মনোবীণা ধরাপড়া চোরের মতন মিইয়ে গিয়ে বললেন, “অমন জলজ্যান্ত মিথ্যে কথাটি বোলো না। বাবার মোটেই টাইফয়েড হয়নি। জঙ্গল ম্যালেরিয়া হয়েছিল। বাবা তখন সেরে উঠেছেন। মা বললেন বউমা—তুমি যাও, ছেলে একা থাকে—রাত-বিরেতে চাকরি। তুমি না থাকলে ওর অসুবিধে হবে।”
“মা বললেন—”আর তুমি আমার কাছাটি ধরে সুড়সুড় করে চলে এলে! কী আমার শাশুড়ি-ভক্তি।”
‘কাঁচা তোমার ছিল যে ধরব! করতে তো এ টি এস-এর কাজ, পরতে খাকি হাফ প্যান্ট…, ধরতে হলে ওই পেন্টুল ধরে টানতে হত।” বলতে বলতে বীণা দেওয়ালের পুবদিকে তাকালেন। শাশুড়ির বড় ফটো। জাঁদরেল মহিলা ছিলেন। হাত জোড় করে বার কয়েক প্রণাম সেরে ফেললেন স্বর্গ শাশুড়ির উদ্দেশে, তারপর মুখ ঘুরিয়ে পশ্চিমের দেওয়ালে শ্বশুরমশাইয়ের ফটোকেও প্রণাম জানালেন। তীর্থ সেরে ফিরে এসেছেন সবে, গুরুজনরা সশরীরে বর্তমান থাকলে ঘটির জলে পা ধুইয়ে দিয়ে প্রণাম করতেন। তা যখন নেই, তখন তো নমো নমো করতেই হয়।
ফণীশ্বর এবার দুধ-বোতল মুখে তুললেন।
মনোবীণা বললেন, “ওটা কী? খোকা হয়েছ?”
ফণীশ্বর বললেন, “টু ইজটু থ্রি প্রপোরশানে মেশানো আছে। দুই তিন ভাগাভাগি।”
“গন্ধতেই বুঝতে পারছি কী মেশানো আছে।”
ডাবের জল আর ইয়ে—মানে এক নম্বর দিশি।”
“দিশি! দিশি…।”
“ডাক্তার বলল আমি কী করব! বলল, বিলিতি রাত্তিরে খেয়ো, সারাদিন খেলে সইবে না। তার চেয়ে ডাবের জলের সঙ্গে লোকাল মিশিয়ে খেলে গরমে তেষ্টা মিটবে, গায়ে-হাতের ব্যথা মরবে। ফুরফুরে হয়ে থাকতে পারব—তাই!”
“তাই! তাই খোকাপনা ধরেছ!”
‘না, না, তার জন্যে কেন হবে! দোলনায় দুলে দুলে খাই তো, হাত ভাঙা মানুষ, ধরতে সুবিধে। আমি তো আর বোঁটা চুষি না! ওটা খুলে রেখেছি।”
মনোবীণা স্বামীকে বিলক্ষণ চেনেন। পঁয়ত্রিশ বছর ধরে সমানে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিল মানুষটা। বললেন, “এটাও কি ডাক্তারে বলেছে?”
“মাপ! মাপ পাব কোথায়! এখানে শিশির গায়ে মাপের দাগ আছে, ওয়ান আউন্স টু আউন্স—! কত সুবিধে!”
“কে দেখেছে তোমাকে কোন ডাক্তার?”
“সরোজ।”
“সরোজিনী! সরোজিনী তোমাকে দেখেছে! ও তো মেয়ে ডাক্তার!” বীণার যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না। বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থাকলেন।
ফণীশ্বর বেশ গম্ভীর এবং আবেগের গলাতেই বললেন, “সরোজ না থাকলে সেদিন হাড়ভাঙা দ হয়ে পড়ে থাকর্তাম। খবর পেয়েই ছুটতে ছুটতে এল। তারপর যা করার সেই করছে। শুধু প্লাস্টারটা করে দিয়েছে মানিক মুখুজ্যে।”
সরোজিনী থাকেন কাছেই। দু’চার বাড়ির পরই। একটু কোনাচে জায়গায় বাড়িটা। পেশায় ডাক্তার। রেল হাসপাতালের। মহিলার চেহারা দেখলে পুরুষ বলে ভুল হতে পারে। মাথায় বেঁটে, রং কালো, বহর বিশাল, সামান্য গোঁফ আছে নাকের তলায়, সপ্তাহে বার দুই মিহি করে গোঁফ পরিষ্কার করে নেন ইলেকট্রিক রেজারে। মেজাজ অতি উগ্র। চোখে বড় বড় কাচের চশমা, মাথার চুল কাঁচা-পাকা, ঘাড় পর্যন্ত চুল। সরোজিনী হলেন মিস, মানে বাহান্ন-তিপান্ন বছর বয়েসেও কুমারী।।
মনোবীণার ইচ্ছে হল, শুয়ে পড়ে মেঝেতে মাথা ঠোকেন কিছুক্ষণ! শহরে এত ডাক্তার বদ্যি থাকতে শেষে নাকি ওই ‘মা মনসা’!মনোবীণা আড়ালে সরোজিনীকে মা মনসা বলেন। পাশাপাশি বাড়ি, (যদিও মা মনসার হল ভাড়া বাড়ি) আলাপ পরিচয় আছে বইকি! কিন্তু মেলামেশা তেমন নেই। মনসা মদ্দ নয়, মাগি ; ও সিগারেট খায় বলে শুনেছেন মনোবীণা, এমন কি বাড়ির মধ্যে রাত্রে ঢুকুঢুকুও চলে!
“তুমি শেষ পর্যন্ত মনসার খবরদারিতে আছ, ছিছি!”
“সরোজ ভাল ডাক্তার। গোল্ড মেডেল পেয়েছিল।”
“ও তো মেয়েদের ডাক্তার!”
“তা বলে গাইনি নয়। জেনারেল ফিজিশিয়ান, প্লাস কার্ডিওলজিস্ট!”
“নিকুচি করেছে অমন ডাক্তারে। আসলে তোমার ধাতটি ও বোঝে তো! রতনে রতন চেনে। তাই ফিডিং বোতলে মদ ঢেলে খেতে বলে গেছে! ঘেন্নায় মরি।”
ফণীশ্বর যেন কত কৃতজ্ঞ সরোজিনীর কাছে, মুক্তকণ্ঠে বললেন, “এই দোলনাটিও ও নিজের বাড়ি থেকে এনে টাঙিয়ে দিয়ে গেছে। বলেছে, জানলার কাছে নিচু করে টাঙিয়ে দিয়ে গেলাম। শুয়ে শুয়ে সব দেখবেন শুনবেন, ভাল লাগবে। দিন কেটে যাবে।”
মনোবীণা বললেন, “তা হলে আর কী! ওই দোলনায় শুয়ে শুয়ে দোলো! ঢং যত্ত।”
দুই
আর খানিকটা বেলায় স্বামীকে এমন করে স্নান করিয়ে দিলেন মনোবীণা যেন পনেরো দিনের ময়লা কলঘর সাফ করছেন। অবশ্য প্লাস্টার সামলে, যেন না জলে ভিজে যায়!
স্নানের পর স্বামীকে পোশাক পরিয়ে দিলেন। লুঙ্গি আর ঢোললা ফতুয়া। দিয়ে বললেন, “একটু বসো, আমি চান সেরে নিই!”
স্নান শেষে মনোবীণা পুজোর শাড়ি পরে খালি গায়ে স্বামীর কাছে এসে তীর্থ থেকে আনা প্রসাদী ফুল পাতা ছোঁয়ালেন তাঁর মাথায় বুকে। তারপর আঁচলের গিট খুলে কাগজে মোড়া একটা মাদুলি বার করলেন। বললেন, “পুজো দেওয়া শুদ্ধ করা মাদুলি। এটা পরো।”
“কেন?”
“আমি কোন মুলুক থেকে এনেছি ; ভৈরবচণ্ডীর মন্দিরে পুজো দিয়ে…”
“কী হবে পরে? পুজোই বা দিতে গেলে কেন?”
“এ খুব জাগ্রত। এতে কত কী হয়!”
“আমার আবার কী হবে! হবার দিন তো শেষ।”
“তোমার ওই নেশাটি আমি ছাড়াব! বয়েস এখন কত হল? পঁয়ষট্টি। সেই কোন বয়েস থেকে গেলাস ধরেছ! তবু যৌবনকালে সব সয়। এখন কি ওই সব সইয়ে নেওয়ার বয়েস আছে! বরং দিন দিন তুমি ইয়ার বন্ধুদের সঙ্গে বসে গেলাস গিলছ গাদা গাদা। শরীর তো যেতে বসেছে। লিভার পচে গেল।”
