অরুণ বলল, উকিলবাবুর তো আছে।
মৃগাঙ্ক অনেকক্ষণ সময় নিয়ে গ্লাসে চুমুক দিল। পরিমলের গ্লাস ধরা মুঠোটা শক্ত হয়ে গেল। মধুসূদন বিভ্রান্ত চোখে অরুণের দিকে তাকিয়ে গ্লাসটা টেবলে নামিয়ে রাখল।
তোর বউকে কাল যেতে বারণ করিস। এখানে কাল অনেক কিছু ঘটতে পারে। পরিমল স্কুলজীবনের পর প্রকাশ্যে এই প্রথম মৃগাঙ্গকে তুই বলল।
অরুণ তড়াক করে লাফিয়ে উঠে পড়ে যেতে যেতে টেবিলের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। সাবস্টিটিউট চলবে? উকিলবাবুর বউয়ের বদলে আমার বউ যদি ফিলডিং দেয়, আপত্তি আছে?
অরুণকে রূঢ়ভাবে টেনে তুলে পরিমল বসিয়ে দিল প্যাকিং বাক্সের উপর। মৃগাঙ্ক ধীর অনুত্তেজিত কণ্ঠে বলল, বন্দুকটা কি এখুনি চাই?
মধুসূদন অস্বস্তিতে নড়েচড়ে গলাখাঁকারি দিয়ে পরিমলের দিকে তাকাল। অরুণ হাঁটুগেড়ে বসে মৃগাঙ্কের পা জড়িয়ে ধরল। আমার কিছু নেশা হয়নি মৃগাঙ্কবাবু, আমি বলছি সাবস্টিটিউট নেওয়ার অধিকার আছে। মিরা ক্যাচ-ট্যাচ ফেলবে না…জাস্ট ওয়ান বুলেট..আমি দাম দেব…
পরিমল ওকে টেনে তুলে বলল, এবার বাড়ি যান। আপনার নেশা হয়েছে। তারপর অরুণকে ঠেলতে ঠেলতে দরজার বাইরে এনে বলল, এবার বাড়ি যান। আপনার নেশা হয়েছে। অরুণকে তারপর বলল, হেঁটে যেতে পারবেন তো?
আমাকে আপনারা কী ভাবেন অ্যাঁ? একটা কাওয়ার্ড? আমি পারি, গীতা বিশ্বাসের সঙ্গে যা খুশি করতে পারি, কাউকে পরোয়া করি না। দেখবেন? পারি কি না দেখবেন?
অরুণ ঘুরে তাকিয়ে দেখল পরিমল নেই এবং দরজাটা বন্ধ। ঘাড় কাত করে সে কিছুক্ষণ একটানা ঝিঝির ডাক শুনল। চারদিকের অন্ধকারে চোখ বুলিয়ে, কাওয়ার্ডস, অল আর কাওয়ার্ডস। বলে ধমকে উঠে কুচকাওয়াজের কায়দায় বাড়ির রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল। ওকে দেখে হতভম্ব মিরা যখন কী করবে ভেবে পাচ্ছে না তখন কাঁধ থেকে কাল্পনিক রাইফেলটি নামিয়ে, হাঁটু ভেঙে বসে কাঁধে বাঁট রেখে, এক চোখ বুজে অনেকক্ষণ তাক করে অরুণ চিৎকার করে উঠল, দুম।
প্রফুল্ল আর করবী তখন বারান্দায় পাশাপাশি চেয়ারে বসে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে। বাড়ির সব আলো নেবাননা। একসময় প্রফুল্ল আলতো স্পর্শ করল করবীর বাহু। করবী ঘাড় ফেরাল।
আর ভালো লাগে না।
প্রফুল্ল বলল, তোমার সাকসেস চব্বিশ, আমার চৌত্রিশ। তুমি কিন্তু একসময় এগিয়ে ছিলে।
সংখ্যা দিয়ে কী হবে। জানি তো এটা সত্যি নয়, শুধুই খেলামাত্র। সারাজীবনই এভাবে খেলা যায় না।
প্রফুল্ল হাত সরিয়ে নিয়ে কিছুক্ষণ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, আমার যেন মনে হচ্ছে ভ্রমণ করার মতো আর কোনো মহাদেশ আমাদের জন্য অনাবিষ্কৃত নেই।
ক্লান্ত স্বরে করবী বলল, কিন্তু আমাদের বেরোতেই হবে, নইলে বাঁচা যাবে না। আমি ব্যবধান বাড়াতে চাই অতীতের সঙ্গে। নেকড়ের মতো ওরা খালি তাড়া করে, ধরতে পারলে ছিঁড়ে খেয়ে নেবে।
এইসময় মৃগাঙ্ক তার শোবার ঘরে দাঁড়িয়ে বন্দুকটা তুলে দেওয়ালে-টাঙানো নিজের ছবিটাকে তাক করছিল। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে আসা পায়ের শব্দ পেয়েই আলো নিবিয়ে সন্তর্পণে দরজার পাশে দাঁড়াল। বারান্দার অপর প্রান্তের ঘরটি ক্ষণপ্রভার। মৃগাঙ্ক আজ সারাদিন ওকে দেখেনি।
শীর্ণা বালিকার মতো দেহ, হাত দুটি দড়ির মতো ঝুলছে, মাথাটি এক পাশে হেলানো, মৃগাঙ্কের সামনে দিয়েই নিঃশব্দে চলে গেল নিজের ঘরে। বন্দুকটি বিছানার উপর রেখে জানলার ধারের ইজিচেয়ারটাতে দেহ এলিয়ে দিল মৃগাঙ্ক। ধীরে ধীরে চিন্তার মধ্যে সে ডুবে গিয়েছিল, হঠাৎ তার মনে হল ঘরে কে ঢুকছে।
তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থেকে ক্ষণপ্রভার অবয়বটি চিনতে পারল। বন্দুকের বাক্স আলমারির নীচেই থাকে। মৃগাঙ্ক দেখল, ও নীচু হয়ে বাক্সটি টেনে বার করল। হাতে তুলেই বোধ হয় লঘু ভারের জন্য বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে রইল। তখন চাপাস্বরে মৃগাঙ্ক বলল, আমি বার করে সরিয়ে রেখেছি। ওটা মধুসূধন দাসের লোক একটু পরে এসে নিয়ে যাবে।
কেন? তাতে আমাদের আন্দোলনের ক্ষতি হবে।
আমার কিছু আসে-যায় না।
ক্ষণপ্রভা বাক্সটা নামিয়ে রেখে মৃগাঙ্কের দিকে এগিয়ে এল। বন্দুকটা আমাদের দরকার। এখন তর্কাতর্কি করার সময় আমার নেই, কোথায় রেখেছ?
কী লাভ এইসবের দ্বারা তুমি পাবে? কাল তুমি মারা যেতে পার।
হ্যাঁ, ক্ষণপ্রভার ঝকঝকে দাঁত অন্ধকারেও মৃগাঙ্ক দেখতে পেল। মরার সম্ভাবনা কাল অনেকেরই আছে। তবে একটা শর্তে আমি যাওয়া বন্ধ করতে পারি।
কী শর্ত? মৃগাঙ্ক উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠল।
সকলকে জানিয়ে দেব যে আমি বন্ধ্যা নই।
না না। মৃগাঙ্ক কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে উঠল, তা যদি কর আমি নিজে তোমায় গুলি করে মারব।
কী লাভ তার দ্বারা তুমি পাবে?
মৃগাঙ্ক অবসনের মতো বসে পড়ল। মাথা নাড়তে নাড়তে কাতর স্বরে বলল, বোঝাতে পারব না তা, বোঝানো যায় না। পুরুষ হলে বুঝতে পারতে।
আর তোমাকে পুরুষ করে রাখতে আমাকে সাজতে হয়েছে বন্ধ্যা।
মৃগাঙ্ক অস্ফুটে বলল, খাটের ওপর।
পরদিন সকালে মিরাকে হাসপাতালে পাঠাতে হল। খুব ভোরে ঘুম ভেঙে অরুণ কলঘরে গিয়ে অর্ধদগ্ধ অচেতন দেহটি দেখতে পায়। ডাক্তার জানিয়েছে বাঁচবে কি না কাল বলা যাবে।
দুপুরে ক্ষণপ্রভা ফিরে আসে পুলিশের সঙ্গে। বড়ো তালপুর যাবার পথেই সে গ্রেফতার হয়েছে। মৃগাঙ্ক জামিনে ছাড়িয়ে আনতে গিয়েছিল, ক্ষণপ্রভা রাজি হয়নি।
রাত্রে গীতার বাড়িতে আহারের পর প্রফুল্ল বলল, ভেবেছিলাম তোমার এখানেই গল্প করে বাকি সময়টা কাটিয়ে দুজনে স্টেশনে রওনা হব। মালপত্র তো সবই পাঠানো হয়ে গেছে।
