এরপর শারীরিক ধকল, এমসিসি-র বিরুদ্ধে অস্ট্রেলীয় একাদশের পক্ষে খেলার জন্য সিডনি থেকে পার্থ পাঁচ রাত ট্রেনে কাটিয়ে ডনকে পুরো দু-দিন ফিল্ড করতে হয়। তারপর বৃষ্টিভেজা উইকেটে ৩ ও ১০ রান করে আবার সিডনিতে ফিরেই ডন ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে খেলতে নামে। সে-খেলায় ডন ১৯৫ মিনিটে ২৩৮ করে এবং প্রথম শতরানটি ৭০ মিনিটে। দ্বিতীয় ইনিংসে ৫২ অপরাজিত। বিপক্ষে বোলার ছিল ফ্লিটউড-স্মিথ। এরপর ডনের শরীর পরিশ্রমের ধকল নিতে পারছিল না। তবু মেলবোর্নে গিয়ে আবার এমসিসি-র বিরুদ্ধে আর একটি ম্যাচ খেলে এবং রান করে ৩৬ ও ১৩। দু-বারেই আউট হয় লারউডের বলে। এই ম্যাচে জার্ডিন বডিলাইন আক্রমণের চেহারাটি প্রথম দেখালেন। খেলা, ট্রেনভ্রমণ এবং তর্কবিতর্ক—এই তিনের চাপ ফুটে উঠল নিউ সাউথ ওয়েলসের সঙ্গে এমসিসি-র খেলাটিতে। ডন করল ১৮ ও ২৩।
ডন বোর্ডকে জানাল, তার শরীর টেস্ট ম্যাচ খেলার উপযুক্ত নেই। ডাক্তার জানাল ওর পূর্ণ বিশ্রাম দরকার। সিডনিতে প্রথম টেস্ট ম্যাচটি সেদেখল দর্শকাসন থেকে। দেখল ম্যাককেবের অপরাজিত অসাধারণ ১৮৭, দেখল লারউডের অনবদ্য ফাস্ট বোলিং, বিশেষ করে দ্বিতীয় ইনিংসে দীর্ঘক্ষণের প্রচন্ড গতি বলের দ্বারা ২৮ রানে পাঁচটি উইকেট পাওয়া ১৮ ওভারে। অস্ট্রেলিয়া হারল ১০ উইকেটে।
মেলবোর্নে দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচে ডন খেলতে নামল। তার আগে ডনকে অনেকেই হুঁশিয়ার করে দেয়, ‘তোমার জন্য ইংল্যাণ্ড ফাস্ট বোলারদের এনেছে। তোমার ওপর তারা ঝাঁপিয়ে পড়বে।’ ডন শুনেছে, এমসিসি-দল অস্ট্রেলিয়ায় আসার পথে জাহাজে রোজই শলাপরামর্শ করত। প্রধানত ডনকে রোখার জন্যই হত শলাপরামর্শ। সেজানত তার ১৯৩০ সফরের প্রতিটি ইনিংস তন্নতন্ন করে ওরা বিশ্লেষণ করেছে তাকে অকেজো করার পথ খুঁজে বার করতে।
ওদের বিশ্বাস, শুধু ডনকে যদি বড়ো রান তোলা থেকে নিবৃত্ত করা যায়, তাহলেই অস্ট্রেলিয়াকে হারানো সম্ভব। ওরা খুঁজেপেতে দেখল ডনের একমাত্র দুর্বলতা, শক্ত পিচে খাঁটি ফাস্ট বোলিংয়ে। তারা এর সঙ্গে মেলাল লেগ থিয়োরিকে।
সমুদ্রতীরে এক বন্ধুর নির্জন সৈকতাবাসে ডন তার পরিকল্পনা তৈরি করল একাকী সারারাত।
সেব্যাটিং মধ্যমণি। সুতরাং লারউডের বজ্র থেকে সরে যাওয়া বা শুধুই ব্যাট দিয়ে আটকানো তার পক্ষে শোভা পায় না। ওসব কাজ বোলাররা করবে, তাকে করতে হবে রান। তাই সেপদ্ধতি বার করল : উইকেট থেকে সরে গিয়ে বল মারতে চেষ্টা করবে অফ-সাইড ফিল্ডের দিকে।
তার মানে, বোলারকে তখন অফ-সাইড জোরদার করতে হবে। যদি তা করে তাহলে তাকে লেগ-সাইড ফিল্ড কমজোরি করতে হবে। তাহলে ডন স্বাভাবিক ব্যাটিংয়ে ফিরে আসতে পারবে।
ঝুঁকি নিয়ে, বে-কেতাবি খেলা। কিন্তু তা ছাড়া উপায় নেই। এখনকার মতো এটাই যা-কিছু কাজের ছক।
মেলবোর্নে ডন যখন ব্যাট হাতে নামল, জনতা তুমুল অভিনন্দনে ফেটে পড়ল। অস্ট্রেলিয়ার ওস্তাদ নেমেছে। প্রথম টেস্ট হারের শোধ নেবেই নেবে। জনতার দারুণ প্রত্যাশা।
ডন ক্রিজের দিকে এগোচ্ছে। হারবার্ট সাটক্লিফ বলল, ‘কী দারুণভাবে স্বাগত জানাচ্ছে।’
‘যখন ফিরব, তখনও এটা এইরকম দারুণ থাকবে কি?’ গম্ভীর স্বরে ডন বলেছিল।
থাকেনি। কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে অসাড় স্তব্ধতার মধ্য দিয়ে ডন হেঁটে ফিরেছিল প্যাভিলিয়নে। বাওয়েসের প্রথম বল শর্টপিচ। ডন পুল করতে চেষ্টা করল এবং বলটিকে টেনে আনল লেগস্টাম্পে। প্রথম বলেই আউট ডনের জীবনে এই প্রথম এবং এই শেষ বারই ঘটল। জীবনের শেষ টেস্ট ইনিংসে সেআউট হয় দ্বিতীয় বলে।
অস্ট্রেলিয়ার দুঃসময়ে তার নায়ক দেশকে ডুবিয়ে দিল। সাফল্যের এইটাই জরিমানা; যদি একশোর কম রান করে তাহলে ধরে নেওয়া হয় ডন ব্যর্থ হয়েছে। অন্যান্য সাধারণ ব্যাটধারীকে আর ডনকে মাপার মানদন্ড এক নয়।
কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে ডন যথারীতি আবার নিজের খেলায় ফিরে এসে ১০৩ করল দলের ১৯১ রানের ইনিংসে। বডি লাইন শুরু হয়ে গেছে কিন্তু এই টেস্টে তা কার্যকরী হয়নি। আগের সপ্তাহে বৃষ্টি হওয়ায় উইকেট অস্বাভাবিক মন্থর ছিল বাউন্সারের পক্ষে।
ডন আবার বিগ্রহরূপে পূজিত হল। মাঠেই চাঁদা তুলে ডনকে দিল দর্শকরা। তাই দিয়ে সেমস্ত এক পিয়ানো কিনেছিল। পিয়ানোবাদনেও ডন রীতিমতো দক্ষ। অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় টেস্ট ১১১ রানে জিতেছিল।
অ্যাডিলেডে তৃতীয় টেস্টে বডি-লাইনের ঝড় মাতন তুলল। এমন বিশ্রীভাবে আর কখনো টেস্ট খেলা হয়নি। অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক বিল উডফুল দু-বার আঘাত পেলেন লারউডের বাউন্সারে। ওল্ডফিল্ড মুখে আঘাত পেয়ে অবসর নেন। ডন আট রান করে কট হয় লারউডের বলে।
গ্রীষ্মের শুষ্ক দিনে, ইংরেজ বোলিং পদ্ধতির বিরুদ্ধে বজ্রনির্ঘোষ ছড়িয়ে পড়ল মাঠ ঘিরে। দ্বিতীয় ইনিংসে ডন খেলতে নামল চোয়াল শক্ত করে। এবার সেতার পরিকল্পনা অনুযায়ী উইকেট থেকে পিছিয়ে গিয়ে অফের দিকে বল মারার চেষ্টা করতে লাগল। এভাবে খেলার জন্য অরক্ষিত থাকছিল তার স্টাম্প। দর্শকরা হইচই শুরু করে; তারা বুঝতে পারছে না ডনের এভাবে খেলার কী মানে হয়। দেখে মনে হচ্ছিল সেযেন বলের লাইন থেকে সরে যেতে চাইছে।
ডন মাথাখারাপের মতো ইনিংস খেলল। কেতাবে আছে এমন মার বোধ হয় সেএকটিও মারেনি।
