গুলাবি তাই আজ শিরোমণির গড়ে চলেছে। তার ডান হাতে একটা ধারালো দা। বাঁ হাতের আঙুলে দড়ির ডগায় ঝুলছে একটা গোলা পায়রা। গুলাবি আজ শিরোমণির গড়ে পায়রা বলি চড়াবে। বলি চড়িয়ে রাজা শিরোমণিকে জোড়হস্তে বলবে, রাজা! তোমাকে তো নতুন। করে কিছু বলার নেই। ঘরে খাবার মুখ ছয়খানা। তাদের অর্ধেক বছরের খোরাক ওই দেড়বিঘে জমির মকাইদানা, তাও যদি গোলায় ওঠে, তবেই।
বনের ধারে জমি। ফসল খেয়ে যাবার জন্যে বুনো শুয়োর আছে, সজারু আছে, এমনকি টিয়াপাখিও বড় শত্রু। একটু অন্যমনস্ক হলেই এরা সব তছনছ করে দিয়ে চলে যাবে। তবু ঠাকুর, দিন নেই রাত নেই মেয়ে মরদে পালা করে জেগে, খালি টিনের ক্যানেস্তারা বাজিয়ে, কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে এদের হাত থেকে ফসল বাঁচানো যায়। কিন্তু ক্ষেতের ওপর একবার যদি মহাকাল বাবাদের দৃষ্টি পড়ে, তা হলে আর কোনও উপায় নাই। এক রাতের মধ্যে সমস্ত ফসল খেয়ে ছড়িয়ে, শুড়ে দাঁতে জমি নতুন করে চষে দিয়ে তারা ভোরবেলা গা দোলাতে দোলাতে জঙ্গলে ফিরে যাবে। পেছনে পড়ে থাকবো আমরা ছটি প্রাণী, সারা বছর উপোসের চিন্তা নিয়ে।
তাই এইটুকুই প্রার্থণা শিরোমণিমহারাজ, তোমার হাতির পালের নজর থেকে আমার ওই একটুকরো জমিকে তুমি রক্ষা কর।
গুলাবি চকচকি গ্রাম থেকে বেরিয়েছিল দুপুরবেলায়। সংসারের সমস্ত কাজ সেরে তার আগে আর পারেনি। হাঁটতে হাঁটতে ক্রমশ সে গ্রামের লাগোয়া হালকা জঙ্গল ছাড়িয়ে ঢুকে পড়েছিল বি.টি.আর-এর কোর-এরিয়ার গহন অরণ্যের মধ্যে। কিছুদূর অবধি ফরেস্টের লোকেদের গাড়ি চলাচলের মতন সরু পিচরাস্তা ছিল। একটা জায়গার পর তাও শেষ হয়ে গেল। এরপর শুধুই জন্তুদের পায়ে পায়ে তৈরি শুড়িপথ। সেই শুড়িপথ ধরেই এগিয়ে চলেছিল গুলাবি। বেলা সবে হয়তো একটা, কিন্তু গাছের পাতার ফাঁক ফোকর দিয়ে নীচে যেটুকু আলো চুঁইয়ে পড়েছে। তার রং এখনই মরা হলুদ। গুলাবি এই বনেরই মেয়ে। এইসব জঙ্গলে কাঠ কুড়িয়ে, ব্যাঙের ছাতা কুড়িয়ে তার ছেলেবেলা কেটেছে। তবু তারও একটু ভয় ভয় করতে লাগল। অন্য কোনও কারণে নয়, ওই বুনো হাতিদের কথা ভেবেই। শিরোমণির গড়ের টিলাটা বেয়ে যতই সে ওপরে উঠতে লাগল ততই তার নাকে আসতে লাগল পাকা চালতার গন্ধ। এই টিলার ঢালে অনেকটা জায়গা জুড়ে বুনো চালতার জঙ্গল রয়েছে। আর কে না জানে, পাকা চালতা মহাকালবাবাদের কত প্রিয়?
বনের মেয়ে গুলাবির আশঙ্কাকে সত্যি প্রমাণিত করে একটু বাদেই তার সামনের ঘন। জঙ্গলের আড়াল থেকে শাঁখের আওয়াজের মতন হাতির হুঙ্কার ভেসে এল কাঁআআআঁঅ্যাঁ।
এটা সাবধান করে দেওয়ার ডাক। গুলাবির উপস্থিতি ওরা বুঝতে পেরেছে, আর বুঝতে পেরেই তার উদ্দেশ্যে চেতাবনি পাঠিয়েছে–এদিকে আর এক পা-ও বাড়িয়ো না হে। ভালোমানুষের বেটি! আমরা এমনিতে ভদ্র। কিন্তু খাওয়ার সময় বিরক্ত করা পছন্দ করি না। আর জানো তো, রাগলে আমাদের মতন বাজে জানোয়ার সারা পৃথিবীতে আর নেই?
জানে বই কি, খুব ভালো করে সে কথা জানে গুলাবি নার্জিনারি। ছোটবেলা থেকে কম আত্মীয়বন্ধুকে সে ক্ষ্যাপা হাতির পায়ের তলায় থেঁতলে মরতে দেখেছে না কি? হাতির ডাক শোনা মাত্রই তাই সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর সোজা রাস্তা ছেড়ে টিলার বাঁ-দিকের ঢাল বেয়ে অনেকটা ঘুরে আবার ওপরে উঠতে শুরু করল। ঘুরপথে যাওয়ার সময়েই সে মাথা তুলে দেখতে পেল একটা ছেলে পাথর বাঁধানো মূল রাস্তাটায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার পুরো শরীরটা দেখতে পেল না গুলাবি, শুধু নীল ট্রাউজারটুকুই চোখে পড়ল।
কেউ নিশ্চয়ই আমারই মতন পুজো দিতে এসেছিল, এখন ফিরে যাচ্ছে। ফিরে যাওয়ারই তো সময় এখন। তার মতন এত দেরি করে এই ঘোর বনে কে আসে? ভাবল গুলাবি।
মাঝখানে ঘন বাঁশবনের আড়াল থাকায় ছেলেটা তাকে দেখতে পায়নি। তা ছাড়া ওরও পুরো মন এই মুহূর্তে নিশ্চয়ই ওই হাতির হুঙ্কারের দিকেই পড়ে রয়েছে।
ঘুরপথে টিলার খোলা জায়গাটায় যতক্ষণে সে উঠে এল ততক্ষণে হেমন্তের বেলা ঢলতে শুরু করে দিয়েছে। নীচে তাকিয়ে সে দেখল শিরোমণির গড়ের জলাশয়টাতে বনচরদের বৈকালি। জলপানের জন্যে যাতায়াত শুরু হয়ে গেছে। ওর চোখের সামনেই জল খাওয়ার জন্যে নেমে এল দশ বারোটা বুনো মহিষ বা গউর। তাদের হাঁটু অবধি সাদা লোমের মোজা। একজোড়া ময়ুর তীক্ষ্ণ চিৎকার করতে করতে আকাশছোঁয়া চিকরাসি গাছের মগডালের দিকে উড়ে গেল; চিতাবাঘ বা বনবেড়ালের মাংশাষী থাবার নাগাল এড়াতে ওখানেই ওরা রাতটা কাটাবে।
পায়ের দিকে তাকিয়ে খুব সাবধানে হাঁটতে হচ্ছিল গুলাবিকে। চতুর্দিকে ছড়িয়ে রয়েছে। ভাঙা পাথরের ইট। কিছু কিছু গাঁথনি এখনও, এই পাঁচশো বছর পরেও, মাটির ওপর খাড়া রয়েছে। রয়েছে আকাশের দিকে অর্ধেকটা উঠে হঠাৎ শেষ হয়ে যাওয়া সিঁড়ি, কুঁয়োর মতন বিরাট পাথরে বাঁধানো গহুর।
এই অনেকখানি অটুট স্থাপত্যের জন্যেই গুলাবির মতন মানুষেরা বিশ্বাস করে, শিরোমণির। গড়ের রাজা আবার ফিরে আসবেন। তিনি আসা মাত্র আলোয় আলোময় হয়ে উঠবে এই গড়। লোকলস্কর, সিপাহি, বরকন্দাজে গমগম করবে এই টিলা। বুনো জন্তুরা পালাবে, বন পরিষ্কার হয়ে যাবে, আর সেই সঙ্গে পিছু হাঁটবে সময়।
