এর ফলে সিডনিতে দ্বিতীয় টেস্টে ডন দ্বাদশ ব্যক্তি হল। ব্যাট করতে পারল না। কিন্তু প্রায় সারা ম্যাচে তাকে ফিল্ড করতে হল, লারউডের বলে পন্সফোর্ডের আঙুলের হাড় ভেঙে যাওয়ায়। টেটের ক্যাচ ধরা ছাড়া উল্লেখযোগ্য আর কিছুই সেকরেনি। এই খেলাতেও অস্ট্রেলিয়া ভালোভাবেই হারল, ৮ ইউকেটে।
মেলবোর্নে তৃতীয় টেস্ট ম্যাচ খেলা। পন্সফোর্ডের আঙুল তখনও সারেনি তাই ডনকে দলে নেওয়া হল। ডনের যা চরিত্র ব্যর্থতার পরই তার দ্বিগুণ বিক্রমে ফিরে আসা—এক্ষেত্রেও তাই ঘটল। রান করল ৭৯ ও ১১২। অবশ্য তা সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়া হারে ৩ উইকেটে। সেই সময়ে ডনই বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট শতরানকারীর সম্মান পায়। পাঁচ মিনিট ধরে দর্শকরা দাঁড়িয়ে থেকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। ব্যর্থতার স্মৃতি আর কারুর মনে নেই। নতুন ছেলেটি তার নির্বাচনকে অবশেষে সার্থকতা দিয়েছে। এরপর ডন আর কখনো অস্ট্রেলিয়া দল থেকে বাদ পড়েনি।
প্রথম শ্রেণির খেলায় ডনের প্রথম ত্রিশত রান হল এর পরের ম্যাচেই সিডনিতে ভিক্টোরিয়ার বিরুদ্ধে—৩৪০ নট আউট।
ব্র্যাডম্যানের প্রথম টেস্ট রেকর্ড—বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট শতরানকারীর খেতাবটি অ্যাডিলেডে চতুর্থ টেস্টেই তার মাথা থেকে তুলে নেয় ১৯ বছরের আর্চি জ্যাকসন ১৫৪ রান করে। এটি জ্যাকসনের প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলাও! এর চার বছর পরই সেটিবি রোগে মারা যায়।
অ্যাডিলেডে ইংল্যাণ্ড ১২ রানে জেতে। দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৮ রান করে ডন এক চুলের জন্য রান আউট না হলে এ খেলায় ইংল্যাণ্ড জিতত কি না সন্দেহ। প্রথম ইনিংসে সে৪০ করেছিল। ইংল্যাণ্ডের হ্যামণ্ড করে ১১৯ নট আউট ও ১৭৭।
মেলবোর্নে অস্ট্রেলিয়া পঞ্চম টেস্ট ম্যাচ শুরু করে ০-৪ ম্যাচে পিছিয়ে থেকে। সিরিজে প্রথম জিত হল ৫ উইকেটে। ডনের রান ১২৩ ও ৩৭ নট আউট।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ডনের প্রথম পুরো মরসুমটি যখন শেষ হল, দেখা গেল তার ১,৬৯০ রান হয়েছে। এক মরশুমে অস্ট্রেলিয়ায় আগে কেউ এত রান করেনি। আর ২৪ ইনিংসে সাতটি শতরান করে গড় দাঁড়িয়েছে ৯৩.৮৮; এটাও রেকর্ড। ডন নিজে না ভাঙা পর্যন্ত রেকর্ডটি অটুট ছিল।
এই এক বছরে ডন অনেক কিছু শিখে নেয়। শেখার এখনও অনেকই বাকি। ১৭ বছর বয়স হওয়ার আগে পর্যন্ত ডন কখনো ভিজে উইকেটে খেলেনি। মেলবোর্নে তৃতীয় টেস্ট ম্যাচে গভীর মনোযোগে সেহবস ও সাটক্লিফের ভিজে উইকেটে ব্যাট করার ওস্তাদি দেখে তাজ্জব বনে যায়। কিন্তু ডন এই একটা ব্যাপারে কোনোদিনই দক্ষতা দেখাতে পারেনি। অত বিরাট ব্যাটসম্যানের এই একটিই দুর্বলতা ছিল—ভিজে উইকেটে।
কিন্তু সারা সিডনি এখন মেতে উঠেছে আমাদের ডনকে নিয়ে। যেভাবে ওরা ‘আমাদের বন্দর’ ‘আমাদের ব্রিজ’ বলে গর্ব করে, ঠিক সেইভাবে তারা ‘আমাদের ডন’ কথাটি উচ্চারণ করতে শুরু করে। নিউ সাউথ ওয়েলসবাসীদের ধারণায় বিশ্বে যে ক-টি আধুনিক বিস্ময় আছে তার মধ্যে সিডনি বন্দরের ব্রিজটি অন্যতম। ডনও তাই।
ইংল্যাণ্ড ৪-১ ম্যাচে টেস্ট সিরিজটি জিতেছে। কিন্তু এরপর প্রধানত ডনের জন্যই ইংল্যাণ্ড পরবর্তী সিরিজটি জিতবে ডনের অবসর নেওয়ার পাঁচ বছর পর অর্থাৎ ১৯৫৩ সালে।
০৬. বিশ্বরেকর্ড
এই আমলে ব্র্যাডম্যানকে কেমন দেখতে ছিল? খোলামেলা কিন্তু শক্ত চোয়াল, সজীব ঝকঝকে হাসি, সাজানো সবল দাঁত। হ্রস্ব কাঠামোর দেহটি প্রচন্ডভাবে নমনীয় ও চটপটে। ওর সারা অবয়ব থেকে বিচ্ছুরিত হত স্বনির্ভরতা। হাঁকড়াত প্রবলভাবে, খেলত আত্মবিশ্বাস নিয়ে। মাঠে ইগলের মতো ছোঁ মেরে বল কুড়োত, ছুড়ত মারণাস্ত্রের মতো।
উচ্ছল ব্যাটধারী, উইকেট আঁকড়ে পড়ে থাকার জন্য নয়, খেলত রান সংগ্রহের জন্য। প্রতিটি বলে সেরান খুঁজত। যতক্ষণ-না সাবধান হওয়া একান্তই দরকার, ততক্ষণ সেব্যগ্র। বিশ্বাস করত মাঠে রাজত্ব করবে ব্যাটধারী, বোলার নয়। ব্যাটধারীর প্রাধান্য সবাইকে মানতে হবে।
ডন এমনই ব্যাটধারী, যার দিকে দর্শকরা তাকিয়ে থাকতে ভালোবাসত। ওর স্ট্রোকগুলি ঠিক শাস্ত্রীয় রীতি অনুসারী নয়, কিন্তু দেখে আনন্দ হয়। পন্সফোর্ডের মতো গোমড়া পদ্ধতির ব্যাটধারীর পাশাপাশি ডনকে দেখলে মনে হত, সেযেন ক্রিজে থাকতে খুব মজা পায়; এবং সত্যিই পেত।
তখনও পর্যন্ত তার সামনে দেখা দেয়নি—দল নির্বাচনের, কৌশল উদ্ভাবনের দলগত সমস্যা সমাধানের বা নৈশভোজের পর বক্তৃতা দেওয়ার দুশ্চিন্তা, যেগুলি অধিনায়ক হিসাবে তার কর্তব্যের অন্তর্গত হবে। তখনও পর্যন্ত খবরের কাগজের রিপোর্টার, ফোটোগ্রাফার, অটোগ্রাফ-শিকারি এবং ভক্তদের ভনভনানি তাকে অসুখী বা বিরক্ত করে তোলেনি। সন্দেহ নেই এসব ব্যাপার খুশি হওয়ার মতোই, কিন্তু ডনকে এগুলো ক্ষয় করে দিত। সেচাইত মাঠের বাইরে তার ব্যক্তিগত জীবন ব্যক্তিগতই থাকুক। তখন পর্যন্ত সেগায়ে-পড়া পূর্ব বন্ধুত্বের দাবিদার, অজানা লোকদের আবদার ও জ্বালাতনের শিকার হয়নি। তখনও পর্যন্ত ভগ্নস্বাস্থ্য তাকে বিব্রত করেনি; ডন ব্র্যাডম্যান তখন কর্মঠ, চঞ্চল, দুর্বার শারীরিক সক্ষমতার অধিকারী।
ডনের ব্যাটের হাতল-ধরা মুঠোটা নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে এবং তাই নিয়ে ডন প্রায়শই বিবেচনা করেছে। কংক্রিট পিচে খেলার জন্যই তার ব্যাট ধরার ভঙ্গিটি অন্যরকম হয়।
