জবাব না দিয়ে অর্চনা ভয়ে ভয়ে দরজার দিকেই তাকাল আবার।
…তা শোন, আমি বলছিলাম ওর সঙ্গেই তোর বিয়ের কথাটা পেড়ে দেখি। তোর কি মত?
বাবার কাছে সর্ব বিষয়ে নিজের মতামতটা স্পষ্ট ব্যক্ত করতেই অভ্যস্ত সে। কিন্তু বাবার কাণ্ডই আলাদা, এও যেন বইয়ের আলোচনা একটা। লজ্জায় অর্চনা ঘেমে ওঠার দাখিল। কিন্তু এবারে জবাব না দিয়েও উপায় নেই, বাবার যা বলার বলা হয়ে গেছে।
অর্চনা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল, তার পরে মোড়া ছেড়ে দ্রুত দরজার দিকে পা বাড়াল।
খুশীতে ভদ্রলোক টুকরো পোড়া চুরুটটা মুখে তুলে নিলেন।
বাইরে এসে হাঁপ ফেলতে গিয়ে অর্চনা থমকে দাঁড়াল। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁত। হাতে চুরুটের বাক্স। তার মুখে খুণীর চাপা অভিব্যক্তি, এবং সেই খুশীর কারণে সে চুরুটের বাক্স থেকে একটা চুরুট সরিয়ে সবে পকেটে পুরছে।
দাশু মুখ তুলেই দেখে সামনে দিদিমণি। চুরি ধরা পড়ে গেল।
অর্চনা ভ্রুকুটি করে তাকাল তার দিকে, দাঁড়াও বাবাকে বলছি—
বিব্রত গোবেচারী মুখ দাশুর।
ছদ্ম রাগে অর্চনা তার পাশ কাটাতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ল। খোলা চুরুটের বাক্স থেকে আর একটা চুরুট তুলে নিয়ে দাশুর বুকপকেটে গুঁজে দিয়েই হন হন করে এগিয়ে গেল। হাস্যবদন দাশু ঘুরে দাঁড়াল, আর খানিকটা গিয়ে ফিরে তাকাল অর্চনাও। তার মুখভরা হাসি।
ঘোষণা যা করার সেটা অতঃপর ডক্টর বাই করেছেন। আর সেটা করেছেন সুখেন্দুকে নিজের ঘরে ডেকে কথাবর্তা বলে এবং তার সম্মতি নিয়ে তার পর। শুনে তার গৃহিণী স্তব্ধ পাথর। বিজন বিস্ময়াহত।
মায়ের সামনা-সামনি অর্চনা মুখখানা এমন করেছে যেন অবুঝ বাবা হাত-পা বেঁধে তাকে জলে ফেলারই ব্যবস্থা করছেন। কিন্তু তাতেও মাকে তুষ্ট করা সম্ভব হয়নি, বাপের সঙ্গে মেয়ের চক্রান্তটা বুঝেছেন তিনি।
বাড়ির এই হাওয়াটা একটু গোলমেলে ঠেকল ননিমাধবের কাছেও।… বিজুদার হাবভাবে কেমন যেন সঙ্কোচ একটু! কাজের কথা ছাড়া কাছে ঘেষতে চায় না, কাচুমাচু ভাব, বাড়ি গেলে বরুণা রাণু বউদিও কেমন এড়িয়ে চলে। আর, যার প্রত্যাশায় যাওয়া তার তো দেখাই মেলে না। এমন কি, তার মায়েরও না।
ষষ্ঠ চেতনার কারিগরি কি না বলা যায় না, বিকেলের দিকে সেদিন সে এসেও হাজির বড় মর্মান্তিক ক্ষণে। মনে হল নিচের ঘরটা একটু বেশি পরিপাটি সাজানো গোজানো। সেই নিরিবিলিতে বসে একটু পড়ছিল রাণু বউদি, ওকে দেখে চমকেই উঠল যেন। ননিমাধব নিশ্চিন্ত মনে পড়তেই বলেছিল তাকে, তবু কতটিকে খবর দেবার জন্যে প্রায় শশব্যন্তেই পালিয়েছে সে। বরুণাও বউদির উদ্দেশে বকাবকি করতে করতেই একবার ঘরে ঢুকেছিল! বউদির বদলে ওকে দেখেই অন্ত, বিব্রত। দাদাকে খবর দেবার অছিলায় সেও দ্রুত প্রস্থান করেছে। ওদিক থেকে মিসেস বানুর গলা শোনা গেছে। কাজের সময় সকলের অলস নিশ্চিন্ততার কারণে ক্ষোভ তাঁর। এমন কি, ওপর থেকে কর্তার গলাও শোনা গেল, কতক্ষণের মধ্যে কে এসে পড়বে সেই কথা জানাচ্ছেন।
অন্যমনস্কর মত একটা সিগারেট ধরিয়ে খালি প্যাকেটটা জানালা গলিয়ে ফেলতেই ওদিক থেকে যে-মূর্তিটি মুখ তুলল, সে দাশ। জানালার ওপাশে বসে আয়েস করে বিড়ি টানছিল সে। কীর সামনে পড়লেই তো ছোটাছুটির একশেষ, সবে ফুরসৎ পেয়ে আড়ালে সরেছিল।
…ও তুমি–
জবাব না দিয়ে গম্ভীর মুখেই দাশু আবার জানালার ধারে বসে পড়েছে। ঘরে কে আছে বাইরে গাড়ি দেখেই বুঝেছিল।
কিন্তু ব্যতিক্রমটা বড় বেশি স্পষ্ট লাগছে। ননিমাধব দাশুকে না ডেকে নিজেই বাইরে এসে দাঁড়াল। বিড়ি ফেলে দাও প্রস্তুত।
আচ্ছা দাশু…এঁরা সবাই একটু ব্যস্ত দেখছি যেন, কি ব্যাপার? কি কথাবার্তা হচ্ছে শুনলাম
দাশু সাদাসিধে জবাব দিল, হা, দিদিমণির বিয়ের কথাবার্তা–বড় দিদিমণির।
ননিমাধবের সঙিন অবস্থা।–কার সঙ্গে, মানে কে বলছে কথা?
সকলেই। মা, বাবু, দাদাবাবু—
একটু আশ্বস্ত।–দাদাবাবু বলছেন?
দাশু নিস্পৃহ।–দাদাবাবুই তো সব থেকে বেশি রাগারাগি করছিলেন।
ননিমাধব হকচকিয়ে গেল আবারও।– রাগারাগি কেন?
আর বেশি সংকটের মধ্যে রাখতে দাশুরও মায়া হল বোধ হয়। ঘ্যাঁচ করে খাঁড়াটা এবারে বসিয়েই দিল সে। ওই মাস্টারবাবুর সঙ্গেই দিদিমণির বিয়ে ঠিক হয়ে গেল–তাই আজ আশীর্বাদ।
ননিমাধব পাংশু হতভম্ব বেশ কিছুক্ষণ।
হাতের আস্ত সিগারেটটা ফেলে দিয়ে এক-পা দু-পা করে গাড়িতে গিয়ে উঠল।… চালকের আসনে।
ইতিমধ্যে ড্রাইভিংটা শিখে নিয়েছে।
৫. অর্চনার বিয়ে হয়ে গেল
০৫.
অর্চনার বিয়ে হয়ে গেল।
সংসারে কর্ত্রী পিসিমা। সুখেন্দুর বাবারও বড়। বাবা অনেককাল বিগত। সুখেন্দুর ছাত্রজীবনের শেষ দু বছর এই পিসিমাই দূরে থেকে তার আর তার মায়ের ব্যয়ভার বহন করেছেন। নইলে বি. এ. পাশ করেই সুখেন্দুকে চাকরির চেষ্টা দেখতে হত, এম এ. পড়া হত না। বাবা মারা যাবার পর পিসিমা মাঝে মাঝে এই সংসারে এসে এক মাস দু-মাস থাকতেন। বি. এ. পাশ করার পর ভাইপোকে পড়া ছেড়ে শুকনো মুখে চাকরির কথা ভাবতে দেখে তিনিই জোর করে ওর আরো পড়ার ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সময় সুখেন্দু পাকাপাকি ভাবে পিসিমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। শেষ জীবনটা পিসিমা হরিদ্বারে কাটাবেন স্থির করেছিলেন। সেখানকার এক আশ্রমে তার বড় জা থাকেন, বহুবার তিনি সেখানে আহ্বান জানিয়েছেন। পিসিমাকে কলকাতায় নিয়ে আসার সময় সুখেন্দুও তার হরিদ্বারে থাকার ইচ্ছেয় আপত্তি করেনি। কথা ছিল, তার মা কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলে তিনি যাবেন।
