে যে শিক্ষিত বা অশিক্ষিত বাঙালির সাংস্কৃতিক ও ভাবগত কোনোপ্রকার সম্পর্ক নেই তা কে না স্বীকার করবেন?
এসব পুথি দেখেই সম্ভবত উনিশ শতকের হিন্দু সাহিত্যিকগণ মুসলমান লেখকের রচনার সমালোচনা প্রসঙ্গে মুসলমান হইয়া এমন বিশুদ্ধ বাংলা লিখিয়াছেন ইত্যাদি উক্তি করতেন। অবশ্য দোভাষী পুথির অধিকাংশ উর্দু সাহিত্যের অনুবাদ। বাঙলা তর্জমায় উর্দুভাষার প্রচুর আরবি ফারসি শব্দ ও বাঙ্গি রক্ষা করার ফলে কবিগণের পক্ষে অনুবাদ কার্য সহজ হয়েছিল। কিন্তু আমাদের পুথিকারদের কেউ কেউ উর্দু-হিন্দি শব্দ এতই বেশি প্রয়োগ করেছেন যে, তাঁদের রচনার কোনো কোনো অংশ বিকৃত হিন্দুস্তানী বলে ভ্রম হয়।
এখানে আমরা ব্রজবুলি নামক কৃত্রিম ভাষার কথা স্মরণ করতে পারি। মৈথিল ভাষার অনুকরণে বৈষ্ণব যুগে (১৬১৭ শতকে) ব্রজবুলি (বাঙলা-মৈথিল মিশ্রিত) ভাষায় পদ রচনার রীতি দেখা দেয়, কিন্তু কৃত্রিম বলে তা বাঙলা সাহিত্যে টিকতে পারেনি। শেষপর্যন্ত পরিত্যক্ত হয়েছে। শুধু তাই নয়, কোনো সময়েই বাঙলাদেশে এর বহুল প্রচলন হয়নি। কেবল গোবিন্দ দাসই মনেপ্রাণে সাধনা করেছিলেন ব্রজবুলির। ফলে তাঁর রচনা (পদাবলী) হৃদয়াবেগহীন বাসর্বস্ব বাঁচাতুর্যে পর্যবসিত হয়েছে–ভাষার ঐশ্বর্য ঘুচাতে পারেনি ভাবের দীনতা। ভাষার জাদুকর হয়েও তাই তিনি আন্তরিকতার অভাবে কবিপ্রাণতায় বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস বা জ্ঞানদাসের সমকক্ষ হতে পারেননি। অথচ মৈথিল ভাষা (তথা ব্রজবুলি) ছিল বাঙলা ভাষার বৈপিত্রেয় বোন–সহোদরা। এজন্যেই এ-যুগে ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলীও অনুকৃত হয়নি। কৃত্রিম ভাষায় হালকা রচনার বিলাস করা চলে, কিন্তু সারবান মহিমময় সাহিত্য সৃষ্টি করা চলে না। অক্ষম লোকের কৃত্রিম ভাষা প্রয়োগের ফলে পুথি-সাহিত্য সৌন্দর্য ও শালীনতা হারিয়ে ফেলেছে। গাম্ভীর্যের কথা তো ওঠেই না। বাঙালির ব্রজবুলি-চর্চার পরিণতি থেকে আমাদের শিক্ষা পাওয়া উচিত। ইতিহাসের ইঙ্গিত অবহেলার ফল কখনো শুভ হয় না।
