“ওমা! কী হয়েছে? এ কী দশা তোমার?” বলতে বলতে মনোবীণা স্বামীর দোলনার পাশে এসে ঝুঁকে পড়লেন। এমন করে ঝুঁকলেন যেন কর্তার বুকের ওপরেই ঝাঁপিয়ে পড়বেন।
ফণীশ্বর যেহেতু ব্ৰহ্মসঙ্গীত গাইছিলেন, ‘হৃদয় আরাম তুমি হৃদয়নাথ’ সেহেতু আধবোজা চোখে, আধ্যাত্মিক আবেশের গলায় বললেন, “পতিত হয়েছি।”
মনোবীণা একে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত তার ওপর বাড়ি ঢুকতে না ঢুকতেই স্বামী-দুঃসংবাদে আতঙ্ক-উৎকণ্ঠায় দিশেহারা, কাজেই স্বামীর ওই মিনমিনে আধ্যাত্মিক গলা ভাল লাগল না ।বললেন, “আদিখ্যেতা রাখো। কী হয়েছিল? কেমন করে পড়ে গেলে?”
ফণীশ্বর বললেন, “তোমার তেলের শিশিতে।…তেলের শিশি ভাঙল বলে—।”
মনোবীণা অবাক। আজ পনেরো দিনের বেশি তিনি বাড়ি-ছাড়া, তাঁর তেলের শিশিতে কর্তার আছাড় খাবার কী হল?
গায়ের পাতলা চাদরটা খুলে একপাশে ছুড়ে দিতে দিতে মনোবীণা বললেন, “আমি রইলুম হাজার মাইল দূরে, আমার তেলের শিশিতে তুমি আছাড় খেলে? তামাশা।”
“তামাশা কেন হবে! যা হয়েছে তাই বললাম। ”
“কখনওই নয়। আমি বিশ্বাস করি না। কত খেয়েছিলে তখন—পেট পর্যন্ত, না, গলা পর্যন্ত?”
ফণীশ্বর তখনও শান্ত গম্ভীর গলায় বললেন, “সেদিন পূর্ণযোগ ছিল না, ফকির চেটো—মানে চাটুজ্যের মা উননব্বইতে স্বর্গ গেলেন ; আমরা বন্ধুর মাতৃশোক জানাতে অর্ধযোগ সেরেই ফিরে এসেছিলাম। বীণা, স্বামীকে বিশ্বাস করা তোমার পবিত্র কর্ম।”
মনোবীণার মাথা গরম হয়ে উঠেছিল। এই ন্যাকামি আর সহ্য হচ্ছিল না। রাগের মাথায় দোলনাটা ঠেলে দিলেন। দোলনা সামান্য দুলতে লাগল। বললেন, “নিকুচি করেছে তোমার পবিত্তর কম্মে। ঠিক ঠিক বলল কী হয়েছিল। আমার তেলের শিশি থাকে কলঘরে। সেই শিশি উড়ে এসে তোমার পায়ে পড়ল! তার পাখা গজিয়েছিল নাকি?”
ফণীশ্বর কী বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই বীণা ধমকে উঠে বললেন, “ঢং করে কথা বলবে না। সাফ সাফ বলো। সাদা কথায় বলো।”
“ভেতো বাংলায়?”
“হ্যাঁ।”
ফণীশ্বর বললেন, “তা হলে যা যা ঘটেছিল বলি। একটিও মিথ্যে কথা বলছি না, ধর্ম সাক্ষী। …সেদিন বিকেলে চাটুজ্যের মায়ের গঙ্গাপ্রাপ্তি ঘটল! আমরা চেটোকে বললাম, তুমি শ্মশানে যাবে—লোকজন তোমার অঢেল, রাবণের ফ্যামিলি, আমরা আর বোঝার আঁটি হয়ে কী করব! তার চেয়ে বরং একটু শোক পান করে বাড়ি ফিরে যাই। চেটো এক পাত্তর টেনে চলে গেল। বড় দুঃখ তার। মা বলে কথা। হোক না নব্বইয়ের গোড়ায়। আমি, দ্বিজু, গণেশ খেলাম খানিকটা, পুরো খাইনি। অর্ধযোগ। তারপর যে যার বাড়ি।… বাড়ি ফিরে এসে বড় ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। তুমি নেই। তুমি না থাকলে আমি একেবারে অনাথ শিশু। অরফ্যান—”, বলতে বলতে ফণীশ্বর একটু থামলেন। গলা পরিষ্কার করে নিয়ে আবার বললেন, “ভাবলাম, একটু শুদ্ধ হয়ে নিই চান করে। হাজার হোক চেটোর বাড়ি থেকে ফিরছি। সংস্কার বলে একটা কথা আছে তো!… তা ইয়ে, মানে তোমার অভাবে তোমারই মাথার তেল—জবাকুসুম মাথায় ঘষতে ঘষতে পায়চারি করছিলাম এখানেই। সাম হাউ, হাত ফসকে শিশিটা পড়ে গেল। অ্যান্ড ব্রোকেন…। আমিও তেলের মেঝেতে পা হড়কে পড়লাম। জবর পড়লাম গো! অ্যান্ড ব্রোকেন..!”।
“বেশ হয়েছে।”
“বেশ হয়েছে। আমার হাত ভাঙল, পা ভাঙল—আর তুমি বলছ বেশ হয়েছে। তোমার বাক্য শুনে…।”
“তোমার মাথাটা ভাঙল না কেন!” বলে মনোবীণা স্বামীর হাতটা দেখতে লাগলেন, “গোটা হাতটাই ভেঙেছে?”
“কবজির ওপরটা দুটুকরো…”
“চমৎকার। চার হল না কেন? …আর পা? দেখি পা দেখি।”
ফণীশ্বরের কপাল ভাল গোড়ালির তলার দিকে হাড় পুরোপুরি না ভাঙলেও চিড় ধরেছে। প্লাস্টার করা আছে পা, প্রায় হাঁটুর কাছাকাছি পর্যন্ত।
পা দেখতে দেখতে মনোবীণা বললেন, “ছেলেকে খবর দিয়েছিলে?”
“দিয়েছিলাম। খোকা বউ নিয়ে ছুটতে ছুটতে এল মোটর বাইক হাঁকিয়ে। ওদের কারখানায় হুজ্জোতি চলছে। প্লাস্টার হয়ে যাবার পর আমিই ওদের বললাম, তোরা যা, এসময় কারখানা ছেড়ে থাকিস না।”
“ওরাও চলে গেল? মানুষ, না জন্তু?”
‘আহা, গালাগাল দিচ্ছ কেন! ছেলে আর বউমার দোষ কোথায়? আমি বললাম বলেই ওরা চলে গেল। খোকার কারখানায় ভীষণ ঝামেলা চলছে না! গো স্লো, মিটিং, লাঠালাঠি, পুলিশ—যা হয় আজকাল। খোকার কোয়ার্টারটাও বেমক্কা জায়গায়। এ সময় নিজের কোয়ার্টার আর কারখানা ছেড়ে আসতে নেই।”
মনোবীণ খুশি হলেন না। গরমকালের বাঁধাকপির মতন বিদিকিচ্ছিরি মুখ করে বললেন, “খোকার বউ কী করছিল? সে কোন আক্কেলে বুড়ো হাত-পা ভাঙা শ্বশুরকে ফেলে রেখে চলে গেল?”
ফণীশ্বর বললেন, “দুঃসময়ে স্ত্রীকে পাশে থাকতে হয়। সীতা রামকে ফলো করেছিল কেন?”
“চুলোয় যাক তোমার সীতা!… খোকাকেও বলিহারি। তোর বুড়ো বাপ থাকল পা-ভেঙে পড়ে, তুই বেহায়ার মতন বউ ট্যাঁকে করে পালালি! ছি ছি, আজকালকার ছেলেমেয়েদের লজ্জা শরম, কর্তব্য জ্ঞান বলে কিছু নেই!”
ফণীশ্বর গম্ভীর হয়ে বললেন, “আগেও ছিল না!”
“ছিল না? আমরা হলে এ কাজ করতে পারতাম?”
“চমৎকার পারতাম। এই ধরো, তোমার-আমার কথা। তখন আমাদের মাত্তর পাঁচ মাস বিয়ে হয়েছে। বাবার টাইফয়েড হল। পানাগড়ে। খবর পেয়ে আমরা ছুটে গেলাম। দিন আষ্টেকের মাথায় বাবা যখন টাল সামলেছে—আমি চলে আসতে চাইলাম। তুমি তখন কী করলে? আমার লেংটি ধরলে। কিছুতেই বাবা-মায়ের কাছে থাকবে না, বললে—আমায় নিয়ে চলল, আমি একলা থাকতে পারব না। সে কী মুখ তোমার? কী কান্না!..কই, তখন তোমার লজ্জা-শরম কোথায় ছিল?”
