নিশি আমতা আমতা করে বলল, গামছাটা ভরে গেল সোনামণি। ধান লেবটা কীসে।
হা রে আমার মরদ। সোনামণি ফের দুঃখে দাঁত শক্ত করে ফেলল। এখন বচসার সময় না। নাচন-কোদনের সময় নয়। এখন শুধু ধান তুলে নেবার সময় নিশিকে বসে থাকতে দেখে আগুনের মতো ওর শরীর জ্বলে উঠছিল। সে কী ভাবল, কী দেখল নিশির, তারপর সহসা নিশির নেংটিটা হ্যাঁচকা টানে ছুঁড়ে ফেলে দিল দূরে। ঠিক যেন এক ভুজঙ্গ এখন ভূঁইয়ের মাঝে পড়ে আছে চিত হয়ে।
নিশি বলল, হ্যা ল সোনামণি, হ্যা ল সুমি, আমি নিশি, আমি ঢোল বাজাই পুজা-পার্বণে, আমারে তুই উলঙ্গ করে দিলি!
মরদের কথা শুন! সোনামণি ধান রেখে শাড়িতে মুখ তুলে কথা বলল। ‘আমার সাধু রে। সুমি ফের সাঁতার দিল কাদার ভিতর। কিছু জানে না মরদ। খুঁটে খুঁটে কিছু ধান তুলে আনল। ‘অঃ আমার গাজনে সন্ন্যাস লিয়েছে রে, জয় মহাদেবের বাচ্চা রে! যা যা ওটা বিছিয়ে যা পারিস তুলে লেগা। সোনামণি আর তাকাল না নিশির দিকে। মাথার উপর এখন আর দড়িটা নড়ছে না। বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছে। শশী তুমি বড়ো চতুর হে! তুমি নিশিকে টাকা দিয়ে বশ করেছ। আর তখন চারিদিকে খরা, আগুনের মতো ঝিল্লি মাঠময়, গোরু বাছুর জলের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে। আর শশী তুমি বড়ো চতুর হে। তাড়ির খোঁজে তুমি শশী বনবাদাড়ে ঘুরঘুর করছিলে।
নিশি সেদিন বাড়ি ছিল না। অঙ্গি বঙ্গি নিশির সঙ্গে ঢোল বাজাতে চলে গিয়েছিল দূর গাঁয়ে। তখন সোনামণি, একা সোনামণি বন-বাদাড়ে, ঝোপে-জঙ্গলে কচু কদু খুঁজে মরছে। তখন হনুমানটা গাছ থেকে লাফ দিয়ে একেবারে সামনে নেমে ভূতের মতো পথ আগলে দাঁড়িয়ে থাকল। আর যায় কোথায় সোনামণি। সে ঝোপের ভেতর থেকে বলল, অঃ ভালোমানুষের ছা, দেখ তো গাছে ওটা কী? আর যখন লোকটা গাছ দেখতে গিয়ে বলল, কই কোথাও তো কিছু দেখতে পেছি রে, সোনামণি, কই রে, কী দেখালি তুই, কী দেখাবি তুই আমারে…’ তখন সোনামণি তাড়াতাড়ি ঝোপ থেকে বের হবার ফাঁক খুজছে। বের হবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে। সব লতাপাতার ঝোপ। কোনোরকমে লতাপাতা গা থেকে সরিয়ে মাঠে নেমে যাবার চেষ্টা করছে। এবং বলছে, দ্যাখ দ্যাখ গাছের মাথায় পাখি, পাখিটা ডিম পাড়ছে দ্যাখ। কিন্তু হায়, মানুষটা গাছ দেখছে না, সে সোনামণিকে দেখছে-’আমি বলি ঝোপের ভিতর কী খচখচ করে, দেখি নিশির বউ সোনামণি। বলে মুখটা ঝোপের কাছে নিয়ে হা হা করে হেসে উঠল। কথা শুনে সোনামণি বলল, অত হাস্য ভালো লয় শশী। কেমন শুকনো গলায় কথাটা বলল এবং ঝোপের ভিতর একটা পাখি হয়ে বসে থাকল। চিৎকার করতে পারল না। কেউ কোথাও নেই। এই ভর দুপুরে এত বড়ো মাঠে খরা বলে কেউ নেই। আগুন জ্বলছে মাঠে, শশীর সুদের কথা মনে হল। সঙ্গে সঙ্গে শশী সেই যেন এক আলিসান ভুজঙ্গ হামাগুড়ি দিয়ে ঝোপের ভিতর ঢুকতে চাইছে। সোনামণি বলল, অ মা গ! বলে ফুড়ত করে মাঠের ভিতর উড়ে যেতেই খপ করে আলিসান ভুজঙ্গটা ওর একটা পা কামড়ে ধরল যেন। ‘পাখি গাছে ডিম পাড়ে, বড়ো বড়ো ডিম, মুরগির মতো ডিম। তারপর সোনামণির শরীরের ভিতর কোথাও না কোথাও ডিম আছে, মুরগির ডিম লুকানো আছে, সোনামণি শরীরে মুরগির ডিম লুকিয়ে রেখেছে—আর যায় কোথায়, শশী ডিমের জন্য, ডিম বের করার লালসায় ওকে তছনছ করে দিতে গিয়ে দেখল, সোনামণি ওর হাতে কামড় বসিয়ে দিয়েছে।
সোনামণির চোখ দুটো কাল-ভুজঙ্গের মতো ফোঁস ফোঁস করছিল তখন। সোনামণির কাণ্ডজ্ঞান ছিল না। কচু কদু ফেলে সোনামণি একসময় ছুটতে থাকল।
নিশি এখনও পাশে বসে রসেছে। ওকে সোনামণি টান মেরে উলঙ্গ করে দিল। সে রাগে দুঃখে প্রায় কথা বলতে পারছিল না। সোনামণিকে বড়ো ভয় তার। তবু কাতর গলায় বলল, আমি ঢোল বাজাই, পাপ ফেলে পুণ্য আনি, তু আমারে সোনামণি উলঙ্গ করে দিলি।
সোনামণি ধান দেখে রসে বশে আছে। ওর সব দুঃখ কষ্ট এই ধান, এত ধান হরণ করে নিয়েছে। সে উল্লাসে প্রায় নীচু গলায় গান ধরে ছিল, হায় মা, কে কার তরে চুরি করে হে মা ঈশ্বরী। তারপর বলল, কত সোনার চান্দে পরান কান্দে…অ নিশি তু আমারে মেরে ফেল রে।
কীসে কী কথা হয়, নিশি বোঝে না। সোনামণি এখন প্রায় পাগলের মতো হাসছে। কথা বলছে। কথা তো নয়, যেন সুর ধরে চড়ক পূজার দিনে মেলার শুনি মাসির মতো কণ্ঠ খুলে দিয়েছে। বিরক্ত হয়ে নিশি বলল, তর পরান এত উথাল পাথাল করে কেন রে সোনামণি?
তখনই খামারবাড়িতে কার গলা যেন হেঁকে উঠল, ও সামুতে কার গলা পাই হে। এত রাতে কার গলা পাই হে।
সোনামণি গলা চিনতে পেরে বলল, হেই হেই নিশি, কী বুলছে শুনে লিচ্ছিস।
কী বুলছে?
বুলছে, কার গলা পাই হে।
নিশি, দুবলা নিশি তাড়াতাড়ি করে মাথায় পোঁটলা তুলে ছুটতে থাকল। মেয়ে দুটো বাপের পেছনে ছুটতে থাকল। যাবার সময় নিশি বলছিল, বুলেছি না অত হাস্য ভালো লয়।
ও সামুতে কে কথা বলে হে? জবাব লেই কেন হে।
অন্ধকারে মনে হল শশী দানবের মতো থপথপ করে খামারবাড়ি থেকে নেমে আসছে। আকালের ঘণ্টা ওর হাতে এখন বাঁধা নেই। অথবা মনে হল, কালো কুচকুচে এক ভুজঙ্গ পাখি ধরার জন্য নেমে আসছে। সে খুব জোরে হাঁকছিল না। কারণ ফাঁদের ভেতরে পাখি ধরা পড়েছে—ও যেন গলা শুনে আকালের ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে সব টের পাচ্ছিল। সুতরাং সে চোর চোর বলে জোরে পর্যন্ত চেঁচাল না।
