গীতা বলল, তাহলে থেকে যান। ট্রেন তো মাঝরাতে, আমার কিছু অসুবিধা হবে না।
করবী মাথা নীচু করে তালুতে মৌরি বাছতে বাছতে বলল, পরিমলবাবু প্যাকিং কেসটা এমন সময় পাঠালেন যে বইগুলো ভরে পেরেক এঁটে সেটা অন্য জিনিসগুলোর সঙ্গে আর স্টেশনে পাঠানো গেল না। ওটার জন্যই আমাদের যেতে হবে। রিকশা বলা আছে, পৌনে বারোটায় তুলে নিয়ে যাবে।
তাহলে এখন বাড়ি ফিরে আপনাদের তো অপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। চলুন সঙ্গে যাই, খানিকক্ষণ গল্প করে আসা যাবে। গীতা টেবিল থেকে টর্চটা নিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে ঝি-কে বলল, বেরোচ্ছি গো। ফিরতে দেরি হলে তুমি আর জেগে বসে থেকো না।
ওরা তিন জন প্রধানত মিরা ও অরুণের কথা বলাবলি করতে করতে পৌঁছে গেল। গেট বন্ধ, বাড়িটা অন্ধকার। তালা খুলে ওরা বসার ঘরে ঢুকল। ঘরের আলো জ্বলতেই গীতা কাঠের বাক্সটা দেখে বলল, বেশ বড়ো তো, একটা মানুষ প্রায় ধরে যেতে পারে।
করবী হেসে বলল, ছোটোখাটো মানুষ হলে ধরে যাবে তোমায় ধরবে না।
আমি এমন-কিছু বিরাট নই, ঠেলেঠুলে এর মধ্যে ঠিক এঁটে যাব। এই বলে গীতা প্যাকিং বাক্সটার উপর বসল এবং সঙ্গে সঙ্গেই দাঁড়িয়ে উঠে বলল, উফ পেরেক। ঠিকমতো বসানো হয়নি।
মুঠোয় মৌরি রয়ে গেছে। করবী হাত বাড়িয়ে প্রফুল্লকে বলল, খাবে?
দু-আঙুলে মৌরি নিয়ে প্রফুল্ল বাক্সটার উপর ঝুঁকে লক্ষ করতে করতে বলল, তাই তো? তিন চারটে পেরেক দেখছি বেরিয়ে রয়েছে। পথে খোঁচা লাগতে পারে, খুলে বেরিয়ে যেতেও পারে।
লোহা-টোহা কিছু নেই? বসিয়ে দেওয়া উচিত, গীতা ঘরের এধার-ওধার তাকাল লোহার খোঁজে।
দেখি আছে কি না! প্রফুল্ল ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরের পিছন দিকে চলে গেল এবং চেঁচিয়ে বলল, টর্চটা আননা তো, কিছু দেখতে পাচ্ছি না।
গীতা তোমার টর্চটা দিয়ে আসবে ভাই। মৃদু-শান্ত স্বরে করবী বলল, তারপর হাতের শেষ কয়েকটি মৌরি মুখে ছুড়ে দিল। গীতা বেরিয়ে যেতেই করবীর মুখ ধীরে ধীরে টসটসে হয়ে উঠল জ্বরগ্রস্তের মতো। দু-হাতে কপাল চেপে সে মাথা নীচু করে বসে রইল।
মিনিট পাঁচেক পর পায়ের শব্দে করবী মুখ তুলল। কয়লাভাঙা হাতুড়ি হাতে প্রফুল্ল দাঁড়িয়ে। ওর জিজ্ঞাসু চাহনির জবাবে প্রফুল্ল বলল, বাক্সটা এক বার খুলতে হবে। থলিটা আনো, বইগুলো তাতেই বরং ভরে নেওয়া যাবে।
এবং তারা ফিরে এল
কারখানায় নাইট ডিউটি সেরে এখন বাসে ফিরেই ফেলা দত্ত রাস্তার টিউবওয়েলে চানটা সেরে নেয়। তারপর ঘণ্টা তিনেক ঘুমোয়। টিউবওয়েলের পাশেই আস্তাকুঁড়। পাম্প করতে করতে হঠাৎ তার চোখে পড়ল। ঝুঁকে সে বস্তুটিকে নিরীক্ষণ করছে, তখন বারান্দা থেকে স্কুলমাস্টার অজিত ধরের বউ তা দেখে স্বামীকে ডেকে আনল। তিনি চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, অত মন দিয়ে কী দেখছেন ফেলুবাবু?
ফেলা দত্ত গম্ভীর মুখে হাতছানি দিয়ে ওকে ডাকল। তখন সরকারি ডিপো থেকে দুধ আনতে যাচ্ছিল সুব্রত মৈত্র। সে ওদের দুজনকে আস্তাকুঁড়ের ওপর ঝুঁকে থাকতে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল।
অবশেষে ফেলা দত্ত সাব্যস্ত করল, মনে হয় এ পাড়ারই কোনো ঘরে কেলেঙ্কারিটা হয়েছে। ছি ছি ছি! পঞ্চাশ বছর বয়স হতে চলল, এ জিনিস পাড়ায় এই প্রথম দেখলুম।
অজিত ধর মন্তব্য করল, খোঁজ করে বার করা উচিত। আচ্ছা, পুলিশে খবর দিতে হবে কি?
সুব্রত মৈত্র ডি-ফিল পাওয়ার পর থেকে স্ত্রীর নির্দেশে কথা বলা কমিয়ে দিয়েছে। রুবির ধারণা পন্ডিত লোকেরা খুব গম্ভীর হয়। ড. মৈত্র যথোপযুক্ত গাম্ভীর্য সহকারে অভিমত দিল, ধরা না পড়লে পুলিশ কী করে বার করবে? আর এসব ব্যাপার মেয়েরাই ভালো ধরতে পারে। আগে ধরুন, তারপর পুলিশে খবর দিন। এই বলে সে দুধ আনতে চলে গেল।
হনহনিয়ে যাচ্ছিল ভেলোর মা। তিন বাড়িতে কাজ, বেশিক্ষণ দাঁড়াবার তার সময় নেই। শুধু বলে গেল—পাড়ার মেয়ে-বউদের ধরে ধরে এগজামিন করলেই তো ন্যাটা চুকে যায়।
খুবই চিন্তিত হয়ে অজিত ধর বাড়িতে ঢুকল। বড়োমেয়ে খুকিকে শুয়ে থাকতে দেখেই আঁতকে উঠল সে। কী ব্যাপার, শুয়ে এখনও?
বউ বলল, কাল থেকে তো ইনফ্লুয়েঞ্জা মতো হয়েছে। কেমন গা-টা ছ্যাঁক ছ্যাঁক করছে।
না না, অজিত ধর চাপা চিৎকার করে উঠল, শোয়াটোয়া এখন চলবে না। বারান্দায় যাক, হাসুক, গান করুক, অসুখটসুখ এখন নয়। বিকেল হলেই সব বাড়ির মেয়েরা যখন ছাদে উঠবে তখন যেন স্কিপিং করে। মোটকথা আমার বাড়ির দিকে কেউ যেন সন্দেহের চোখে না তাকায়।
খুবই চিন্তিত হয়ে ফেলা দত্ত বাড়িতে ঢুকল। ব্যাপারটা বউকে বলমাত্র সে তড়বড়িয়ে বলল, তোমার সেজোছেলেকে ছাদে ওঠা বন্ধ করতে বলো। অজিত মাস্টারের মেয়েটার সঙ্গে তো আজকাল খুব ঠ্যাকার চলে, তারপর কোনদিন একটা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে ক্ষণ। কারখানায় যাহোক একটা কাজে ঢুকিয়ে দাও, কথা তো গেরাহ্যি কর না। তোক একটা লটঘট।
কাজ কি বললেই আজকাল পাওয়া যায়? ক্লান্তস্বরে ফেলা দত্ত বলল, সবাইকেই তো তেল দিচ্ছি।
দুধ নিয়ে ফিরেই সুব্রত মৈত্র শুনল, কী যেন একটা আস্তাকুঁড়ে পড়েছে, ভেলোর মা চাটুজ্জে গিন্নিকে বলছিল শুনলুম?
রুবির হাসি দেখে ড. মৈত্র বুঝল সবিস্তারে কিছু বলতে হবে না। কোন বাড়ির কেলেঙ্কারি বলে মনে হয়?
কী জানি, ভেলোর মা তো বলছিল মেয়ে-বউ সবাইকে এগজামিন করলেই বেরিয়ে পড়বে।
বউদেরও? তাহলে তো তুমিও পড়ে যাও এর মধ্যে। অবশ্য ডিস্টিংশন নিয়েই পাস করবে, ট্যাবলেট কাল পর্যন্ত তো চলবে?
