শান্তনু বলল, আচ্ছা কর্নেল, এমন কি হতে পারে না, ডঃ রেড্ডি জগিংয়ের সময় ফায়ারআর্ম সঙ্গে রাখতেন না কারণ তখন বিচে আরও অনেকে আসে?
ঠিক বলেছ। সেই সময় খুনী ওঁর বাড়ি থেকে রিভলবার হাতিয়ে–
শান্তনু থেমে গেল। বললাম, হুঁ। একটা পয়েন্ট বটে। তবে ওঁর স্ত্রীর অগোচরে তা সম্ভব ছিল কি না, এটাই প্রশ্ন। ধরা যাক, খুনী জানত কোথায় অস্ত্রটা থাকে। খুনীর ও বাড়িতে গতিবিধি অবাধ হওয়ার কথা। তো ওঁর বাড়িতে নিশ্চয় কাজের লোক ছিল?
স্থানীয় একটি মেয়ে। আধ কিলোমিটার দূরে একটা বস্তি আছে। আমাদের এই কাজের মেয়েটিও সেখান থেকে আসে। এখনই চলে যাবে।
কখন আসে?
প্রায় সাতটা বেজে যায়। মারিয়াম্মাকে পায়ে হেঁটে আসতে হয়। পায়ে হেঁটে ফেরে। কারণ পিচরাস্তা পর্যন্ত কোন সাইকেল-রিকশো যাতায়াত করতে দেওয়া হয় না। বিগ গাইদের ডেরা এই কুম্ভকোণম। দেখে থাকবেন, সাইনবোর্ডে লেখা আছে, নোটিফায়েড এরিয়া। কিন্ত অনুমতিতে আসা যায় না।
শিগগির কফি এসে গেল। লক্ষ্য করলাম, মারিয়াম্মা লন পেরিয়ে চলে গেল। মালবী ভেতর থেকে গেট বন্ধ করে এল। নিচু বাউন্ডারি ওয়ালের মাথায় তারকাটার বেড়া এবং ঘন দেবদারু শ্ৰেণী।…
শান্তনুর সঙ্গে আমার এই দীর্ঘ বাক্যালাপ থেকে শান্তনুর বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হবে। সে সরাসরি কোন ঘটনাতে পৌঁছাতে চায় না। তার সঙ্গে অনর্গল কথা বলতে হয়। কলকাতায় থাকার সময় তার এই বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেছিলাম।
হ্যাঁ, এটা এক ধরনের ব্যক্তিগত অভ্যাস বা চরিত্রগত লক্ষণ বলা চলে। কিন্তু তা কিছুটা অস্বাভাবিক তো বটেই। কুম্ভকোণমে এসে এ নিয়ে চিন্তা-ভবনার পর আমার ধারণা হয়েছিল, প্রচণ্ড আতঙ্ক মনের তলায় চেপে রাখলেও এমনটা হতে পারে। এটা তার স্বভাবভীরুতা। অন্য কেউ হলে প্রথমেই ডঃ রেড্ডির মৃত্যুসংক্রান্ত রহস্যময় ঘটনা আমাকে জানিয়ে দিত। তাছাড়া ঘটনাটা যে আত্মহত্যা নয়, স্রেফ হত্যা, তা জানিয়ে দিতে এত সময় নিত না। এমন কি। শা বিকেলে নিচে নেমে একটা ভিন্ন প্রসঙ্গ তোলার পর প্রথমে শুধু একটি বাক্য দিয়ে ঘটনার সূত্রপাত করেছিল, হঠাৎ উনি মারা গেলেন। ওর এই আতঙ্কটা অস্বাভাবিক। কেন এত ভয় পেয়েছে ও?
পরদিন সাড়ে পাঁচটায় উঠে অভ্যাসমতো প্রাতঃভ্রমণের জন্যে বেরুতে গিয়ে দেখলাম, শান্তনু উঠেছে এবং বাংলোর পেছনের দিকে ঝোপঝাড়ের মধ্যে ঝুঁকে সম্ভবত শিশিরের এফেক্ট পরীক্ষা করছে। সে আমার অভ্যাস জানে। তাই গেটের তালা খুলে রেখেছে। নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলাম।
এখন সমুদ্র কিছুটা শান্ত। যেন ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে আছে। জনহীন বিচের মাথায় ল্যাম্পপোস্টে যে আলোগুলো জ্বলছে, তাদের রঙ ফিকে। সমুদ্র পূর্বে। পূর্বের দিগন্তে গাঢ় মেঘ। টুপি এবং রেনজ্যাকেট থাকায় বৃষ্টি এলেও ভিজব না। পিঠের কিটব্যাগে প্রজাপতি ধরা নেট এবং স্টিক গোঁজা। হঠাৎ মনে হল, বিচে কি প্রজাপতির আশা করছি? অনাবশ্যক বোঝা। বাইনোকুলারে প্রথমে দক্ষিণের জেলেবসতি, তারপর উত্তরের জলে আছড়ে পড়া ধ্বংসস্তূপের দিকটা দেখে নিলাম। জেলেবসতির দিকে ভেলা নৌকো (এই নৌকোর কোন তলা থাকে না) নিয়ে জেলেদের ব্রেকওয়াটারের সঙ্গে মর্মান্তিক লড়াই চোখে পড়ল। চিরকালের বাঁচার লড়াই। উত্তরের ধ্বংসাবশেষের ওপর দিকটায় জঙ্গল গজিয়ে আছে। আবছা একটা নড়াচড়া দেখলাম যেন। বেশ কিছুক্ষণ পরে একটা লোক নেমে এল বিচে। পরনে শর্টস। সে জগিং করতে করতে এদিকে আসছে। বলিষ্ঠ গড়নের মধ্যবয়সী একটা ফর্সা লোক।
বিচের মাঝামাঝি ইচ্ছে করেই তার গতিপথে দাঁড়ালাম এবং কাছাকাছি হওয়ার মুহূর্তে বলে উঠলাম, ধ্বংসস্তূপে কিছু কি খুঁজছিলেন?
থমকে দাঁড়িয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসে প্রায় গর্জন করলেন ভদ্রলোক। কী?
বাইনোকুলারে দেখছিলাম আপনি যেন কিছু—
কে আপনি?
পকেট থেকে নেমকার্ড বের করে দিলাম। একটু হেসে বললাম, ওখানে নাকি সামুদ্রিক অজগরের আস্তানা। তাই আমার কৌতূহল জেগেছে।
কার্ড পড়ে আমাকে ফেরত দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, সামুদ্রিক অজগর সাংঘাতিক। কৌতূহল বিপজ্জনক হতে পারে।
যেমন হয়েছে ডঃ রেড্ডির পক্ষে।
ভদ্রলোক ভুরু কুঁচকে ফোঁস ফোঁস শব্দে বললেন, আপনি যে-ই হোন সাবধান করে দিচ্ছি। কোথায় উঠেছেন আপনি?
তার আগে আপনার পরিচয় জানতে পারি কি?
না। বলে ভদ্রলোক আমার পাশ কাটিয়ে জগিং করতে করতে চলে গেলেন। সেই মুহূর্তে লক্ষ্য করলাম, ওঁর গলায় সোনার চেন আছে।
জনহীন বিচে উত্তরদিকে হাঁটতে থাকলাম। মাঝে মাঝে থেমে বাইনোকুলারে দেখে নিচ্ছিলাম, সেই ভদ্রলোক জেলেবসতির সীমানা অব্দি গিয়ে ঘুরে আসছেন। তারপর বিচের মাথায় উঠে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আমাকে লক্ষ্য করতে থাকলেন।
ধ্বংসস্তূপের মাথায় সহজেই ওঠা যায়। শান্তনুর ধারণা ঠিক। এটা একটা প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারই ছিল। যথেচ্ছ গজিয়ে ওটা জঙ্গলের ফাঁকে একটুকরো পাথরে পদ্ম, তারপর একটা টুকরোয় ধর্মচক্রের ক্ষয়টে চাপ চোখে পড়ল। খুঁটিয়ে চারপাশ বাইনোকুলারে দেখে নিলাম সতর্কতাবশে। তারপর এদিকে ওদিকে বালিতে মাথা উঁচু করে থাকা পাথর, ভাঙা স্কুপের শীর্ষাংশ এবং উঁচু নিচু গাছপালার ভেতরটা খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে হঠাৎ লাল রঙের একটা কুচি (কতকটা ঝরে পড়া রঙ্গনা ফুলের মতো দেখতে) চোখে পড়ল। ওপরে ঝোপে কোন ফুল ফোটেনি এবং ফোটে বলেও মনে হল না। কাছে যাওয়ার আগে বাইনোকুলারে দেখে নিলাম, প্রায় আধ কিলোমিটার দূরে বিচেরা মাথায় সেই ভদ্রলোক তেমনই দাঁড়িয়ে আছেন। তবে এতক্ষণে একজন-দুজন করে জগিংয়ের ভঙ্গিতে নামতে শুরু করেছে বিচে। তাদের মধ্যে যুবতীরাও আছে।
