১৯৩০-৩১ মরসুমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ আসে অস্ট্রেলিয়া সফরে। দলটা খুব শক্ত ছিল না, জিতেছিল শুধু শেষ টেস্টটি ভিজে উইকেটে। অস্ট্রেলিয়া জিতেছিল প্রথম টেস্টে ১০ উইকেটে এবং দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ প্রত্যেকটিই ইনিংস ও ১০০ রানেরও বেশি ব্যবধানে। মাত্র পঞ্চম টেস্ট ছাড়া ডন আর কোনো ম্যাচে এক বারের বেশি ব্যাট করেনি। তাতেই সেতিন বার নিজেকে আলোচনার বিষয় করে ফেলল, তৃতীয় টেস্টে ২৩৩ ও চতুর্থে ১৫২ রান এবং পঞ্চম টেস্টে শূন্যরান করে। ফাস্ট বোলার গ্রিফিথের একটি মন্থর বলকে লেগে ঘোরাতে গিয়ে ডন বোল্ড হয়।
টেস্ট সিরিজ শেষে অ্যালান কিপ্যাক্সের নেতৃত্বে একটি দলের সঙ্গে ডন উত্তর কুইন্সল্যাণ্ড ও নিউ সাউথ ওয়েলস সফর করে। ব্ল্যাকহিথে লিথগো দলের বিরুদ্ধে একটি দ্বিতীয় শ্রেণির প্রদর্শনী ম্যাচে ডন ২২ বলে শতরান করে তিনটি আট বলের ওভারে! আসলে করেছিল ২৫৬ রান, তাতে ছিল ১৪টি ছয় ও ২৯টি চার। প্রথম ওভারেই ৩৮ রান করার পর ডন তিন ওভারে যুক্ত হওয়া ১০২ রানের মধ্যে নিজে করে ১০০ রান। প্রথম ওভারে ডনের স্কোর— ৬, ৬, ৪, ২, ৪, ৪, ৬, ১। দ্বিতীয় ওভারে— ৬, ৪, ৪, ৬, ৬, ৪, ৬, ৪। তৃতীয় ওভারে তার জুড়ি ওয়েণ্ডেল বিল ১ রান নেওয়ার পর ডন ৬, ৬, ১ রান করে। ওয়েণ্ডেল বিল তারপর ১ রান এবং ওভারের বাকি বলে ডন ৪, ৪, ৬ করে। মোটামুটি মিনিট পনেরোর মধ্যেই এই তিন ওভারের ব্যাপারটা সম্পন্ন হয়।
এই হচ্ছে সেই ডন, যার খেলা দেখতে লোক পাগল হয়। যেখানে খুশি বল মেরে পাঠায়। যত খুশি বোলার বদল হোক, ডন যেখানে মনে করবে সেখানেই বল পাঠাবে। লিথগো দলের হতভাগ্য বোলারদের মধ্যে ছিল বব নিকলসন। সেই মরসুমের শেষে ১৯৩২-এর ৩০ এপ্রিল ডনের বিয়ের দিন বব সিডনিতে এসে বিয়ের আসরে গান গেয়েছিল। ডনের ব্যাটিং তাকে মুগ্ধ করেছিল।
একবার সিডনিতে ভিক্টোরিয়ার ফ্লিটউড স্মিথ বল করেছিল ডনকে। নাগাড়ে বল, করে যাচ্ছে অফব্রেক বল আর ডন মিড অফ এবং এক্সট্রা কভার পয়েন্টের মাঝের ফাঁক দিয়ে সেগুলো বাউণ্ডারিতে পাঠাচ্ছে।
অবশেষে ডন বোলারকে বলল, ‘ব্যাপার কী, ফাঁকটা বন্ধ করছ না কেন? যত বার অফব্রেক দেবে তত বারই যে আমি ওই ফাঁকটা দিয়ে বল পাঠাব।’
ডনের পক্ষে তা সম্ভব, তাই একজন ফিল্ডসম্যান রাখা হল সেই ফাঁকে। মুচকি হেসে বোলার বলল, ‘এবার কী করবে?’
‘এবার,’ একগাল হেসে ডন বলল, ‘এবার তোমায় গ্যালারিতে পাঠাব।’ এবং পাঠিয়েও ছিল।
চ্যাটসউডে গর্ডন দলের বিরুদ্ধে ডন ১৭১ মিনিটে ২০১ রান করে। দ্বিতীয় শতরানটি ৪৫ মিনিটে। একটা হাফভলি বলে সেওভার বাউণ্ডারি মেরেছিল পয়েন্ট দিয়ে। একজন ফিল্ডার বলল, এটা মিস হিট থেকে হয়ে গেছে। পরের ওভারে ডন একইভাবে বল মেরে পয়েন্ট থেকেই ছয় রান পায়। মাঠটা অবশ্য ছোটো ছিল।
লর্ডসে ১৯৪৮-এ ইংল্যাণ্ড অধিনায়ক নর্মান ইয়ার্ডলি দেখল দুই ফিল্ডারের মাঝ দিয়ে ডন বার বার বল ড্রাইভ করে যাচ্ছে। ফাঁকটা বন্ধ করার জন্য সেএকজন ফিল্ডারকে সরিয়ে আনল। ডন নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিতে শুধু দেখল। পরের বলটি সেভাবলেশহীন মুখে ঠিক সেই জায়গাটিতেই পাঠাল, যেখান থেকে ফিল্ডারটিকে সরিয়ে আনা হয়েছে।
চ্যালেঞ্জ পেলে বিশেষ কোনো মার ডন আবার মেরে দেখাতে পারত।
দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্ট দল ১৯৩১-৩২ মরসুমে অস্ট্রেলিয়া সফরে আসে। অস্ট্রেলিয়া সহজে পাঁচটি টেস্টেই জেতে প্রধানত ডনের জন্য। চারটি টেস্টে খেলে সেচারটি শতরান করে : ২২৬, ১১২, ১৬৭ ও ২৯৯ নট আউট। অন্য দুটি ম্যাচেও দুটি শতরান করে সফরকারীদের বিরুদ্ধে : ১৩৫, ২১৯। সিরিজে চারটি টেস্টে তার গড় ছিল ২০১.৫ রান। ডন পঞ্চম টেস্টেও দলে ছিল। ফিল্ড করতে যাওয়ার আগে ড্রেসিং রুমে পা মচকে যাওয়ায় ব্যাট করতে পারেনি। ক্ল্যারি গ্রিমেট দলে থেকেও ব্যাট করেনি। করার দরকার হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকা ৩৬ ও ৪৫ রানে আউট হয়। আয়রনমঙ্গার ২৪ রানে ১১ উইকেট নেয়। এই সিরিজে ৮০৬ রান করার পর ডন বিনীতভাবে বলেছিল, ‘খারাপ ফিল্ডিংয়ের জন্যই রান পেয়েছি।’
ডন একদিন এক খবরের কাগজের অফিস থেকে বেরিয়ে আসছে; তখন ঢুকছিল দক্ষিণ আফ্রিকার ফাস্ট বোলার স্যান্ডি বেল। ডনের অপস্রিয়মাণ চেহারার দিকে তাকিয়ে বেল মন্তব্য করে : ‘এই সফরে এই প্রথম আমি এর পিঠ দেখলাম!’
কুইন্সল্যাণ্ডের ‘কুকটাউন ইন্ডিপেণ্ডেন্ট’ নামে এক খবরের কাগজ এই টেস্ট সিরিজ চলাকালে ডনকে পরলোকে পাঠিয়ে দেয়। তারা লেখে : ‘বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যানের পরলোকগমনে অস্ট্রেলিয়া আজ শোকাহত। ব্রিসবেন টেস্ট ম্যাচ চলাকালে ডন ব্র্যাডম্যান আমাশয়ে আক্রান্ত হয়ে শনিবার মারা গেছেন।’
খবরটি পড়ে ডন খুব হেসেছিল। খুব কম লোকেরই নিজের মৃত্যুসংবাদ পাঠের ভাগ্য হয়। এই সময় সেজনপ্রিয়তার তুঙ্গে আরোহণ করেছিল। ট্রেনে কোথাও গেলে প্রত্যেক স্টেশনে দলে দলে ক্রিকেটপাগলরা তার নাম ধরে কামরায় কামরায় খোঁজাখুঁজি করে, রাস্তায় বেরোলে ভিড় জমে যায়। নীরব, নির্বিবাদী ডনের পক্ষে এই বীরপূজা সামলাতে যে ধকল সহ্য করতে হচ্ছিল, তাতে মানসিক দিক থেকে তার ক্ষয় হত।
বাওরালের লোকেরা তাকে উপহার দেয় সোনার ঘড়ি ও চেন। এক মোটর গাড়ির প্রতিষ্ঠান দেয় নতুন একটি স্পোর্টস কার। এই সময় সারা অস্ট্রেলিয়ার চোখে ডন ছিল ভগবানের প্রায় সমতুল।
