হাত মুখ ধুলে জরুরী কথা, সেই এক কথা—সম্বন্ধটার কি করলি! পাত্রপক্ষ পণ চাইছে। দাবী-দাওয়া অনেক। এমন পাত্র ছাড়াও যাবে না। ওদের কল্যাণীকে খুব পছন্দ হয়েছে। সতীশ দাদার কথা বোধহয় ভালোভাবে শুনতে পাচ্ছিল না। সে বাবুলকে দেখেছে, বাবুল তাক থেকে কি সব নামাচ্ছে। কাঁচের পাত্র হলে ভেঙে যাবার ভয়। দাদার সামনে খুব জোরে সে ধমকও দিতে পারছে না। দাদা আহত হতে পারেন। সে খুব নরম গলায় বলল, বাবুল তুমি নীচে নেমে এস। পড়ে যাবে। পড়ে গেলে হাত-পা ভাঙবে। বাবুল কথা শুনছে না। জ্যাঠামশাইকে দেখে ওর বেজায় সাহস বেড়ে গেছে। রাগে সতীশের মাথায় রক্ত উঠে আসছে। তখন দাদা বললেন, সকলে তোমার আশায় আছে। যদি তুমি মত না দাও তবে এ পাত্রটিও হাত ছাড়া হয়ে যাবে।
সতীশের দু’হাত তুলে চীৎকার করতে ইচ্ছা হলো, আমাকে তোমরা কি ভাব! আমি কি চুরি করব! আমাকে তোমরা চুরি করতে বলছ! আমার কি আছে! আমি কোথা থেকে এত টাকা পাব। সতীশ অথচ ক্ষোভে এবং দুঃখে জবাব দিতে পারল না। সে মাথা নীচু করে বসে থাকল। এবং ধীরে ধীরে বলল, দেখি কি করতে পারি। দাদা চলে গেলে হতাশ মুখে ঘরে ঢুকল সতীশ। ওর চোখ মুখ টানছে। ক্লান্তিকর জীবন এবং সারাদিনের খণ্ড খণ্ড হঠকারী ঘটনা ওকে কিছুতেই স্থির থাকতে দিচ্ছে না। বাবুলের উপর রাগটা কিছুতেই মরছে না। বাবুলের কাছে সতীশ বুঝি ধরা পড়ে গেছে। কাপুরুষের মতো চোখ যার, যার মাথা উঁচু নয়—সে মেলা থেকে কি করে রাজার টুপি কিনবে। সে চেষ্টা করছিল ভেতরের রাগটা দমন করতে। ভেতরের রাগ দমন হলে বাবুলকে পড়তে বলবে। কিন্তু ঘরে ঢুকতেই সুরমা সতীশকে অভিযোগ করল, তুমি বারণ করে গেছিলে ছেলেমেয়েকে বাইরে বের হতে। দেখবে কোনদিন ওরা জলে ডুবে মরে থাকবে। দুপুরে কোন ফাঁকে বের হয়ে গেছে।
সতীশ এবার দু’হাত উপরে তুলে ছুটে গেল। যেন সে মেরে ফেলবে বাবুলকে। সে বলল, বাবুল তুমি বাইরে গিয়েছিলে, পুকুরে গিয়েছিলে! সতীশের এক ভয়, নিরন্তর এক ভয়। বাবা আজ তাকে মারবে বুঝে বাবুল ছুটে বারান্দায় চলে গেল। সতীশ বারান্দায় গেলে বাবুল ঘরে। ঘর বারান্দা, দুই দরজা দিয়ে সামান্য এক বাবুল। সতীশকে ঘর আর বারান্দায় ছুটিয়ে মারছে। বাবা কেমন এক দৈত্য হয়ে গেছে। সে ছুটছিল আর বলছিল, বাবা আর যাব না। তোমার পায়ে পড়ছি বাবা আমি আর যাব। সে হাউ হাউ করে কাঁদছিল। সতীশ চীৎকার করছিল, বাবুল তুমি ছুটবে না। বাবুল তত বলছিল, তুমি আমাকে মেরো না বাবা, আমি আর যাব না। কিন্তু হায় কে কাকে রক্ষা করে—সতীশ ছুটতে ছুটতে সত্যিই অমানুষ হয়ে গেল অথবা এক দৈত্য, সে বাবুলের চুল ধরে ফেলল, তারপর দু’হাতে উপরে তুলে দোলাতে থাকল আর নির্মম আঘাতে আঘাতে ওকে জর্জরিত করল। সুরমা ছুটে এসে ধরে ফেলল, তুমি কি পশু হয়ে গেছ, তুমি কি ছেলেটাকে মেরে ফেলবে?
মিন্টু তখন খাটের নীচে চলে গেছে। কারণ বাবুলের হয়ে গেলেই বাবার মিন্টুর কথা মনে পড়তে পারে।
খেতে বসে সতীশ বলল, ওদের দিলে না?
-তোমার দেরি দেখে ওদের খাইয়ে দিয়েছি।
সতীশ থালায় বড় পুঁটিমাছ ভাজা দেখে বলল, মাছ! কে মাছ দিল! কারণ সতীশের মাছ সপ্তাহে দু’দিন, একদিন ডিম এবং রবিবারে মাংস। বাবুলের মাছ না হলে। হয় না। কিন্তু সতীশকে বাজেট রক্ষা করতে সপ্তাহে তিন দিন নিরামিষ খেতেই হয়। নিরামিষ খাবার কথা! বড় পুঁটিমাছ দেখে সতীশ তাজ্জব বনে গেল।
সুরমা বলল, তোমার ছেলের কাণ্ড। পুকুর থেকে দারোয়ানদের কেউ মাছ রছিল। ওকে তিনটে মাছ দিয়েছে।
—ওকে দিয়েছে না, ও চেয়ে এনেছে।
—সে আমি জানি না। মাছ দিয়ে বলল, একটা বাবা খাবে। একটা আমি খাব। সতীশের গলায় মনে হলো ভাত আটকে যাচ্ছে। সুরমা মাছ প্রসঙ্গে এত বলছিল যে সতীশের গলায় ভাত আটকে যাচ্ছে। জানো! সুরমা বড় বড় চোখ করে বলল, বড় মাছটা বাবা খাবে। জানো! সুরমা এবার ডালের বাটি এগিয়ে দেবার সময় বলল, বিকেলে সারাক্ষণ ছুটে এসে দেখে গেছে মাছ ঠিকমত রেখেছি কিনানা বেড়ালে বাদুড়ে খেয়ে নিল—ওর কি উদ্যম এই মাস্ত্রে জন্য, কোথায় রেখেছি, কি ভাবে রেখেছি–কি উৎসাহ ছেলের-বড় মাছটা ওকে খেতে দিলে খেল না, তোমার জন্য তুলে রেখে দিলবাবা খাবে।
সতীশের কি যেন কষ্ট ভিতরে। এবার যথার্থই গলায় ভাত আটকে গেল। সে জল খেল ক ক করে। সে ভাতগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকল। কোথায় এই বর্ষার রাতে একটা ব্যাঙ ডাকছে। সতীশের ভীষণ কান্না পাচ্ছে। কে এই শিশু কি তার পরিচয়সারা সংসার জুড়ে সে যেন কেবল দাপাদাপি করে বেড়ায়। এখন মনে হলো সে নিষ্ঠুর এবং ভয়ঙ্কর ভাবে অসহায়। যত অসহ্য বোধ করছে তত এই সংসারের সবকিছু অপ্রীতিকর ঠেকছে। সুরমার রুগ্ন মুখ বাবুলের অসহায় চোখ এবং দাবদাহের মতো এই সংসার নিয়ত ওকে ভীত বিহ্বল করে দিচ্ছে। সে ভয়ে খেতে পারল না। বাবুলের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণে ওর ভিতরে ভিতরে জলের স্রোতের মতো এক কান্না এল। সে আবেগে কেমন অস্থির হয়ে উঠল এবং যেখানে বাবুল কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ওকে বুকে তুলে যেমন অন্যদিন নিজের বিছানায় নিয়ে আসে, বুকে নিয়ে শুয়ে থাকে এবং দু’হাতে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে, তেমন—এখন সেই ভালোবাসায় সন্তানের মতো দেখতে গিয়ে মনে হলো, পিঠে বড় বড় দাগ, ফুলে কেটে গেছে। অন্ধকারে রক্তপাত হচ্ছিল। সতীশ সেই মানুষের মতো, হায় এক মানুষ ক্রীতদাস-প্রায় মানুষ। সতীশ পাগলের মতো ওর পিঠে মুখে ভালবাসার হাত ছড়িয়ে দিতেই চাপ চাপ রক্ত। সে তার দুই নরকপ্রায় হাত নিয়ে ছুটে গেল, দ্যাখো সুরমা আমি কি করেছি। ক্ষতস্থানে হাত পড়তেই বাবুল ককিয়ে উঠল। এক অমানুষ, ভিতরে এক অমানুষ কেবল খেলা করে বেড়ায়। সতীশ দু’হাত সুরমার মুখের সামনে ধরে চীৎকার করে উঠল, আমি কি করেছি দ্যাখো।
