পিছু হাঁটতে হাঁটতে সময় পৌঁছে যাবে পাঁচশো বছর আগের বক্সায়, যখন রাজা শিরোমণি ছিলেন আসাম থেকে নেপাল, ভুটান থেকে কোচবিহার অবধি বিস্তৃত এক বিরাট ভূখণ্ডের প্রভূ, আর এইখানে ছিল তার রাজপ্রাসাদ। এখানে তখন জঙ্গল ছিল না মোটেই, ছিল এক ভারী শহর। আর রাজা শিরোমণি তো তাদেরই লোক ছিলেন, ছিলেন তাদেরই মতন মঙ্গোলয়েড আদিবাসী। আদিবাসীরাই ছিল তার খাস প্রজা। তাই গুলাবির মতন মানুষরাও সেদিন আবার। ফিরে পাবে তাদের হারানো জমি জায়গা–যে সব উর্বর একলপ্তের জমি বছরের পর বছর ধরে সমতলের মানুষেরা এসে তাদের কাছ থেকে ছলে বলে কৌশলে কেড়ে নিয়েছে। তখন বনচরের জীবন ছেড়ে, রিক্সাওলার জীবন ছেড়ে, মালির জীবন, বেশ্যার জীবন ছেড়ে আবার তারা কৃষিকাজে ডুবে যাবে। তখন তারা নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াবে শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, কোচবিহারের আলো ঝলমল রাস্তায়। হংকং মার্কেটে বাজার করবে, দামি হোটেলে কবজি ডুবিয়ে মাংসভাত খাবে। শহরের মেয়েদের মতন ব্লাউজের নীচে লালরঙের একটা ছোটজামা পরবে গুলাবি। আর হ্যাঁ, সবার আগে হাতি খেদানোর জন্যে একটা ইলেকট্রিকের বেড়া বানাবে তার জমিটার কিনারা বরাবর।
সুখস্বপ্নে বিভোর গুলাবি সমতল জমিটার ঠিক মাঝখানটায় একটা উঁচু পাথরের চাতালের দিকে এগিয়ে চলেছিল। সে জানে ওই চাতালটাকেই বলা হয় শিরোমণির থান। ওখানেই লোকে বলি চড়ায়, সে নিজেও এর আগে অনেকবার চড়িয়েছে। যেতে যেতে সে দেখছিল কত মূর্তি ছড়িয়ে রয়েছে চতুর্দিকেভাঙা পাথরের মূর্তি সব। কোনোটা সৈন্যের মূর্তি, কোনওটা নর্তকীর। পাথরের সিংহাসন, পাথরের অলঙ্কৃত কড়িবরগা। গুলাবি তার বাপদাদাদের মুখে শুনেছে, যেদিন রাজা শিরোমণি ফিরবেন, সেদিন ওইসব পাথরের মূর্তিতেও প্রাণ ফিরে আসবে। গুলাবি মনে। প্রাণে বিশ্বাস করে সেই কথা। শুধু সেই নয়, তার জাতের সবাই। সেই বিশ্বাসেই তারা আধপেটা খেয়ে বেঁচে থাকে, সেই বিশ্বাসেই তারা বুনো হাতির সামনে দাঁড়িয়ে কোঁচড় থেকে ক্র্যাকার বার করে মাটিতে আছড়ে ফাটায়। সেই বিশ্বাস বুকে নিয়েই গুলাবির জাতের লোকেরা ভয়ংকর জাঙ্গল ম্যালেরিয়ায় পালে পালে মরে। মরতে মরতেও বক্সার জঙ্গলকে আঁকড়ে ধরে থাকে। কোত্থাও যেতে চায়না এই জঙ্গল ছেড়ে। কারণ এই জঙ্গলই ভ্রমরকৌটোর মতন লুকিয়ে রেখেছে। তাদের প্রাণভোমরাকে, তাদের শিরোমণির গড়কে।
মধু বর্মনের মতন দুয়েকজনের বিশ্বাস শুধু অন্যরকম। কিন্তু তারা গ্রামের কারুরই আপনজন নয়। নেহাত দায়ে অদায়ে ঠেকলে ওদের দরজায় গিয়ে দাঁড়াতে হয়। পেটে একটু বিদ্যে আছে কি না তাই।
এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে গুলাবি পৌঁছে গিয়েছিল পাথরে বাঁধানো গোল চাতালটার কাছে। জায়গাটা আসলে চারপাশে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা একটা পাথরের বেদি। একসময়ে এইখানেই না কি রাজা শিরোমণির সিংহাসন পাতা থাকত। তাই এখনও এইখানে এসেই তারা মনস্কামনা জানায়। জায়গাটা একটু ঢালু মতন, একটু এবড়ো-খেবড়ো। সারা রাতের শিশির বোধহয় পাথরের খাঁজে জমে থাকে, তাই শ্যাওলায় ঢেকে আছে পথটা। গুলাবির প্লাস্টিকের চটি একবার স্লিপ কাটল সেই শ্যাওলার ওপর। সে সাবধানে মাথা নীচু করে শেষ পথটুকু পেরোল। তারপর মাথা তুলে তাকাল পাঁচিলটার ওপাশে, আর তাকানো মাত্রই তার বুকের রক্ত জমে বরফ হয়ে গেল।
গুলাবির দিকে পিছন ফিরে তিনটে লোক বসে আছে বেদিটার ওপর। টাকা দেওয়া নেওয়া হচ্ছে। বাণ্ডিল বাণ্ডিল টাকা। দুজনকে সে চেনে–চকচকি গ্রামের নেতা মধু বর্মন আর তার বডিগার্ড ঝুপা।
যে লোকটা অ্যাটাচি থেকে টাকার থাকগুলো ওদের হাতে তুলে দিচ্ছে তাকে চিনতে পারল না গুলাবি। এ দেশের লোক নয়।
যাই হোক, ওদের কারবারে গুলাবির কিছু এসে যায় না। তাকে নিজের মানতের কাজটা সারতে হবে। গুলাবি একটু গলা তুলেই প্রশ্ন করল, কী খবর হে মধুবাবু? বিজনেসে খুব কামাচ্ছ। মনে হচ্ছে যে।
তিনটে লোকই চমকে উঠে মুখ ঘোরাল।
হাসতে হাসতে গুলাবি উঠে পড়ল চাতালে। দাঁড়াল একেবারে ওদের মুখোমুখি।
যে লোকটা টাকা দিচ্ছিল সে দাঁতে দাঁত চিপে কেটে কেটে বলল, শুয়োরের বাচ্চা রাকেশকে যে নীচের রাস্তাটা পাহারা দিতে বললাম, সে গেল কোথায়? কথাগুলো পরিষ্কার কানে এল গুলাবির, আর এই প্রথম সে বুঝতে পারল কোথাও একটা গোলমাল আছে। যে ছেলেটাকে সে পাশ কাটিয়ে এল সে তাহলে পাহারাদার রাকেশ। কিন্তু পাহারা কেন? কেনই বা এই নির্জন জায়গায় ওরা টাকা দেওয়া নেওয়া করছে।
মধু বর্মন ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে, এগিয়ে আসছে তার দিকে। দুজনের মধ্যে দূরত্ব অনেকটাই কমে গেছে। আরও কমছে…আরও। গুলাবি দেখতে পাচ্ছে মধুর মুখে একটা অন্যরকমের হাসি। হাসি নয়, যেন ঘন লালা ঝরে পড়ছে। একদম শেষ মুহূর্তে কে যেন গুলাবির বুকের মধ্যে হেঁকে উঠল গুলাবি তোর বড় বিপদ। পালা গুলাবি, পালা!
কিন্তু ততক্ষণে বড় দেরি হয়ে গেছে। মধু বর্মনের ডান হাতের মুঠি পুরো শক্তি নিয়ে আঘাত করল গুলাবির রগের ঠিক মাঝখানে। জ্ঞান হারিয়ে পাথরের চাতালের ওপর আছড়ে পড়ল গুলাবি।
এইবার বাকি দুজনও এগিয়ে এল। ঝুপা মধুকে জিগ্যেস করল, একে কি খতম করে দেব গুরু?
তা ছাড়া উপায় কী? শালি অনেককিছু দেখে ফেলেছে।
