বুঝলাম, সামুদ্রিক হাওয়া বালি সরিয়ে দিয়েছে। এই ঝোঁপের তলায় সূর্যের আলো পৌঁছায় না। কারণ রঙ্গনা ফুলের কুচির মতো জিনিসটা ঝোপটার উত্তরে এবং কাণ্ডের কাছে পড়ে আছে। বালি সরানোর আগেই জিনিসটা চিনতে পারলাম। সরু লাল ফিতের মাথা।
বালি সরানোর পর পাথরের একটা পাতলা চাঙড় (স্ল্যাব) বেরুল। সেটা সরালে একটা ফাইল বেরুল। এ ধরনের রদ্দি হলদেটে ফাইল সব সরকারি অফিসের টেবিলে দেখা যায়। ফাইলটা না দেখেই ঝটপট পিঠের কিটব্যাগ খুলে ভেতরে ঢোকালাম। তারপর কিটব্যাগ পিঠে এঁটে প্রজাপতি ধরা জাল হাতে নিয়ে প্রজাপতির পেছনে ছোটাছুটির ভঙ্গিতে কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক করার পর ধ্বংসাবশেষের চাঙড়ে পা ফেলে নেমে এলাম বিচে।
জগিংরত একজন যুবক এবং এক যুবতী আমাকে দেখে মুহূর্তের জন্যে থেমেছিল। তারপরই তারা এক বুড়ো হাবড়া খেয়ালি লোকের আচরণ নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা না ঘামিয়ে চলে গেল। সেই ভদ্রলোক তখন বিচের মাথায় একটা পাথরে বসে আছেন। আমি সোজা জেলেবসতির দিকে এগিয়ে গেলাম। একখানে কাঁটাতারের বেড়া গলিয়ে টিলায় উঠলাম। টিলার গায়ে কুঁড়েঘরগুলোর বাসিন্দারা আমাকে গ্রাহ্য করল না। কিন্তু একটু পরেই কাচ্চাবাচ্চাদের দঙ্গল প্রথমে তামিল ভাষায়, তারপর ভাঙা ইংরেজিতে পয়সা দাবি করতে থাকল। এই সময় টিলার মাথায় পাথরের তৈরি ছোট্ট এবং পুরনো গির্জাঘর চোখে পড়ল। এই জেলেরা তাহলে খ্রিস্টান। কাচ্চাবাচ্চাদের চেহারায় যেন পোর্তুগিজদের আদল। প্রাচীন ইতিহাস আমাকে টানে। কিন্তু ফাইলটার টান আরও জোরালো। বাচ্চাগুলোকে কয়েক মুঠো চকোলেট (সব সময় পকেটে রাখি) বিলি করে বাইনোকুলারে শান্তনুর বাংলো খুঁজে বের করলাম। টিলার পশ্চিম ঢাল বেয়ে নেমে গেলাম ঢেউখেলানো বালিয়াড়িতে। তারপর থমকে দাঁড়াতে হল। উঁচু এবং ঘন করে দেওয়া তারকাটার বেড়া। মধ্যে-মধ্যে একটা করে লোহার খুঁটি। একখানে সাঁটা একটুকরো ফলক। তাতে কয়েকটা ভাষায় লেখা : ছুঁলেই মৃত্যু। সাবধান। তার মানে, বিদ্যুত্বহী তার আছে। তার তিনসার এবং কাঁটাতারের বাইরে সমান্তরালে টানা আছে। খুঁটির গায়ে সাঁটা অংশটা কালো নন-কন্ডাক্টিভ জিনিসে তৈরি। হঠাৎ করে চোখে পড়ে না।
অতএব খুব হরয়ানি হল। প্রায় এক কিমি.। বালিয়াড়ি এবং পাথুরে অসমতল মাটি পেরিয়ে অবশেষে পিরাস্তা পেলাম। তারপর হাঁটতে হাঁটতে কুম্ভকোণমের প্রবেশপথ। প্রহরীরা পারমিট দেখতে চাইল না, এর নানা কারণ থাকা সম্ভব।
শান্তনুর বাংলোয় পৌঁছুতে আটটা বেজে গেল। মালবী হাসি মুখে বলল, কোনও ক্লু পেলেন?
শুধু বললাম, কফি। আমার গলা শুকিয়ে গিয়েছিল।…
.
শান্তনু অফিস নটায়! দুপুরে খেতে আসে। ফাইলটার কথা বলে ওকে উত্তেজিত বা নার্ভাস করতে চাইনি। তবে গলায় সোনার চেন এবং ফর্সা রঙের ভদ্রলোকের কথা তুললে সে বলল, বিগ গাই। ইন্ডাস্ট্রিয়ালিফট। জগদীশ নায়েক। এক সময় মন্ত্রী ছিলেন। গত ভোটে হেরে যান। এখন আর প্রত্যক্ষ রাজনীতি করেন না শুনেছি। তবে রাজনৈতিক এবং আমলামহলে প্রচণ্ড প্রভাব আছে। থাকারই কথা। কিছু বললেন নাকি আপনাকে?
নাহ্। নিজের পরিচয় দিয়ে পরিচয় চাইলাম। দিলেন না।
শান্তনু আস্তে বলল, ডঃ রেড্ডাি মারা যাওয়ার দুদিন আগে ব্যাটাচ্ছেলে এসেছে। আমাদের হেড ডঃ কেশবন ওর ঘনিষ্ঠ লোক। দেখছি, রোজই। কেশবনকে টেলিফোন করে।
হাসলাম। তোমার আড়িপাতা স্বভাব আছে নাকি?
শান্তনু ব্যস্তভাবে বলল, নাহ্। আসলে ডঃ রেড্ডির ব্যাপারটা নিয়ে—
বুঝেছি। বলে কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে চুরুট ধরালাম। একটু পরে বললাম, ডঃ রেড্ডিকে খুনের কী মোটিভ থাকতে পারে বলে তোমার ধারণা?
শানু বলল, এমন কিছু জানতে পেরেছিলেন, যা খুনীর পক্ষে বিপজ্জনক হত। তাই ওঁকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে চিরকালের মতো। আর নিজের কানেই তো শুনেছি ডঃ পোট্টেকাট ওঁকে কী বলছিলেন।
ডঃ পোট্টেকাটকে তোমার এখানে চায়ের নেমতন্ন করলে কি উনি আসবেন?
আসতে পারেন। ওঁর মেয়ে রঞ্জাবতীর সঙ্গে মালবীর বন্ধুত্ব আছে।
তুমি বরং আমার কথা বলে–অর্থাৎ তোমার গেস্টের প্রসঙ্গ তুলে ওঁকে নেমন্তন্ন কর। আজ সন্ধ্যার দিকে। তবে সাবধান, বেস কিছু বলবে না।
নাহ্। আপনি নিজেও তো প্রকৃতিবিজ্ঞানী।…
শান্তনু অফিস গেল জিপে। ব্রেকফাস্টের পর আমার ঘরের দরজা এঁটে কিটব্যাগ থেকে ফাইলটা বের করলাম। প্রচুর বালি ঝরল। লাল ফিতের গিট পরীক্ষা করে শান্তনুর কথার সত্যতা বোঝা গেল। ডঃ রেড্ডি লেফ্টহ্যাঁন্ডার ছিলেন। বাঁ হাতেই কাজ করতেন। ফাঁইলের ওপর কিছু লেখা আছে তামিল ভাষায়। ফাইল খুলতেই প্রথমে বেরুল একটা নকশা। খুঁটিয়ে দেখার পর বুঝলাম, এটা কুম্ভকোণমেরই ম্যাপ ছাড়া কিছু নয়। অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ লেখা আছে। একটা চৌকো জায়গায় লাল ডটপেনে টিক মারা আছে।
পরের কাগজটাও ম্যাপ। কিন্তু উপকূলবর্তী সমুদ্রের ম্যাপ। একটা বাঁকা তীরচিহ্ন দিয়ে কুম্ভকোণমকে নির্দেশ করা হয়েছে। তারপর চমকে উঠলাম। যেন হাতের কাছেই সাপ। কয়েকটা ইংরেজিতে লেখা চিঠির জেরক্স কপি। তলার সইটা অস্পষ্ট। চিঠিতে এক একটা জাহাজের নাম, তারিখ, কোন্ অবস্থানে কখন পৌঁছুবে এই সব তথ্য।
হুঁ। তাহলে এই ব্যাপার! একটা গুপ্তচক্ৰ কুম্ভকোণমের সমুদ্রবিজ্ঞান দফতরকে কাজে লাগাচ্ছে। কিংবা সঠিকভাবে বলতে গেলে কোন সমুদ্রবিজ্ঞানীকে।
