অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের অবস্থা তখন ভালো নয়। রীতিমতো দুর্দিন উপস্থিত হয়েছে একসঙ্গে কয়েক জন নামি খেলোয়াড় অবসর নেওয়ায়। চ্যাপম্যান যে-দল নিয়ে অভিযানে আসছে তাতে আছে বাঘা বাঘা খেলোয়াড়রা— হ্যামণ্ড, হবস, সাটক্লিফ, হেনড্রেন, টেট প্রভৃতিরা।
অস্ট্রেলিয়ার ভয় বেদম পিটুনি খাওয়ার। মনে ক্ষীণ আশা, ডন হয়তো ভেলকি দেখালেও দেখাতে পারে।
ডন বুঝেছে যদি বড়ো ক্রিকেটার হতে হয়, টেস্ট খেলার স্বপ্ন সার্থক করতে হয়, তাহলে বাওরাল থেকে সিডনি যাতায়াত করে খেললে চলবে না। সিডনিতে গিয়ে বাস করতে হবে এবং ঘাসের উইকেটে নিয়মিত খেলতে হবে। ভাগ্য সহায় হল। ডন যার কাছে চাকরি করত সেই সম্পত্তি কেনাবেচার দালাল ঠিক করলেন সিডনিতে অফিস খুলবেন। ডনের প্রয়োজনের কথা ভেবে তিনি ওকে সিডনি অফিসে চাকরি দিলেন। ডন কালক্ষেপ না করে বাওরাল ছেড়ে সিডনিতে চলে এল।
০৫. প্রথম টেস্ট
অস্ট্রেলীয় টেস্ট দল গড়ার জন্য ১৯২৮-২৯ মরশুমের শুরুতেই যে ট্রায়াল খেলা হয়, তাতে ডন ব্র্যাডম্যানের রান দেখে সারা অস্ট্রেলিয়া হতাশায় মুহ্যমান হয়ে পড়ে। ১৪ এবং ৫। সে-দেশের লোক বলাবলি করল, ট্রায়ালেই যদি সবথেকে সম্ভাবনাময় ছেলেটি এই রান করে তাহলে টেস্টে করবে কী?
এক সপ্তাহ পর কুইন্সল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে ডন ১৩১ ও ১৩৩ নট আউট করায় অস্ট্রেলিয়া আবার মুখর হয়ে উঠল।
ইংরেজ খেলোয়াড়দের সঙ্গে ডন মুখোমুখি হল সিডনিতে নিউ সাউথ ওয়েলস বনাম এমসিসি-র খেলায়। তাকে খেলতে হল টেট, হ্যামণ্ড, লারউড এবং ‘টিচ’ ফ্রিম্যানের বল। চার বছর পরই অবশ্য ব্র্যাডম্যান-লারউড নাম দুটি ক্রিকেট ইতিহাসের সবথেকে বিশ্রী এক অধ্যায়ের সঙ্গে চিরকালের মতো যুক্ত হয়ে যায়।
ডন প্রথম ইনিংসে ৮৭ দ্বিতীয় ইনিংসে ১৩২নট আউট থাকে। তার খেলা হ্যামণ্ডকেও অবাক করে।
খেলাটি যখন আরম্ভ হচ্ছে হ্যামণ্ড তখনও ডি জি ব্র্যাডম্যানের নামটি পর্যন্ত শোনেনি। গেঁয়ো ধরনের ছেলেটি যখন বল করতে এল, উইকেটে হ্যামণ্ড ও হেনড্রেন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে মনস্থ করে ছোকরাকে কিছু ক্রিকেট শিক্ষা দেওয়া যাক। অনেকের মতে ফাস্ট বোলিংয়ে যত হুকার দেখা গেছে হেনড্রেন তাদের সেরা। ডনের বলে হেনড্রেন একটি চার ও দুটি ছয় মেরে আর একটি ছয় মারতে গিয়ে ক্যাচ আউট হয়।
পরের ওভারে হ্যামণ্ড ২৪ রান নিল ডনের বলে। বলা বাহুল্য, ডনকে আর বল করতে দেওয়া হয়নি। মরিস লেল্যাণ্ড মিড অফে বল মেরে রান নেওয়ার জন্য ডাক দেয়, হ্যামণ্ড দৌড়ে অপর প্রান্তে পৌঁছোনোর আগেই ব্র্যাডম্যান বিদ্যুৎগতিতে বল পাঠিয়ে দেয় উইকেটকিপার বার্টি ওল্ডফিল্ডের হাতে। হ্যামণ্ড রান আউট হয়ে ফিরে এসে জিজ্ঞাসা করে, ‘ওর নাম কী?’
‘ডন ব্র্যাডম্যান’ কে একজন বলল।
‘মনে রাখব নামটা।’
হ্যামণ্ডকে মনে রাখতে হয়েছিল। যখন দুজনেই অধিনায়ক হয়েছিল নিজ নিজ দেশের তখন ডনের নাম এবং তার পারদর্শিতার কথা প্রতি মুহূর্তে হ্যামণ্ডকে স্মরণ করতে হয়েছে।
এই সময়ে ডন বল করা ছেড়ে দেয়। এমসিসি-র বিরুদ্ধে ডন আর একটি ম্যাচ খেলে অস্ট্রেলীয় একাদশের পক্ষে। ডন প্রথম ইনিংসে ২০০ মিনিটে ৫৮ রান করে অপরাজিত থাকে। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৮।
এরপর এল ভয়ংকর প্রতীক্ষার পালা। ডনের মনে একটিই চিন্তা, টেস্ট দলে সেআসতে পারবে কি পারবে না। প্রথমদিকে যে-সাফল্য সেদেখিয়েছে, পরের ব্যর্থতাকে তা কি ঢেকে দেবে না?
রাত্রে টেস্ট দলের নাম ঘোষণা হবে রেডিয়োয়। দেরি হচ্ছে ঘোষণা হতে, ডন রেডিয়ো নিয়ে বিছানায় শুয়ে। নাম ঘোষিত হবে বর্ণমালা অনুসারে। প্রথমেই শোনা গেল তার নাম। কুড়ি বছর বয়সে ডন অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে খেলবে। অধিকাংশ ছেলের কাছে এটাই উচ্চাকাঙ্ক্ষার চুড়োয় পৌঁছে যাওয়া। হয়তো ডনের নজর তখনই আরও উঁচুতে অধিনায়কত্বের ওপরে গিয়ে পড়েছিল।
প্রথম টেস্ট খেলা হল ব্রিসবেনে। অমন অকল্পনীয়ভাবে মার খাওয়া ডন বিশ্বাস করতে পারছিল না। ৬৭৫ রানে ইংল্যাণ্ডের কাছে হার? এত রানে আগে অস্ট্রেলিয়া কখনো হারেনি। ইংল্যাণ্ড প্রথম ব্যাট করে তুলল ৫২১ রান। অস্ট্রেলিয়া জবাব দিল মাত্র ১২২ রান করে। তার মধ্যে ডনের রান মাত্র ১৮। টেটের একটা ধীর বলে সেএলবিডব্লু আউট হয়। ইংল্যাণ্ড ফলো অন না করিয়ে আবার ব্যাট করে দ্বিতীয় ইনিংস ছাড়ে ভিজে উইকেটে অস্ট্রেলিয়াকে ৭৪১ রান তুলে জেতার সুযোগ দিয়ে। অস্ট্রেলিয়া তোলে ৬৬ রান। তার মধ্যে ডনের অবদান একটি মাত্র রান। কাদার আঠালো উইকেটে কীভাবে খেলতে হয় ডন তখনও তা জানে না।
এরপর ডন ইংল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে অত্যন্ত নির্মমতার সঙ্গে টেস্ট খেলেছে; এবং তার কারণ হয়তো প্রথম টেস্ট খেলাতেই এই অপমানকর পরাজয়ের জ্বালা সেকিছুতেই ভুলতে পারেনি। ইংল্যাণ্ডকে ক্ষমাহীন নিষ্ঠুরতায় হারানোর জন্য যখনই তার সমালোচনা হয়েছে সেসবসময়ই পালটা জবাবে বলেছে, ‘১৯২৮-এ চ্যাপম্যান কী করেছিল?’
ব্রিসবেন টেস্ট অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ইতিহাসে ‘কালা টেস্ট’, ডনের পক্ষেও বিপর্যয়কর। ব্যাটে ব্যর্থ, সম্ভাব্য দুটি ক্যাচও ফেলেছে। ভবিষ্যতে যে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ রান সংগ্রাহক হবে তার কোনো আভাস এ খেলায় নেই। সেব্যর্থ, তার ওপর ভরসা রাখা যায় না। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটভক্তরা বিরক্ত হয়ে উঠল।
