কিন্তু মা আর সুস্থ হননি। মস্ত একটা খেদ নিয়েই তিনি চোখ বুজেছেন আর পিসিমাকে ভাল হাতে আটকে রেখে গেছেন।
এই সব অর্চনা বেশির ভাগই সুখেন্দুর মুখে শুনেছে। শুধু শাশুড়ীর খেদের কথাটা পিসিমা নিজে বলেছেন। অর্চনা এ বাড়িতে পদার্পণ করার প্রথম সন্ধ্যাতেই পিসিমা তাকে দোতলায় সুখের ঘরে দেয়ালের গায়ে টাঙানো ছবিতে তার শাশুড়ীকে দেখিয়েছেন। প্রমাণ-সাইজের অয়েল-পেন্টিং ছবি–ফুলের মালা জড়ানো। পিসিমা বলেছেন, তোমার শাশুড়ী… আজ যেন হাসছে।
ছবিতে শাশুড়ী হাসুন আর না হাসুন, পিসিমা চোখ মুছছিলেন। রাশভারী মহিলাটি সেদিন আনন্দে অনেকবার হেসেছেন অনেকবার কেঁদেছেন। ছবি দেখিয়ে বলেছেন, বড় সাধ ছিল ছেলের বউ দেখবে নাতির মুখ দেখবে। শেষের দিন ক’টা তো এই এক আশা নিয়েই বেঁচে ছিল, কিন্তু গোঁয়ার ছেলে তো তখন–
আর বলেননি। শুভদিনে চোখের জল আটকাবার জন্যেই হয়তো ওকে বসিয়ে রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। অনা তখন উঠে এসে ছবিটিকে নিরীক্ষণ করে দেখেছে। নিজের অগোচরে যুক্তকরে শাশুড়ীর উদ্দেশে প্রণামও করেছে।
বাড়িতে আর পাকা বাসিন্দা বলতে রাধুনী সাবি। একটা ছোকরা চাকর আছে, হরিয়া-সে ঠিকে কাজ করে, দু-বেলা এসে কাজকর্ম করে দিয়ে যায়। পিসিমার আপত্তি সত্ত্বেও সুখেন্দুর এই ব্যবস্থা, কোনভাবে যেন তাঁর অসুবিধে না। হয়। তাঁর পূজো-আর্চা আচার-অনুষ্ঠানের বিঘ্ন যত কম ঘটে।
বিয়ের পর সব থেকে স্বস্তির নিশ্বাস বোধ করি এই পিসিমাই ফেলেছিলেন। ভাইপোর মেজাজ তাঁর থেকে বেশি আর কে জানে! এই একরোখা ছেলে নিয়ে মন্ত দুর্ভাবনা ছিল তাঁর। যতবার বিয়ের কথা বলেছেন, ছেলের সাফ জবাব, অশান্তি বাড়াতে চাও কেন, মা যখন নেই আর দরকারও নেই–
পিসিমা অনুযোগ করেছেন, মা নেই বলে কি আমি নেই, আমি চিরকাল পড়ে থাকব এখানে?
সুখেন্দু বলেছে, পড়ে থাকবে কেন, যখন যেখানে ভাল লাগবে সেখানে থাকবে।
পিসিমার দুর্ভাবনা গেছে। মুখে না বলুক মনে মনে অর্চনার ওপরেও খুশী–এই ছেলের জন্য ও-রকম মেয়েই দরকার ছিল।
পিসিমার উপলব্ধি মিথ্যে নয়, সুখেন্দুর গুরুগম্ভীর ভারী দিকটা অর্চনা যেন দুদিনেই হালকা করে ফেলেছিল। এমন যে, নিজের পরিবর্তনে সুখেন্দু নিজেই মাঝে মাঝে অবাক হত। সপ্তাহে তিন দিন সকালে প্রাইভেট এম. এ. পরীক্ষার্থিনী এক বিবাহিতা ছাত্রী পড়াতে যায়, দেড়শ’ টাকা মাইনে। সেখানে ঘড়ি ধরে হাজিরা দিয়ে এসেছে এতদিন। ওই তিন দিন সকালে বাড়িতে চা খাওয়ার অবকাশ বড় হত না। বিয়ের তৃতীয় দিনেই অর্চনা সেইখানে জুলুম কর, আর সেটা যে এত মিষ্টি লাগতে পারে সুখেন্দু কোনদিন কল্পনাও করেনি।
তখন সাতটাও নয় সকাল, অর্চনা নিচে। ঘড়ির দিকে চোখ পড়তেই তাড়াতাড়ি জামা গায়ে গলিয়ে নিচে নামতে যাবে, দেখে চায়ের পেয়ালা হাতে অর্চনা ওপরে উঠে আসছে। সিঁড়ি দিয়ে নামতেই সুখেন্দু ব্যস্তভাবে বলল, এখন নয়, এসে খাব’খন দেরি হয়ে গেছে–
অর্চনা কিছু বলেনি, চায়ের পেয়ালা হাতে মাঝ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে পড়েছিল শুধু। সুখেন্দু নাগালের মধ্যে আসতেই খপ করে জামার বুকের কাছটা ধরে হিড়হিড় করে আবার তাকে ওপরে টেনে এনেছে। সুখেন্দু অনুনয় করেও রেহাই পায়নি। ওই অবস্থায় ওপরে উঠতেই বারান্দার অন্য কোণ থেকে পিসিমার সঙ্গে চোখাচোখি। জামা ছেড়ে দিয়ে অর্চনা দৌড়ে ঘরে পালিয়েছে। ব্যাপারটা বুঝে পিসিমা মনে মনে বলেছেন, এই রকমই দরকার ছিল। এক মিনিট দেরি হলে কতদিন ছেলে সাবির মুখ কালো করে দিয়ে ভাত না খেয়েই কলেজে চলে গেছে ঠিক নেই। কেউ ডাকতে সাহস পর্যন্ত করেনি। এখন চা না খেয়েও বেরুনো বন্ধ।
রাতে খাবার টেবিলে সেদিন এমন গম্ভীর দাদাবাবুর কাণ্ড দেখে আড়ালে গিয়ে সাবি রাঁধুনীও আনন্দে ক’বার জিব কেটেছে ঠিক নেই। ফাঁক বুঝে সুখেন্দু জোরজার করে অর্চনার মুখে কিছু খুঁজে দেবেই। অর্চনা তার হাত থেকে খাবে না, সুখেন্দু নাছোড়। শেষে বাহুবলে সেই চেষ্টা করার উপক্রম দেখে অর্চনা হঠাৎ এস্তে বলে উঠেছিল, এই, পিসিমা!
হকচকিয়ে গিয়ে সুখেন্দু নিজের জায়গায় বসে ফিরে দেখে প্লেটে, আরো ভাত নিয়ে দোরগোড়ায় সাবি লজ্জায় ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে।
সুখেন্দু অপ্রস্তুত, হাসতে হাসতে অর্চনার বিষম খাবার দাখিল।
শোবার ঘরের ঠিক পাশের ঘরটিতে বসে সুখেন্দু পড়াশুনো করে। দুই ঘরের মাঝখান দিয়েও দরজা আছে একটা। রাতের আহারের পর খানিক বই নিয়ে বসাটা বরাবরকার অভ্যাস। বিয়ের কয়েকদিন বাদে সেই অভ্যাসটাই বজায় রাখতে চেষ্টা করেছিল সেদিন। কিন্তু পড়ায় মন বসছে না, তবু অর্চনা ঠাট্টা করবে বলেই জোরজার করে বসে আছে। ওর সঙ্গে ছদ্ম রেষারেষি করেই পড়তে বসেছিল।
বই থেকে মুখ না তুলেই বুঝল পা-টিপে অর্চনা মাঝের দরজাটা নিঃশব্দে বন্ধ করে দিচ্ছে। খুব সন্তর্পণে দরজা বন্ধ করে আস্তে আস্তে শিকল তুলে দিয়েই অর্চনা চমকে ফিরে তাকাল। এরই মধ্যে বারান্দার দরজা দিয়ে সুখেন্দু ঘরে ঢুকে বিছানায় শুয়ে পড়ে ঘড়ঘড় করে নাক ডাকাচ্ছে। জব্দ হয়ে অর্চনা হেসে ফেলে ঝন করে শিকলটা ফেলে দরজা খুলে দিয়েছে আবার।–থাক, আর নাক ডাকাতে হবে না, বিছানায় গা ঠেকালে ও-নাক আপনি ডাকে।
