সেইজন্যেই প্রমিত চাইছিল দ্যুতির কাজটা না আটকাক।
ঠিক সেই সময়েই জানলার ঠিক বাইরের মোরাম বিছানো রাস্তায় খড়মড় শব্দ তুলে একটা জলপাই রঙের বোলেরো ভ্যান খুব স্মার্টলি বাঁক নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সেইদিকে তাকিয়ে প্রমিতের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে মনে মনে ভাবল, কি আশ্চর্য! মিস্টার শইকিয়ার কথাটা মাথায় আসেনি কেন?
তারপর দ্যুতির দিকে তাকিয়ে বলল, দ্যুতি শুনুন।
উ! যথারীতি মেয়েটা এইটুকু সময়ের মধ্যেই তার নিজের চিন্তায় তলিয়ে গিয়েছিল। প্রমিতের ডাকে মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে সাড়া দিল।
মনে হয় আপনার জঙ্গলে যাওয়ার…মানে যাওয়ার এবং নিরাপদে ফিরে আসার একটা উপায় করতে পারব।
এইটুকু সময়ের মধ্যে প্রমিতের মতামত বদলে যাওয়ায় দ্যুতি স্বাভাবিকভাবেই একটু অবাক হল। সে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তাকে বলতে না দিয়ে প্রমিত দরজার দিকে নির্দেশ করল।
দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকছিলেন বোলেরোর মালিক হাস্যোজ্জ্বল এক পুরুষ। লম্বা, চওড়া, স্বাস্থ্যবান। চকোলেট রঙের ট্রাউজারের ওপর গোলাপি পিন স্ট্রাইপ ফুল স্লিভ শার্ট। ঘন চুলে সামান্য কিছু রুপোলি আঁচড়। বয়েস পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে হবে। ঢুকতেই তার দিকে প্রমিতের বাড়ানো হাতটা দেখে তিনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। মুখের হাসিটা একইরকম রইল।
তাকে দেখিয়ে প্রমিত দ্যুতিকে বলল, মি ডক্টর রূপেন শইকিয়া, বক্সা টাইগার রিজার্ভের একজন বড় বন্ধু। আপনাকে ওনার সঙ্গেই গেঁথে দেব। উনি সঙ্গে থাকলে ক্ষ্যাপা হাতিও আপনাকে শুড় তুলে সেলাম দিয়ে রাস্তা ছেড়ে দেবে।
কার সামনে আমাকে এইভাবে গ্লোরিফাই করছেন সেটা জানতে পারলে ভালো লাগত। হাতের অ্যাটাচিটা পাশে নামিয়ে রেখে একটা চেয়ারের ওপর ধপ করে বসলেন রূপেন শইকিয়া। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের খাঁটি সেগুনের আলিশান চেয়ার অবধি সেই ওজনে মচমচ করে উঠল। মিস্টার শইকিয়ার চোখের কৌতূহলী দৃষ্টি দ্যুতির দিকে।
মিট মিস দেবদ্যুতি সেনগুপ্ত…দ্যুতি। আমাদের মজুমদার সাহেবের সঙ্গে আপনার আলাপ আছে তো? ডেপুটি চীফ কনজার্ভেটর সমীর মজুদার? ওনার আত্মীয়া। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির পি এইচ ডি অ্যাসপায়ারান্ট। সাবজেক্ট অ্যানথ্রোপলজি, মানে নৃতত্ব। বাংলাটা ঠিক বললাম তো?
দ্যুতি ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানাল।
উনি এখানে এসেছেন ফিল্ড ওয়ার্ক করবেন বলে।
আচ্ছা, আচ্ছা। রূপেন শইকিয়া দু-হাত জোড় করে নমস্কার জানালেন দ্যুতিকে। তারপর যোগ করলেন, আমি কিন্তু আপনি আজ্ঞে চালাতে পারব না। তোমার বয়েসি অনেক ছাত্রী ছিল। আমার।
দ্যুতি কথাটা ভালো বুঝতে পারল না। ইনি কি প্রফেসর?
প্রমিত দ্যুতিকে বলল, দ্যুতি, ডক্টর শইকিয়ার সঙ্গে আমাদের ডিপার্টমেন্টের ব্যবসায়িক সম্পর্ক। আপাতত এইটুকু জেনে রাখুন। ডক্টর শইকিয়া এখানে এলে হরিণডুবি বাংলোতেই ওঠেন। মানে, আগামী কদিন উনি আপনার পাশের ঘরেই থাকবেন। ওনার সম্বন্ধে বাকিটা ওনার কাছ থেকেই ধীরেসুস্থে শুনে নেবেন। ওনার ভাণ্ডারে জঙ্গল নিয়ে অজস্র গল্প আছে। আপনার রিসার্চের কাজেও তার কিছু কিছু লেগে যেতে পারে।
রূপেন শইকিয়া হাত নেড়ে বললেন, আরে ধুর, ওসব কিছু না। তুমি আমার সঙ্গে এসো দ্যুতি। আমি এই টেন্ডার পেপারগুলো অফিসে জমা দিয়েই বেরিয়ে পড়ব। তারপর আমরা একসঙ্গেই হরিণডুবিতে ফিরব। কাল সকালে আমি তোমাকে জঙ্গলে নিয়ে যাব। তার আগে আজ সন্ধেবেলা তুমি আমাকে তোমার ফিল্ড-ওয়ার্কের প্ল্যানটা বুঝিয়ে দেবে, কেমন?
দ্যুতি ইতস্তত করে বলল, জঙ্গলে ঢুকবেন? কিন্তু রেস্ট্রিকশন?
জবাবটা দিল প্রমিত। বলল, ও রেস্ট্রিকশন ডক্টর রূপেন শইকিয়ার জন্যে নয়। এই জঙ্গল আর জঙ্গলের লোকজনকে উনি নিজের ঘরের লোকের থেকেও ভালো করে চেনেন। নিজেকে কেমন করে বাঁচাতে হবে সেটাও। ভালো কথা, মিস্টার শইকিয়া। আপনার সঙ্গে আমার একটু অন্য ব্যাপারে কথা ছিল।
রূপেন শইকিয়া প্রমিতের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, বললেন, বিমল, বাবুয়াদের মার্ডার নিয়ে কি?
ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল প্রমিত। মুখে বলল, ডিটেইলস তো আপনাকে ফোনে বলেছি। আমি কিন্তু এখনও কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনি কি একবার জায়গাটা দেখবেন?
রূপেন শইকিয়া বললেন, হ্যাঁ, সে দেখতে আর অসুবিধে কোথায়? কাল ভোরবেলা তাহলে চলে আসুন না হরিণডুবি। আমি, আপনি আর দ্যুতি একসঙ্গেই জঙ্গলে ঢুকব। যাবার পথে ওই জায়গাটাও একবার ঘুরে যাব। তবে, আপনি যেখানে কিছু বুঝতে পারছেন না, সেখানে আমি আর নতুন করে কী বলব বলুন তো? এই বলে, অ্যাটাচি-কেসটা হাতে নিয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, আচ্ছা, আজ আমি একবার অফিসটা ঘুরে তাহলে বেরিয়ে পড়ছি। চল। দ্যুতি।
এই প্রথম অন্তর্মগ্নতার ডুবজল থেকে মাথা তুলে দ্যুতি একটু বেশিক্ষণ প্রমিতের দিকে তাকিয়ে রইল। তাকে কোনও ধন্যবাদ দিল না। তবে চেয়ার ছেড়ে উঠবার সময় আবার সেই খুশির হাসি হেসে বলল, কাল ভোরে দেখা হচ্ছে তা হলে?
সিওর।
এত নিশ্চিত স্বরে প্রমিত গত কয়েকদিনে কোনও কথা বলেনি।
২. চকচকি গ্রাম
০৬.
চকচকি গ্রামের গুলাবি নার্জিনারির রূপেন শইকিয়ার মতন ব্যবসা নেই। দেবদ্যুতি সেনগুপ্তর মতন গবেষণার কাজও তার কাছে স্বপ্ন। সে এক পঁয়ত্রিশ বছরের আদিবাসী রমণী–গরিব, ক-অক্ষর গোমাংস। তবু দ্যুতি বা রূপেনের মতন গুলাবিরও বড় প্রয়োজন ছিল হরিণডুবির। উত্তরের জঙ্গলে যাওয়ার। কারণ ওই জঙ্গলেই একটা টিলার মাথায় রয়েছে তাদের তীর্থ– শিরোমণির গড়। সেই গড়ে আজও, মৃত্যুর পাঁচশো বছর পরেও, অধিষ্ঠান করেন রাজা শিরোমণি। ওদিকে গুলাবির দেড় বিঘে জমিতে মকাইদানা পেকে টুসটুস করছে। শিরোমণি ছাড়া সেই ফসলকে শেষ অবধি রক্ষা করেন কে?
