কিন্তু জাহাজের চালকরা মুখ বুজে থাকে কেন? পয়সা খেয়ে, নাকি অন্য কারণে? কিন্তু এই দফতর তো কেন্দ্রীয় সরকারের এবং জাহাজ নাবিক সবই নৌবাহিনীর তদারকে থাকার কথা। নৌবাহিনীও কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা দফতরের অধীনে। ব্যাপারটা জানা দরকার।
দুপুরে শান্তনু খেতে এসে বলল, ডঃ পোট্টেকাট আসবেন পাঁচটা নাগাদ। রঞ্জাবতীও আসবে। ওর মা আডিয়ারে গেছেন। থিওসফিক্যাল সোসাইটির মেম্বার।
একটু পরে কথায় কথায় বললাম, সমুদ্রবিজ্ঞান দফতরের জাহাজঘাট কোথায়?
শান্তনু তাকাল। তারপর বলল, পাঁচ কি. মি. দক্ষিণে কোড্ডালমে। ওখানে একটা নেভি বেস আছে।
সমুদ্রবিজ্ঞান দফতরের নিজস্ব জাহাজ আছে নিশ্চয়?
আগে ছিল না। নৌবাহিনীর ছোট জাহাজ ভাড়া নিত। এখন একটা ছোট। জাহাজ এবং একটা মোটরমোট কেনা হয়েছে নেদারল্যান্ডস থেকে।
কুম্ভকোণমের সমুদ্রে দেখলাম ডুবো পাথর প্রচুর। সমুদ্রও এখানে বড্ড রাফ।
জেলেবসতির দিকে সমুদ্র মোটামুটি নিরাপদ। ব্রেকার অংশটা পেরিয়ে ওরা যেখানে মাছ ধরতে যায়, সেখানে সমুদ্র শান্ত বলা চলে।
ফাইলটার কথা তখনও চেপে গেলাম। বললাম, ওঁদের দফতরের হেড কে? ডাইরেক্টরের নাম মহাবীর প্রসাদ। নর্থ ইন্ডিয়ান। অ্যাসিস্ট্যান্ট ডাইরেক্টর একজন মিল। ডঃ নাগরাজন। রিসার্চ সেকশনেও তামিল বেশি। ডঃ পোট্টেকাট কেরালার লোক। এই সেকশনের হেড। ডঃ রেড্ডি তামিল ছিলেন। তিনি ছিলেন ডেটা সেকশনের চার্জে। রিসার্চ সেকশন থেকে যে সব তথ্য পাওয়া যায়, ডঃ রেড্ডি তা বিশ্লেষণ করে কম্পিউটারাইজড় কোড তৈরি করতেন।
আর কথা বাড়ালাম না। শান্তনু খেয়ে অফিস চলে গেল। বারান্দায় বসে চুরুট টানছি, মালবী এসে মিটিমিটি হেসে বলল, ফাদার ক্রিসমাসকে আজ ভীষণ গম্ভীর দেখাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে ক্লু পেয়ে গেছে।
হঠাৎ বললাম, একটা টেলিফোন করতে চাই। কিন্তু এখানে কি এস টি ডি। লাইন আছে?
হ্যাঁ, গত মাসে অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ এবং এস টি ডি চালু হয়েছে। শান্তনু তো আপনাকে এস টি ডি করেছিল।
উঠে দাঁড়ালাম। একটা দুর্ভাবনা গেল। আমি ভেবেছিলাম ট্রাঙ্ককল-মানে, যেভাবে ও কথা বলছিল।
মালবী হাসল। কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কী যেন বলল! আপনার আগ্রহ—
আপনার আগ্রহ জাগানোর মতো কিছু জিনিস এখানে আছে।
মালবী আস্তে বলল, আসলে শানুর ভয়ের কারণ আছে। তামিলনাড়ু বড্ড গোলমেলে হয়ে উঠছে ক্রমশ। ও ট্রান্সফার হওয়ার চেষ্টা করছে।
চল। টেলিফোন করব। কিন্তু গোপনে।
করুন না। এক মিনিট! আমি মারিয়াম্মাকে আগে বাইরের কাজে সরিয়ে রাখি। আজকাল যা হচ্ছে, কাকেও বিশ্বাস করা কঠিন।……
.
রঞ্জাবতাঁকে দেখে বাঙালি বলে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। তাছাড়া সে ভাল বাংলা জানে। শান্তিনিকেতনের ছাত্রী। ছুটিতে বাবার কাছে কাটাচ্ছে। ডঃ পোট্টেকাট বাংলা জানেন না। ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, জার্মান ভাল জানেন। সমুদ্রবিজ্ঞানে খেই ধরিয়ে দিলাম। উনি প্রায় আধঘণ্টা বকবক করার পর মুখ খোলার সুযোগ পেলাম। বললাম, আপনাদের একজন বিজ্ঞানী আত্মহত্যা করেছেন শুনলাম।
ডঃ পোট্টেকাট বললেন, দাম্পত্য অশান্তি। রেড্ডির বউ গ্রামের মেয়ে। মানিয়ে চলার সমস্যা ছিল। এদিকে রেড্ডিও ছিল বদরাগী হটকারী স্বভাবের লোক।
সতর্কভাবে বললাম, উনি নিশ্চয় আপনার মতো মিশুকে স্বভাবের মানুষ ছিলেন না?
নাহ্। যেচে কথা না বললে কথাই বলত না।
ওঁর কোন শারীরিক ত্রুটি–মানে অসুখবিসুখ কিংবা–
কিচ্ছু না। রোগা হলেও চমৎকার স্বাস্থ্য ছিল। জগিং করত নিয়মিত। তবে মানসিক গণ্ডগোল ছিলই। শিজোফ্রেনিক টাইপ। ডঃ পোট্টেকাট হাসলেন। একটা ফাঁইলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। তখন অবশ্য খুব, সিগারেট খেত। যদিও বিশেষ করে ওর সেকশনে ধূমপান নিষিদ্ধ। তো দুর্ঘটনাও হতে পারে। একবার কম্পিউটারে ভুল ডেটা ফিড করিয়ে আমাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ রিসার্চ নষ্ট করে ফেলেছিল।
অমনোযোগিতা! এই ম্য করে ডঃ পোট্টেকাটের দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টে তাকালাম।
উনি বললেন, রেড্ডি ছিল একজন অদ্ভুত চরিত্রের লোক। যেমন ধরুন, ওর কাছে একটা রিভলবার। ওটা কেন ও সঙ্গে রাখত? বুঝতে পারি না।
আপনি জানতেন ওঁর রিভলবার আছে?
ডঃ পোট্টেকাট সোজা হয়ে বসলেন। সে একটা সাংঘাতিক দুর্ঘটনা হতে পারত। একদিন বিচে নেমে যাচ্ছে। তখন প্রায় সন্ধ্যা। লক্ষ্য করলে দেখবেন, এখানে সমুদ্র সন্ধ্যার আগে থেকে ভীষণ রাফ হতে শুরু করে। তো হঠাৎ পেছন থেকে ডেকেছি, ভীষণ চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়াল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য ওর হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকে বেরিয়ে আসছিল। আমার চোখের ভুল নয়। রিভলবারের বাঁট!
পরে জিজ্ঞেস করেননি?
করেছিলাম। ডঃ পোট্টেকাট অন্যমনস্কভাবে বললেন, তামিলদের ইদানীংকার হাবভাব আমি বুঝতে পারি না। রেড্ডি বলেছিল, ওর কোন ফায়ারআর্মস নেই। কাজেই আমার নাকি চোখের ভুল।
শান্তনু এই সুযোগটা নিল। ডঃ পোট্টেকাট যদি কিছু না মনে করেন, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
স্বচ্ছন্দে।
এক বিকেলে বিচের মাথায় আপনারা দুজনে কথা বলছিলেন। একটু তফাত থেকে আমার কানে এসেছিল, আপনি ওঁকে কিসে নাক না গলাতে নিষেধ করছিলেন–
ডঃ পোট্টেকাটের চশমা ঝুলে পড়েছিল। চশমার ওপর দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আস্তে বললেন, তুমি যা শুনেছিলে, কাকেও কি বলেছ?
নাহ্।
