কিন্তু কথার মাঝে তাঁকেই হঠাৎ থেমে যেতে হল। একটু আগে জলন্ত ধুনুচি হাতে দাণ্ড ব্যস্তসমস্ত ভাবে ঘরে ঢুকেছিল। ঘরে ধুনো দেওয়া আর কোণের তাকে বুদ্ধমূর্তির কাছে ধুনুচি রেখে প্রণাম করাটা তার নৈমিত্তিক সান্ধ্য কাজ। আর প্রণামটা বুদ্ধমুর্তি বলে নয়, ঠাকুর-দেবতা বা সেই সদৃশ মূর্তি দেখলেই করে থাকে। তাকে ঢুকতে দেখা গেছে, কিন্তু বেরুলো কি না সেটা মিসেস বাসু লক্ষ্য করেননি। এবারে থেমে গিয়ে লক্ষ্য করলেন। তাকের বুদ্ধমূর্তির সামনে ধুনুচি রেখে জোড় হাতে মাথা রেখে দাশু প্রণাম করেই আছে। অর্চনার হাসি চাপা দায়। এদিকের সাড়াশব্দ না পেয়ে দাশু আস্তে আস্তে মুখ তুলতেই কীর সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময়।
বেরো এখান থেকে, এক ঘণ্টা ধরে প্রণামই করছে!
ধুনুচি হাতে দাশুর শশব্যস্ত প্রস্থান।
মাকে আবার প্রস্তুত হতে দেখে অর্চনা হাসি সামলে গম্ভীর হল কোন প্রকারে।
…হ্যাঁ, যা বলব ভাবছিলাম তোকে, তোর বাবার একেবারে ভীমরতি ধরেছে। একটু আধটু আলাপ-সালাপ কত লোকের সঙ্গেই হয়, তা বলে ওই মাস্টারই নাকি খুব ভাল ছেলে, তার সঙ্গে তোর বিয়ের কথা পড়তে চায়।
রাত বলেই রক্ষা, শোনামাত্ৰ অৰ্চনার মুখের রঙ বদল হয়েছিল কি না ধরা পড়ল না। আচমকা খুশীর আলোড়ন গোপন করার জন্য তরল বিস্ময়ে নাকমুখ কুঁচকে ফেলল একেবারে, এ-মা, তাই নাকি?
অভিব্যক্তি দেখে মা একটু হয়তো আশ্বস্তই হলেন। আরো ঝুঁকে বসে মেয়েকে সংসার বিষয়ে একটু সচেতন করার উদ্দেশ্যে নিজের সংসার-জীবনের কষ্টক্লিষ্ট অভিজ্ঞতার সমাচার ব্যক্ত করতে ভুললেন না। মাস্টারের সংসার সচল রাখা যে কত কষ্টের সে শুধু উনিই জানেন, এর ওপর শেষজীবনে কি আছে কপালে কে জানে। পেনশনের তো ওই ক’টি টাকা, উনি দিন-রাত ঘাড়ে চেপে এটা ওটা লিখিয়ে কোনরকমে সংসারযাত্রা নির্বাহ করছেন–কত যে ভাল সে আর কে বুঝবে। তা ছাড়া বই লেখাও তো সকলের কম্ম নয়, ইত্যাদি ইত্যাদি। উপসংহারে মেয়েকে সতর্ক করে দিলেন, তোর কাছে বলতে এলে খবরদার কান পাসি না।
অর্চনা বলল, তুমি ক্ষেপেছ মা?
টেবিল থেকে পড়ার বই হাতে তুলে নিয়েছে সে। প্রকাশ, তার পড়াশুনার ড়াটাই আপাতত বেশি। মা বর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বইটা টবিলের ওপরেই আছড়ে ফেলেছে আবার। উঠে সটান বিছানায় শুয়ে পড়েছে। বরুণাটা এক্ষুনি এসে হাজির হবে ভেবেই তাড়াতাড়ি আবার চেয়ারে এসে বসেছে।
মিসেস বাসু শুধু মেয়েকে সতর্ক করেই নিশ্চিন্ত হতে পারেননি, সেই রাতেই স্বামীকেও একটু-আধটু সমঝে দিতে চেষ্টা করেছিলেন। গাড়ি কেনার প্রসঙ্গে ননিমাধবের সম্বন্ধে ছেলের উক্তিটাই স-পল্লবে আগে সমর্থন করে নিয়েছেন। শুধু বাড়ির অবস্থাই ভাল নয়, ছেলেটাও যে কাজের সেটা এতদিন বোঝেননি বলে একটু আক্ষেপও করেছেন। আর শেষে, বিয়েটা যে ছেলেখেলা নয়, গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার একটা–সেই প্রসঙ্গে ছোটখাটো ভাষণ দিয়ে বলেছেন, কর্তাটি যা বোঝেন না তাতে যেন মাথা ঘামাতে না আসেন, অথবা কাউকে কোনরকম আবোলতাবোল প্রশ্রয় দিয়ে না বসেন।
ফল উল্টো হল।
এই এক মাসের মধ্যে সমস্যাটা ঠিক স্মরণের মধ্যে ছিল না ভদ্রলোকের। মনে পড়ল। স্ত্রীর সব কথাই শুনতে হয় বলে শোনেন, কিন্তু করণীয় যা সেটা বেশির ভাগই নিজের মত অনুযায়ী করেন। অন্তত গুরুতর কোন ব্যাপারে স্ত্রীর মত। মতের ওপর তার আস্থা কমই। এদিক থেকে স্ত্রী একটা যথার্থ কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তাকে, বিয়ে তো ছেলেমানুষি ব্যাপার নয়। নয় বলেই ভাবনা। তার ওপর গাড়ি কেনার দরুন হঠাৎ আবার যে ছেলেটার প্রশংসার সূচনা, তাও চিন্তার কারণ একটু।
পরদিন সকালে বই পড়তে পড়তেও এই সমস্যাটাই থেকে থেকে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল। টেবিলের ওপর চুরুটের সামান্য একটু নেভানো অংশ পড়ে আছে। সেই কখন বাক্স নিয়ে দাশু দোকানে গেছে চুরুট ভরে আনতে, এখনো দেখা নেই। চুরুটের অভাবে ভাবা বা পড়া কোনটাই সুস্থির মত হচ্ছে না। বিরক্ত হয়ে শেষে দাশুর উদ্দেশে হাঁক-ডাক শুরু করে দিলেন তিনি।
তাই শুনে ওদিকের ঘর থেকে অর্চনা উঠে এলো। বইয়ের ওপর চোখ রেখে তিনি হাত বাড়ালেন।
কি বাবা?
ও তুই… দাশুটা গেল কোথায়, আর কেউ কোথাও পাঠিয়েছে?
টেবিলে চুরুটের বাক্স না দেখে অর্চনা বুঝল দাশুর খোঁজে বাবা অত গরম কেন। বলল, আচ্ছা আমি দেখছি–
সে দরজার দিকে এগোতে কি ভেবে তিনি বাধা দিলেন, থাক তোকে দেখতে হবে না, এদিকে আয় কথা আছে
অর্চনা ফিরল।
বোস–
একটু অবাক হয়েই অর্চনা মোড়াটা তাঁর সামনে টেনে বসল।
হাতের মোটা বইটা একদিকে সরিয়ে রেখে তিনি সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করলেন, তোর মা তোকে কিছু বলেছে?
অর্চনা শঙ্কিত একটু, কি বলবে?
তার মানেই বলেনি, বলবে না আমি আগেই জানি, তার তত সব বড় বড় ইয়ে–
আসল প্রসঙ্গটা দুর্বোধ্য রেখেই স্ত্রীর প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে নিলেন একটু। অর্চনা ভয়ে ভয়ে একবার দরজার দিকটা দেখে নিল, তার পর বাবার দিকে তাকাল।
যাকগে শোন, ওই সুখেন্দু খুব ভাল ছেলে তুই কি বলিস?
লজ্জায় আরক্ত হলেও জিজ্ঞাসার নমুনায় অর্চনা বাবার: দিকে চেয়ে হেসেই ফেলল। মেয়ের কিছু বলা না বলার জন্য অপেক্ষা করলেন না তিনি। নিজের মনের কথাটাই ব্যক্ত করলেন।–তোর মা অবশ্য বলবে ওর মোটর নেই, মাস্টারি করে–মাস্টারি তো আজীবন আমিও করলাম, মোটর হয়নি?
