কে তাড়া করল? জমির মালিক?
ধুস! একটা শাদা খরিস।
খরিস?
সে না দেখলে তার বিশাল ফণা কত বড়ো হতে পারে বিশ্বাস করতে পারবেন। হাত দুই দূরে ফণা তুলে আমার মুখের সামনে দুলছে। আমি চোখ খুলে আছি। সারা অঙ্গ অবশ। দূরে পালাচ্ছে সবাই। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। যেন বলছে, কি, আর চুরি করবে?
গৌরাঙ্গবাবু বললেন, যান মশাই, ও সময় এসব কথা মনে হয়। মস্তিষ্কের ঘিলু তো গলে যাবার কথা!
জানি না, এটাই আমার মনে হয়েছিল, বাস্তু সাপটাপ নাকি এমন করে! শুধু বিড় বিড় করে বলছি, দোহাই আস্তিক মুনি। জানি একটু নড়লেই আমার মাথায় ছোবল বসাবে। নড়ছি না আর তখনই কী না…
কী তখন?
দেখলাম কোত্থেকে একটা বিশাল পাখি উড়ে এল! একটা বাজপাখি। এসেই গলার কাছে সাপটে ধরতেই আমি ছুটে পালাব ভাবলাম। কিন্তু এ কি! সাপটা বিশাল লেজ দিয়ে পাখিটার পা পাখা সব জড়িয়ে ধরেছে। খণ্ডযুদ্ধ। আমার সব বন্ধুদের ডাকছি। দেখছি কেউ নেই। দূরে দাঁড়িয়ে দেখছি বাজপাখির হিংস্র চোখ জ্বলছে। সাপের হিংস্র চোখ জ্বলছে। পাখিটা কিছুতেই গলার কাছে লেজ আনতে দিচ্ছে না। গলা বাঁকিয়ে ফণায় মাথায় ঠুকরে সাপের মগজ থেকে ঘিলু তুলে নিতেই বিশাল সেই দানব এলিয়ে পড়ল। এযারে পাখিটার শরীর থেকে সব প্যাঁচ
খুলে গেল। পাখিটা সাপটাকে নিয়ে অনায়াসে উড়ে যাচ্ছে। এমন ভয়ংকর দৃশ্য আমি জীবনে দেখিনি। এমন ভয়ংকর সৌন্দর্য জীবনে অনুভব করিনি! বিশাল আকাশের নীচে অবলীলায় উড়ে যাচ্ছে।
গল্পটা শোনার পর গৌরাঙ্গবাবু বললেন, আদিমকাল থেকেই এটা চলছে। সবলেরা বেঁচে থাকে। দুর্বলেরা চলে যায়।
আমি শুধু বললাম, এজন্য লণ্ঠনওয়ালার খোঁজে আর আমি যাইনি। সে যখন
বাড়ি জমি বিক্রি করে দেখা করতে এসেছিল, আমি তার সঙ্গে দেখাও করিনি। কারণ সব নষ্টের মূলে আমি। ওর উৎখাত হওয়ার মূলে আমি। আমার স্ত্রীকে বলে গেছিল একসঙ্গে এত টাকা নাকি সে জীবনেও দেখেনি।
গৌরাঙ্গবাবু বললেন, আপনি না এলেও তাকে উৎখাত হতে হত। পৃথিবীতে সবসময় একজন আর একজনকে তাড়া করছে।
এক হাত গণ্ডারের ছবি
চার্চের ঠিক সামনে এক পাগল। সে হাঁকছিল, ‘দু-ঘরের মাঝে অথৈ সমুদ্র। ওর হাতে লাঠি এবং লাঠিতে পাখির পালক বাঁধা। মাথায় লাল রুমাল। দূরে বেরন। হোটেলের পর্দা উড়ছে। পাগল চার্চের সদর দরজা থেকে বেরন হোটেলের দরজা পর্যন্ত ছুটে আসছিল বার বার আর ডিগবাজি খাচ্ছিল। সে কোনো যানবাহন। দেখছিল না, সে এক পাগলিনির জন্য যেন প্রতীক্ষা করছিল কারণ পাগলিনি অন্য পারে ঠিক পেচ্ছাবখানার পাশে এবং কিছুদূর হেঁটে গেলে অনেক কাপড়ের দোকান, ছায়া স্টোরস অথবা হরলালকা আর গ্রীষ্মের দিন বলে প্রখর উত্তাপে পাগলিনী নগ্ন এবং বধির, পাগলিনি পথের উপর বসে পড়ল।
ঠিক তখন চার্চের দরজার সামনে শববাহী শকট। সোনালি ঝালরের কাজ করা কালো কফিনে মৃত পুরুষ এবং কত ফুল। শোকের পোশাক পরা যুবক যুবতীরা, বৃদ্ধেরা সদর দরজা ধরে ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। সকাল হচ্ছে। সূর্য দেখা যাচ্ছে না। বড়ো বড়ো গাছের মাথায় সূর্য অকারণ কিরণ দিচ্ছে। তখন পাগল হাঁক দিয়ে সকলকে যেন ডেকে বলছিল, কে আসবি আয়, সংক্রান্তির মাদল বাজছে আয়। অথবা নানারকমের অশ্লীল আলাপ, যা শোনা যায় না, যার জন্য পথে হাঁটা দায়। তখন পথ ধরে কোটিপতি পুরুষের স্ত্রী দামি গাড়িতে নিউ মার্কেট যাচ্ছে। পথে দেবদারুগাছ এবং গাছের ছায়া পাগলিনির মুখে। পাগল ঊর্ধবাহু হয়ে পাখির পালক ওড়াচ্ছে আকাশে। পাগলিনি বসেছিল, আর উঠছে না। এইসব দৃশ্য এ অঞ্চলে হামেশাই ঘটছে, পুলিশের প্রহরা এবং তীর্যক সব দৃষ্টির জন্য যানবাহন থেমে থাকছে না। বড় নোংরা এই অঞ্চল। দেয়ালে দেয়ালে বিচিত্র সব নগ্ন দৃশ্য চিত্রতারকাদের এবং রাজাবাজার পর্যন্ত অকারণ অশ্লীলতা। হামেশাই পথে ঘাটে নগ্ন যুবতীরা পাগলিনি প্রায় শুয়ে থাকছে। সব অসহ্য।
এবং মনে হয় এরা সকলে রাতে ফুটপাথে নিশিযাপন করেছিল। এখন এরা নিজেদের ছেড়া কাঁথার সঞ্চয় ছেড়ে রোজগারের জন্য বের হয়ে পড়বে। পাগল তার সঞ্চয় সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে ঘুরছিল। কিছুই ফেলা যায় না। সে নারকেলের মালা এবং সিগারেটের বাক্স দিয়ে মালা গেঁথে গলায় পয়েছিল। পিঠে পুরাতন জামার নীচে পচা ঘায়ের গন্ধ। সে শুধু এখন হাসছিল। পথে লোকের ভিড় বাড়ছে, ট্রাম বাসের ভিড় বাড়ছে। মানুষের মিছিল সারা দিনমান চলবে। পাগল হেসে হেসে সকলকে উদ্দেশ করে বলছিল, দু-ঘরের মাঝে অথৈ সমুদ্দুর। সে এখন অন্য কোনো সংলাপ আর খুঁজে পাচ্ছিল না।
গ্রীষ্মের প্রখর উত্তাপ এবং ছায়াবিহীন এই পথ। ফুটপাথে অথবা গাড়ি বারান্দায় যারা রাত যাপন করছে, যারা ঠিকানাবিহীন, যাদের সব তৈজসপত্র ঘেঁড়া, নোংরা এবং প্রাচীনকাল থেকে সব সংরক্ষণ করছে নগরীর সেইসব প্রাচীন রক্ষীরা এখন অন্নের জন্য ফেরেববাজের মতো ঘোরাফেরা করছে। ছেঁড়া সব তৈজসপত্রের ভিতর এক অতিকায় বৃদ্ধ, মুখে দাড়ি শণপাটের মতো এবং সাদা মিহি চুল আর অবয়বে রবীন্দ্রনাথের মতো যে, কপালে হাত রেখে গ্রীষ্মের সূর্যকে দেখার চেষ্টা করছে।
অন্য ফুটপাথে পাগল ঊর্ধ্ববাহু হয়ে আছে। ওর এই পাগলকে যেন কতকাল থেকে চেনা। বড়ো স্বার্থপর-বৃদ্ধ এই ইচ্ছাকৃত পাগলামির জন্য একদিন রাতে তখন নগরীর সকল মানুষেরা ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন হাসপাতালের বড়ো আলোটা পর্যন্ত নিভে গিয়েছিল, রাজবাড়ির সদর বন্ধ হচ্ছে এবং যখন শেষ ট্রাম চলে গেল, যানবাহন বলতে পথে কোনো কপর্দক পড়ে নেই….সব নিঃশেষ, শুধু কুকুরের মাঝে মাঝে আর্ত চিৎকার তখন পাগল ওই পাগলিনির পাশে শুয়ে নোংরা তৈজসপত্রের ভিতর থেকে ছোটো ছোটো উচ্ছিষ্ট হাড় (আমজাদিয়া অথবা বেরন হোটেল থেকে সংগ্রহ করা) দুজনে চুষছিল, রাতের দ্বিপ্রহরে ওদের উদরে মাংসের রস যাচ্ছে, ওরা সারা দিনমান পাগলামির জন্য ফের প্রস্তুত হতে পারছে–বৃদ্ধ হাঁ করে দেখতে দেখতে বলেছিল, এই সরে বোস, এটা পাগলামির জায়গা নয়। ঘুমোতে দে। রাজ্যের সব নোংরা এনে জড় করেছিস?
