এই একটা কথাতেই মেয়েটার পরিচয় পরিষ্কার হয়ে গেল প্রমিতের কাছে।
যেদিন বিমল বাবুয়াদের ওই দুর্ঘটনা ঘটল, ঠিক তার দুদিন আগে কলকাতা থেকে তাদের দফতরের এক বড়কর্তার একটা ফ্যাক্স এসে পৌঁছেছিল তার কাছে। তাতে বলা হয়েছিল ওই বড়কর্তার এক ঘনিষ্টা আত্মীয়া কলকাতা থেকে কি যেন রিসার্চের কাজে বক্সার জঙ্গলে ঘুরতে চায়। তাকে যেন প্রমিত সবরকমের সাহায্য করে। কলকাতা থেকে এ ধরনের অনুরোধ, বা বলা ভালো প্রচ্ছন্ন আদেশ, বছরের মধ্যে বেশ কয়েকবারই আসে। প্রতি ক্ষেত্রেই প্রমিত যা করে, এবারেও তাই-ই করেছিল। ফ্যাক্সের কপিটা তার অফিসের বড়বাবু দত্তবাবুর হাতে দিয়ে বলেছিল, টেক প্রপার অ্যাকশন, দত্তবাবু! দেখবেন, আমার চাকরিটা যেন থাকে।
ভাইবেন না সার! আপনের চাকুরি না থাকলে আমারটাও কি রইব? পান-খাওয়া দাঁতে মিচকে হেসে দত্তবাবু কাগজটা নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। ঝানু লোক। অতিথিদের সুখসুবিধের ব্যবস্থা কিভাবে করতে হয় সঅঅব জানেন। প্রমিত নিশ্চিন্ত হয়ে অন্য কাজে মন দিয়েছিল। আর তার পরেই তো প্রমিতের প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজকর্মকে তছনছ করে দিল টেররিস্টদের তিনটে গুলি। মাঝের এই কটা দিনে সে আর সেই রিসার্চ ওয়ার্কারের কোনও খবরই নিতে পারেনি।
বেশ লজ্জিত হয়ে পড়ল প্রমিত। এই মহিলা…না, মেয়েটি এসেছে পাঁচদিন হয়ে গেল। এর মধ্যে একবার অন্তত তার উচিত ছিল, দত্তবাবু একে কোথায় রেখেছেন, ঘোরাঘুরির কী ব্যবস্থা করেছেন সে ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া।
মনে মনে জিভ কেটে প্রমিত বলল, আপনিই কি মজুমদার সাহেবের আত্মীয়া? কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে অ্যানথ্রোপলজি নিয়ে পি এইচ ডি করছেন?
মজুমদার সাহেব? মেয়েটা কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, ও, বুধোজ্যাঠার কথা বলছেন? হ্যাঁ, উনি আমার বাবার পিসতুতো দাদা।
প্রমিত নিজেকে সামলাতে পারল না। তাদের দফতরের দোর্দন্ডপ্রতাপ অফিসার সমীর মজুমদারকে বুধোজ্যাঠায় পর্যবসিত হতে দেখে হেসেই ফেলল।
হাসছেন কেন? মেয়েটা পরম গাম্ভীর্যের সাথে প্রশ্ন করল।
নেভার মাইন্ড। তা, দ্যুতিদেবী…
ইসসস! মেয়েটা নাক কুঁচকোলো। দেবী আবার কী? দ্যুতি, দ্যুতি। শুধু দ্যুতি। সবাই তাই বলে। আমার আড়াইবছরের বোনঝি অবধি আমাকে ডুটটি বলে ডাকে। মেয়েটা সম্ভবত ভাইঝির কথা মনে পড়ে যাওয়াতেই ফিক করে একটু হাসল। প্রমিত দেখল, হাসলে ওর গজদাঁত দেখা যায়। হাসিটা নিঃসন্দেহে সুন্দর, এবং বেশিরভাগ সুন্দর জিনিসের মতনই–দুর্লভ।
প্রমিত ক্ষণেকের দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে বলল, বেশ বেশ। তা দ্যুতি, আপনাকে কি আমাদের লোকেরা জঙ্গলে যেতে দিচ্ছে না?
হ্যাঁ। এদিকে আমার ছুটি ফুরিয়ে আসছে। কী হবে এখন?
কিছু একটা করতে হবে। আপনি বুধোজ্যাঠার ভাইঝি বলে কথা। আচ্ছা, আপনার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে কোথায়?
হরিণডুবি ফরেস্ট বাংলোয়।
আর আপনার কাজটা কী ধরণের? কোথায় যেতে হবে?
দ্যুতি আবার থতমত খেল। বলল, কোথায় যেতে হবে তা তো জানি না। জ্যেঠু বলেছিলেন আপনার কাছেই পরামর্শ নিতে। তবে যে কাজটার কথা ভেবেছি সেটা আপনাকে বলতে পারি।
বলুন।
এখানকার আদিবাসীদের ফোকটেলস্ নিয়ে কাজ করব। ওদের নানারকম রূপকথা, ব্রতকথা, মিথ…
ছেড়ে দিন।
মানে! কথার মধ্যে এইভাবে হঠাৎ বাধা পেয়ে দ্যুতি চোখ বড় করে বোঝবার চেষ্টা করল প্রমিত ইয়ার্কি মারছে কি না।
প্রমিত কিন্তু খুব সিরিয়াস গলাতেই আবার বলল, প্রোজেক্টটা ছেড়ে দিন, প্লিজ! আমি এমনিতেই প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছি। তার চোখে মধু বর্মনের হিংস্র মুখটা ভেসে উঠল।
সে দ্যুতিকে বুঝিয়ে বলল–আসলে ব্যাপারটা কি জানেন তো? এই মুহূর্তে এখানে জঙ্গলের গ্রামগুলোয় যারা থাকে তাদের সঙ্গে আমাদের, মানে ফরেস্টের লোকজনের সম্পর্কটা নানান কারণে বেশ স্ট্রেইনড় হয়ে রয়েছে। ওদের মধ্যে কয়েকটা খারাপ লোক যেন তেন প্রকারেণ ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে একটা গণ্ডগোল বাধানোর চেষ্টা করছে। এই সময়ে ধরুন আপনি কোনও একটা ফরেস্ট ভিলেজে কাজ করতে গেলেন। ওরা জানতে পারল, আপনি আমাদের ডিপার্টমেন্টের কারুর আত্মীয়া, আমাদের অতিথি। জানতেই পারে, অসুবিধে কিছু নেই। আমাদের অফিসে ওদের নিত্য যাতায়াত। তখন ওরা আপনার সামান্য কোনও ত্রুটিকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে চিৎকার করতে শুরু করে দেবে–আমাদের ধর্মে আঘাত করা হয়েছে, আমাদের বিশ্বাসে আঘাত করা হয়েছে…এইসব আর কি।
প্রিয় বান্ধবীর সঙ্গে আড়ি হলে একটা ছোট্ট মেয়ের মুখ যেমন অন্ধকার হয়ে যায়, প্রমিতের এই কথায় তেমনই ম্লান হয়ে গেল দ্যুতির মুখ। প্রমিত সেটা খেয়াল করে দুঃখিত হল। সে বেশ বুঝতে পারছিল, তার কথাগুলো ওই পড়ুয়া মেয়েটার স্বপ্নকে ভেঙে দিয়েছে।
কিন্তু প্রমিতেরই বা উপায় কী? এই মুহূর্তে হরিণডুবির চারিদিকে যে টালমাটাল পরিবেশ তার মধ্যে কি একজন বহিরাগতা মেয়েকে একা ছেড়ে দেওয়া যায়? তবু প্রমিত খুব দ্রুত একটা। রাস্তা বার করার চেষ্টা করছিল যাতে দ্যুতি তার কাজটা করতে পারে। কোনও বড়সাহেবকে খুশি করার জন্যে প্রমিত এটা করছিল না। সে বুঝতে পারছিল, উলটোদিকে বসে থাকা ওই মেয়েটা বড্ড বেচারি, বড্ড কমজোরি। বইয়ের পাতায় যা লেখা আছে তার বাইরে ও দুনিয়াটাকেই খুব বেশি জানে না। কিন্তু একইসঙ্গে মেয়েটা বড্ড ভালো।
