ডন আবার খবরের কারণ হল ১৯৩২-এর এপ্রিলে বিয়ে করে। বধূ জেসি মেঞ্জিস সিডনিতেই ব্যাঙ্কের চাকুরিয়া। ডনের গ্রাম বাওরালের কাছেই মিটাগং-এর মেয়ে। স্কুল থেকেই দুজনের ভাব। এই মিটাগংয়েই ডন প্রথম শতরান করেছিল ছাত্রাবস্থায় এবং ব্যাটটি ভুলে ফেলে রেখে এসেছিল।
অত্যন্ত সুখের বিবাহ হয়েছে ডনের। পরে সেবলেছিল, ‘এমন অনেক সময় জীবনে এসেছে যখন ওকে ছাড়া আমার পক্ষে চলা একদমই সম্ভব হত না।’ বিয়ের পরই উত্তর আমেরিকা সফরে ডনের সঙ্গে জেসিও যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় এই সফরের উদ্যোক্তা ছিলেন আর্থার মেইলি। আমেরিকানরা প্রথমেই জানিয়ে দিয়েছিল দলে ডন না থাকলে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই ক্রিকেট সম্পর্কে। মেইলিও ডনকে বলে, তোমাকে যেতে হবেই। ডন দেখল, এই সফরে খেলতে হবে মজা করে সুতরাং আপত্তির আর কারণ কী!
প্রথম খেলা ভ্যাঙ্কুভার আইল্যাণ্ডে ১৮ জনের এক দলের বিরুদ্ধে। ওরা করে ১৯৪। অস্ট্রেলীয়রা ৮ উইকেটে ৫০৩। ম্যাককেব করে ১৫০। অধিনায়ক রিচার্ডসন ও ডন ৭ মিনিটে তোলে ৫০ রান। ঝোপঝাড়ের মধ্যে হারিয়ে যায় ছয়টি বল। পরের ম্যাচে ডন ছয়টি উইকেট পায় আট বলের এক ওভারে, কিন্তু হ্যাট্রিক হয়নি।
নিউ ইয়র্কে ডন খুশি হয়েছিল রাস্তায় বেরিয়ে। কেউ তার দিকে তাকাচ্ছে না, অটোগ্রাফের বই এগিয়ে দিচ্ছে না। আর খুশি হয়েছিল বিখ্যাত বেসবল খেলোয়াড় বেব রুথের সঙ্গে আলাপ করে। ক্রিকেটে ব্র্যাডম্যান যা, বেসবলে বেব রুথ তাই। যুক্তরাষ্ট্রে ওরা মজা করেই ক্রিকেট খেলেছে। কোনো ম্যাচে হয়তো আম্পায়ার খেলা ফেলে রেখে কথা বলতে চলে গেল বাউণ্ডারির ধারে; কোনো ম্যাচে দুই আম্পায়ারের একজন ছয় বলে অন্য জন আট বলে ওভার দিয়েছে; কোনো ম্যাচে বিপক্ষ দলে ১৬ বা ১৭ জন করে খেলেছে। একটি খেলায় আম্পায়ার ছিল চিউইং গামের ব্যবসায়ী। মাঠেই সেখেলোয়াড়দের মধ্যে তার ব্যাবসা সামগ্রীর নমুনা বিতরণ করে এবং হাওয়ায় বেল পড়ে যাচ্ছে দেখে স্থানীয় ব্যাটধারীরা চিউইং গাম দিয়ে স্টাম্পের ওপর বেল আটকে রাখে। একজনকে স্টাম্প আউট করা হলে বেলটি আঠায় ঝুলতে ঝুলতে যতক্ষণ-না ভূমি স্পর্শ করেছে ততক্ষণ আম্পায়ার আউট দেওয়া থেকে নিবৃত্ত ছিল। একটি খেলায় অসমান খারাপ পিচ সম্পর্কে অনুযোগ করায় স্থানীয় কতৃপক্ষ পিচে জল ঢেলে দেয় যাতে বল আর না লাফায়।
একবার বিপক্ষের ১৭ জন ব্যাট করে ও ১৪ জন বল করে। সান ফ্রান্সিসকোয় একটি ম্যাচে বিপক্ষের ১৫ জন ২০ রানে আউট হয়। ডন কয় বার মাত্র বল ছুঁয়েছিল— তিনটি ক্যাচ ধরা ও চারটি রান আউটের জন্য।
আড়াই মাসে অস্ট্রেলীয় দলটি ছয় হাজার মাইল অতিক্রম করে। ডন ৫১ ইনিংসে করে ৩,৭৭৯ রান। ক্রিকেট উচ্চ পর্যায়ের ছিল না, কিন্তু ডনের জীবনের অন্যতম সুখের কাল ছিল এই আড়াই মাস। কিন্তু ঝড় যে আসছে, তার পূর্বাভাস ঘুণাক্ষরেও ডন তখন জানত না। বছর ঘোরার আগে ক্রিকেটের ইতিহাসের সবথেকে প্রলয়ংকর ঘটনার কেন্দ্রে সেএসে গেল। ঝড়ের নাম : ‘বডিলাইন’।
১০. ডনকে থামাও
সারা অস্ট্রেলিয়া ১৯৩২-এ সফরকারী ইংরেজ ক্রিকেটারদের ধিক্কার দিল। আশঙ্কা করা হল জনতা হয়তো মাঠে নেমে এসে ওদের মারধর করতে পারে, তাই সর্বত্র ওদের বিশেষ পুলিশ প্রহরায় রাখা হল। খবরের কাগজে তীব্র কশাঘাত হানা হল ইংরেজদের প্রতি এবং এক-এক সময়ে মনে হচ্ছিল আর বুঝি কখনো টেস্ট খেলা হবে না।
সব কিছুর মূলে : তথাকথিত ‘বডিলাইন বোলিং।’ বলগুলি নিক্ষিপ্ত হয়েছিল ইংল্যাণ্ডের ফাস্ট বোলারদের, বিশেষ করে নটিংহ্যামশায়ারের নানকার্গেটের প্রাক্তন কয়লাখনি শ্রমিক হ্যারল্ড লারউড দ্বারা, যার তুল্য ফাস্ট বোলার তখনও দেখা যায়নি।
এই বিতর্কমূলক বোলিংয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ডন ব্র্যাডম্যান নামক রান সংগ্রাহক অতিমানবকে পরাজিত করা। ডনকে থামানোর জন্যই এই বোলিং পদ্ধতির উদ্ভাবন। গুণের স্বীকৃতি, অবাঞ্ছনীয়ভাবে হলেও, এমন বিরাট ভঙ্গিতে খুব কম লোককেই জানানো হয়েছে।
বডিলাইনটা কী? আজও এই নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে। তবে মূলত ব্যাপারটা শর্টপিচে ফাস্ট বোলিং। মতলব : জমিতে বাম্প করে বল তোলা এবং লেগ-সাইডে তখন ছয় থেকে আট জন লোক রাখা হয়।
তর্কটা হল, লেগ স্টাম্প না ব্যাটধারী, লক্ষ্যবস্তু কোনটি? অস্ট্রেলীয়দের মনে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই যে, এই বোলিংয়ের উদ্দেশ্য ব্যাটধারীকে ভয় পাইয়ে তার মনে এমন এক উদবেগ এনে দেওয়া যাতে সেতার উইকেটের নিরাপত্তার থেকেও বেশি চিন্তা করে নিজের দেহের নিরাপত্তা সম্পর্কে; ব্যাটধারীকে লক্ষ করেই এই বল করা হয় এবং আউট হওয়া নয়তো আঘাত নেওয়া এই দুইয়ের একটি ছাড়া তার আর কিছু করার থাকে না। নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রিত, অব্যর্থ লক্ষ্য, লারউডের বলের গতি ঘণ্টায় ৯৫ মাইলের মতো। সুতরাং মানুষ আঘাত পেয়েছে, উইকেট হারিয়েছে, এবং সন্ত্রস্ত অস্ট্রেলীয়রা কোমরে-বুকে প্যাড পরেছে।
প্রথম টেস্টে ডন খেলতে পারেনি। অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট বোর্ড আপত্তি জানিয়ে বলল, খবরের কাগজে ডন লিখতে পারবে না। ডন বলল, চুক্তি করেছি যখন তা রক্ষা করব। তাই নিয়ে সরগরম হয়ে ওঠে অস্ট্রেলিয়া। অবশেষে খবরের কাগজটিই জানাল, ডনকে লিখতে হবে না। এই নিয়ে ডনকে প্রচুর মানসিক টানাপোড়েন সহ্য করতে হয়।
