কিন্তু আশ্চর্য যে, এমন ওকালতির পরেও স্বয়ং মৃত্যুঞ্জয়ও এ ভাষায় বিশ্বাসী ছিলেন না। তার প্রমাণ পাচ্ছি তাঁরই অন্য রচনায় :
‘মোরা চাষ করিব, ফসল পাবো রাজার রাজস্ব দিয়া যা থাকে তাহাতেই বছর শুদ্ধ অন্ন করিয়া খাব, ছেলে পিলাগুলিন পুষিব। যে বছর শুকা হাজাতে কিছু খন্দ না হয়, সে বছর বড় দুঃখে দিন কাটি, কেবল উড়ি ধানের মুড়ি ও মটর মসুর শাকপাতা শামুকগুলি সিজাইয়া খাইয়া বাঁচি। …. এ দুঃখেও দুরন্ত রাজা, হাজা শুকা হইলেও আপন রাজস্বের কড়াগণ্ডা ক্রান্তি বট ধূল ছাড়ে না। এক আধ দিন আগে পিছে সহে না, যদ্যাপিস্যাৎ কখন হয়, তবে তার সুদ দাম বুঝিয়া লয়, কড়াকপর্দকও ছাড়ে না। যদি দিবার ক্ষেতে না হয়, তবে সোনা মোড়ল পাটোয়ারি ইজারাদার তালুকদার জমীদারেরা পাইকপেয়াদা পাঠাইয়া হাল যেয়াল ফাল হালিয়াবলদ দামড়াগরু বাছুর বকনা কাঁথা পাথর চুপড়ী কুলা ধুচুনী পর্যন্ত বেচিয়া গোবাড়ীয়া করিয়া পিটিয়া সর্বস্ব লয়। মহাজনের দশগুণ সুদ দিয়াও মূল আদায় করিতে পারিনা। কত বা সাধ্য সাধনা করি–হ্যাঁতে ধরি, পায়ে পড়ি, হাত জুড়ি, দাঁতে কুটা করি। হে ঈশ্বর দুঃখির উপরেই দুঃখ। ওরে পোড়া বিধাতা আমাদের কপালে এত দুঃখ লিখিস। তোর কী ভাতের পাতে আমরা ছাই দিয়াছি?’
শুধু বিদ্যালঙ্কারই নন; রামমোহন, বিদ্যাসাগর, কালীপ্রসন্ন সিংহ, প্যারীচাঁদ মিত্র, বঙ্কিমচন্দ্র প্রভৃতি সবাই বাঙলা গদ্যকে স্বাভাবিক ও শালীন করে তুলবার চেষ্টা করেছেন।
রাজা রামমোহন রায় যথার্থই বুঝেছিলেন-প্রথমতঃ বাঙলা ভাষাতে আবশ্যক গৃহব্যাপারের নির্বাহযোগ্য কেবল কতকগুলি শব্দ আছে। এ ভাষা সংস্কৃতের যেরূপ অধীন হয়, তাহা অন্য ভাষার ব্যাখ্যা ইহাতে করিবার সময় স্পষ্ট হইয়া থাকে। দ্বিতীয়তঃ এ ভাষার গদ্যতে অদ্যাপি কোনো শাস্ত্র কিংবা কাব্য বর্ণনে আইসে না। ইহাতে এতদ্দেশীয় অনেক লোক অনভ্যাস প্রযুক্ত দুই তিন বাক্যের Sentence গদ্য হইতে অর্থবোধ করিতে পারেন না, ইহা প্রত্যক্ষ কানুনের তরজমার অর্থবোধের সময় অনুভব হয়। (বেদান্তগ্রন্থের অনুষ্ঠান প্রকরণ)।
ভিন্ন ভিন্ন দেশীয় শব্দের বর্ণগত নিয়ম ও বৈলক্ষণ্যের প্রণালী ও অন্বয়ের রীতি যে গ্রন্থের অভিধেয় হয়, তাহাকে সেই সেই দেশীয় ভাষার ব্যাকরণ কহা যায়। (বাঙলা ব্যাকরণ)
অতএব রামমোহন এ ভাষা সংস্কৃতের যেরূপ অধীন হয় অর্থে সংস্কৃত অভিধানের অধীনতার কথা বলেছেন, ব্যাকরণের নয়। সুতরাং তিনি বাঙলা ও সংস্কৃত ভাষার প্রকৃতিগত পার্থক্য স্বীকার করেছিলেন। তার ব্যাকরণের অপর দুটো উদ্ধৃতি থেকে আমাদের সিদ্ধান্তের সমর্থন পাওয়া যাবে : ১. সংস্কৃত সন্ধি প্রকরণ ভাষায় উপস্থিত করিলে তাবৎ গুণদায়ক না হইয়া বরঞ্চ আক্ষেপের কারণ হয়। ২. এরূপ (দীর্ঘ সমাসবদ্ধ) পদ গৌড়ীয় ভাষাতে বাহুল্য মতে ব্যবহারে আসে না। এমনকি, অত্যধিক সংস্কৃত শব্দের ব্যবহারকেও সংস্কৃত রীতির অনুসরণ বলে আখ্যাত করা চলে না। কারণ সংস্কৃত ভাষায় শব্দ বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহৃত হয় না, সন্ধি ও দীর্ঘ সমাসবদ্ধ হয়েই পদ্যে ও গদ্যে ব্যবহৃত হয়। বাঙলায় দুয়ের অধিক শব্দে সন্ধি বা সমাস সাধারণত হয় না। সুতরাং বাঙলাকে সংস্কৃত শব্দে ভারাক্রান্ত করা চলে কিন্তু সংস্কৃত বাক্যরীতির অনুগত করা সম্ভব নয়।
এসব দেখেশুনেই রামমোহন তাঁর রচনাবলীতে, মৃত্যুঞ্জয় তার প্রবোধচন্দ্রিকার কোনো কোনো কুসুমে, কালীপ্রসন্নসিংহ হুতোম প্যাচার নকসায়, বিদ্যাসাগর বেতাল পঞ্চবিংশতিতে, প্যারীচাঁদ আলালের ঘরের দুলালে, বঙ্কিমচন্দ্র সীতারামে বাঙলা গদ্যের একটা বিশিষ্টরূপ দানের প্রয়াস পেয়েছেন।
ইতিপূর্বেও সহজিয়াদের জ্ঞানাদি সাধনা, গোলক শর্মার হিতোপদেশ, কেরীর ইতিহাসমালা, গৌরীকান্তের কামিনী কুমার, রজীব লোচনের কৃষ্ণচন্দ্র চরিত, প্রমথ নাথ শর্মার নব বাবুবিলাস, ও নববিবি বিলাস, বৃটিশ মিউজিয়ামে প্রাপ্ত রূপকথা, (ডক্টর সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক আবিষ্কৃত), রামরাম বসুর প্রতাপাদিত্য চরিত, তারিণীচরণ মিত্রের ঈসপের গল্পাবলী, চণ্ডীচরণ মুন্সীর তোতা ইতিহাস, হরপ্রসাদ রায়ের পুরুষ পরীক্ষা, রামকিশোর তর্কালঙ্কারের হিতোপদেশ, ভবানীচরণের কলিকাতা কমলালয় প্রভৃতি গ্রন্থে ও মার্সম্যান, জোন্স, ভরস্টার উইলকিন্স প্রমুখ সাহেবদের ভাষায় সংস্কৃতানুগত্যের নিদর্শন দুর্লক্ষ্য। ইতিপূর্বেকার চিঠিপত্র ও দলিল দস্তাবিজের ভাষায় ব্যতীত এ সময়কার সাহিত্যিক রচনায় আরবি-ফারসি শব্দের বাহুল্যও দৃষ্টিগোচর হয় না। শুধু প্রতাপাদিত্য চরিতে মাত্রাতিরিক্ত আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের কেরী প্রভৃতি ধর্মপ্রচারের জন্যে ও রাষ্ট্রীয় কারণে জনসাধারণের সহজবোধ্য রীতির যে পক্ষপাতী ছিলেন, সে-যুগের ইতিহাস তারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। অতএব, সংস্কৃতানুরাগী পণ্ডিতগণের সৃষ্ট ভাষা বাঙলাদেশে স্থায়ী হয়নি।
এ পর্যন্ত যা বললাম তাতে বোঝা যাবে বাঙলাভাষার গদ্যে ও পদ্যে একটা নিজস্ব রীতি বা শৈলী ছিল। তাতে মাত্র দুবার বিপর্যয় আসে–একবার দোভাষী রীতির প্রচলনে, আর একবার সংস্কৃত ব্যাকরণানুগ গদ্য রচনার ফলে। সৌভাগ্যবশত কোনোটাই স্থায়ী হয়নি।
