ডান হাতের ব্যাটধারীরা যখন ব্যাটের হ্যাণ্ডেলটি মুঠো করে ধরে, তখন হ্যাণ্ডেলটি তালুর মাঝ বরাবর দিয়ে বঁা-হাতের বুড়ো আঙুলের গোড়ায় ঢিবির মতো গোল অংশটির ওপর রক্ষিত হয়। কিন্তু ডন এমনভাবে হ্যাণ্ডেলটি ধরত যার ফলে বাম কবজিটা থাকত হ্যাণ্ডেলের পিছন দিকে—উদ্দেশ্য, আঘাত থেকে বাম হাতের আঙুলগুলিকে লুকিয়ে রাখা।
এই মুঠিতে কভার ড্রাইভ করতে তার কিছুটা অসুবিধা ঘটত ও প্রত্যেক বার বল মারার সময় তার বুড়ো আঙুলে ধাক্কা লাগত, কিন্তু তার ব্যাট ধরার মুঠি আঙুলগুলোকে ও তালুর পিছনকে আঘাতের কবল থেকে রক্ষা করেছিল এবং এইরকম মুঠির জন্য ব্যাটটিকে সেজমির ওপর ৪৫ ডিগ্রি কোণ পর্যন্ত ঝুঁকিয়ে দিতে পারত, ফলে ব্যাটে লেগে বল আর উঠত না। এইরকম মুঠিতে ব্যাট ধরলে হুক এবং কাট করায় খুবই সুবিধা হয় এবং এই দুটিতে ডন ভয়ংকর ছিল। যখন হুক করত, ব্যাটের মুখটা বলের উপরে থাকত, ফলে আঘাত পেয়েই বল জমির দিকে নেমে আসত। অন্য ব্যাটধারীদের পক্ষে হুক শটে বলকে নামিয়ে রাখাটা শক্ত হয়, ডনের পক্ষে বল তোলাটাই শক্ত ছিল।
নিজের খেলার স্টাইল নিয়েও ডন এই সময় ভেবেছে। তার খেলাটা গড়ে উঠেছিল প্রধানতই পিছিয়ে এসে খেলার ওপর। তার গাঁট্টাগোট্টা চেহারা পা এগিয়ে ড্রাইভ করে খেলার অনুকূল ছিল না। বলের পিচের কাছে পা বাড়িয়ে পৌঁছোবার মতো শরীরের আকার ছিল না, যদি-না বলটা একটু ওভারপিচ হত।
রান তোলার জন্য তার সেরা মারগুলির অন্যতম ছিল অফ স্টাম্পের বাইরের শর্ট পিচ বল পুল করে লেগের দিকে মারা। এইভাবে মারতে গিয়ে বল যাতে উঁচুতে না ওঠে সেজন্য সেক্রস ব্যাটে অর্থাৎ ব্যাটটিকে আড়াআড়িভাবে চালাত। এতে ঝুঁকি ছিল খুবই।
প্রবীণ ক্রিকেটাররা ডনকে এ সম্পর্কে সুপরামর্শ দেন। মরিস টেট বলেন, ইংল্যাণ্ডে যদি রান পেতে চাও, তাহলে ব্যাট সিধে রেখে খেলতে হবে। ফ্রাঙ্ক উলিও তাই বলেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সবথেকে কম সময়ে মাত্র ৩৫ মিনিটে শতরানকারী পার্সি ফেণ্ডারও ডনকে একই উপদেশ দেন।
ডন উপদেশ-পরামর্শ প্রচুর পেয়েছে, কিন্তু সব কিছু ভেবে ঠিক করে নিজের মতো করেই সেখেলবে। এইভাবে খেলে সেপ্রচুর রান পাচ্ছে এবং রান পাওয়ার জন্যই তো ব্যাট করা, সুতরাং মুঠি বা স্ট্রোক বদল করার দরকার কী। তার মতে, ‘অন্যরকমভাবে খেলা মানেই ভুল খেলা নয়।’
পরের মরশুমেই সেএকথার সত্যতা প্রমাণ করল সর্বোচ্চ রানের নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়ে।
১৯২৯-৩০ মরশুমে নিউজিল্যাণ্ডগামী এমসিসি-র বিরুদ্ধে একটি খেলায় ১৫৭ ও একটি টেস্ট ট্রায়ালে ডন ১২৪ রান করে সর্বশেষ আউট হয় এবং তার দলকে ফলো অন করতে হওয়ায় প্রথম ব্যাট করতে পাঠানো হয়। দিনের শেষে ডন ২০৫ রানে অপরাজিত থাকে।
এই মরশুমে শেফিল্ড শিল্ডের খেলায় ডন একটিই তিন অঙ্কের রান করে কুইন্সল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে।
দোষ কুইন্সল্যাণ্ডেরই। তারা প্রথম ইনিংসে ডন ৩ রান করা মাত্র ক্যাচ ধরে তাকে আউট করে দেয়। ফলে যথারীতি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য নির্মম হয়ে ওঠে। ঘটনাটি সিডনি মাঠে ঘটেছিল।
ডন ইনিংস শুরু করে শনিবারে। প্রথম ৫০ রান করে ৫৪ মিনিটে, শতরান ১০৩ মিনিটে। তারপর অভ্যাসমতো রান তোলার গতি বাড়িয়ে দেয়। ১৫০ করল ১৪০ মিনিটে, ২০০ হল ১৮৫ মিনিটে। শনিবার খেলা শেষে ডন ২০৫ রানে অপরাজিত।
রবিবার বিশ্রাম নিয়ে ডন ঝরঝরে তাজা হয়ে সোমবার খেলতে নামল। লাঞ্চের আগে যোগ করল আরও ১০৫ রান। তিনশো রান করার পরই সেঠিক করে পন্সফোর্ডের ৪৩৭ রানের বিশ্বরেকর্ডটি ভাঙতে হবে। এবং ডন যা ইচ্ছা করে, সচরাচর সেটি সেপূরণই করবে।
সেদিন তার একটি মারেও ভুল হয়নি। তার ব্যাট ঝলসেছে আর বোলার এবং ফিল্ডকারীরা ঘেমেছে। ডন ড্রাইভ, হুক আর কাট করছে পরম আনন্দে। ২০৩ মিনিটে ২৫০ রান, ২৮৮ মিনিটে ৩০০ রান, ৩৩৩ মিনিটে ৩৫০ রান এবং ৩৭৭ মিনিটে ৪০০ রানে পৌঁছোয়। পন্সফোর্ডের ৪৩৭ রান অতিক্রম করতে চার রান বাকি, বল করছে থারলো এবং ডন জানে বলটি হবে শর্ট পিচ লেগ স্টাম্পের ওপর। হলও তাই। হুক করে চার রানটি নিয়ে বিশ্বরেকর্ড স্থাপন করে। সে৪৫০ রানে পৌঁছোয়, তখন ৪১৪ মিনিট ক্রিজে থাকা তার সম্পূর্ণ হয়েছে। নিউ সাউথ ওয়েলস ইনিংস ডিক্লেয়ার করার সময় ডনের রান ৪৫২ অপরাজিত ৪১৫ মিনিটে। পনসফোর্ড ৪৩৭ রান তুলতে সময় নেয় ৬২১ মিনিট।
এই খেলার পর আর কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না যে, ১৯৩০-এর ইংল্যাণ্ড সফরে ডন দলভুক্ত হবে কি না।
০৭. প্রথম সফর
প্রথম বার ইংল্যাণ্ডে এসে ডন যা-কিছু দেখে তাতেই উত্তেজিত হয়ে ওঠে; এবং ইংল্যাণ্ড উত্তেজিত হয় তার ব্যাটিংয়ে। ইংল্যাণ্ড বোলাররা যত বিপন্ন হয়েছে, ইংরেজরা ততই তাকে পছন্দ করেছে। ১৯৩০ মরশুমে সকলের মুখে মুখে ব্র্যাডম্যানের নাম। দলে দলে ইংরেজ দর্শকরা মাঠে ভিড় করেছে তাদের নিজেদের সেরা বোলারদের দুর্দশা দেখতে এবং সেতা দেখিয়েছেও। তার রানকে ঘিরে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস গড়ে উঠত, তার রানই দলকে সফল করে তোলে।
সফরের প্রথম খেলা উরস্টারে। ডন ২৯০ মিনিটে করল ২৩৬ রান। পরের ম্যাচ লিস্টারে, রইল ১৮৫ নট আউট। সফরের প্রথমদিকেই ডন ইংল্যাণ্ডের মাঠের উইকেটের চরিত্র বুঝে নেয়। ভারী আবহাওয়া বলকে সুইংয়ে সাহায্য করে, উইকেটে ঘাস বেশি তাই বোলাররা পিচ থেকে কিছুটা সাহায্য পায় বটে কিন্তু পিচে পড়ার পর বল আসে মন্থরগতিতে। যেহেতু ডন হ্রস্বাকৃতি এবং পিছিয়ে এসে খেলার অভ্যাসটাই বেশি, তাই মন্থর উইকেট তার পছন্দই হল। কিন্তু অসুবিধায় পড়ল কনকনে ঠাণ্ডায়। সোয়েটার, ব্লেজার, ওভারকোট পরে আগুনের ধারে বসে অপেক্ষার পর মাঠে নেমে ব্যাট চালানোর মতো অস্বস্তিকর ব্যাপার আর কী হতে পারে!
