ততক্ষণে কফি শেষ। আধপোড়া চুরুট জ্বেলে বললাম, বডি ভোরবেলা বিচে পাওয়া যায় বলেছ। কী অবস্থায় ছিল?
উপুড়। মাথার ডানদিকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি করা হয়েছিল। স্পষ্ট ডেড।
কে প্রথম বডি দেখেছিল?
অনেকেই ওই সময় বিচে জগিং করতে যায়। বিশেষ কেউ আগে দেখেছিল বলে শুনিনি। তবে ডঃ রেড্ডি বরাবর সবার আগে যেতেন জানি। কারণ আঞ্জি খুব ভোরে উঠি। বিচে যাওয়ার পথটা এই বারান্দা থেকে দেখা যায়।
তুমি খুব ভোরে ওঠ কেন?
শান্তনু হকচকিয়ে গেল। মালবী অস্থির হেসে বলল, গোয়েন্দাদের রীতি প্রত্যেককে সন্দেহ করা। নাও! এবার এক্সপ্লেন করো!
শান্তনু হাসল না। একই ভঙ্গিতে বলল, কিছু বিশেষ প্রজাতির উদ্ভিদে শিশিরের এফেক্ট নিয়ে আমি একটা এক্সপেরিমেন্ট চালাচ্ছি।
মালবী মন্তব্য করল, বেঁচে গেলে। কর্নেল, এবার আমাকে সন্দেহ করুন।
একটু হেসে টাকে হাত বুলিয়ে বললাম, ডঃ রেড্ডি যদি শান্তনুর মতো তরুণ, স্বাস্থ্যবান এবং রূপবান হন–
মালবী দ্রুত বলল, প্রেমিক হিসেবে একেবারে অযোগ্য। রোগা, বেঁটে, কুচকুচে কালো টিপিক্যাল দ্রাবিড়। বয়স আমার দ্বিগুণ। তার চেয়ে সাংঘাতিক, ভদ্রলোকের স্ত্রী জেলাস টাইপ মহিলা। শান্তনুকে জিজ্ঞেস করুন। ওঁর অফিসেরই কাজে কোনও মহিলাকর্মী গেলে জেরায় জেরবার করে ছাড়তেন। একবার আমি কী বিপদে পড়েছিলাম বলার নয়।
সে হেসে উঠল। শান্তনু বলল, ডঃ রেড্ডি একানড়ে স্বভাবের মানুষ ছিলেন। আমি যতবার দেখেছি, অফিসের বাইরে ওঁকে একা দেখেছি। দৈবাৎ কারও সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে এবং সেই লোকটা কথা বললে কিছুক্ষণ সঙ্গ দিতেন। যেমন দেখেছিলাম ডঃ পোট্রেকাটের সঙ্গে। কিংবা আমার সঙ্গেও কিছুক্ষণ কথা বলতেন।
বললাম, জগিংয়ের সময় কি উনি শর্টস্ পরতেন?
হ্যাঁ। চালচলনে খুব স্মার্ট এবং সায়েবি কেতাদুরস্ত ছিলেন।
ওঁর পকেটে কোনও ফায়ারআর্ম পাওয়া গিয়েছিল?
পয়েন্ট ২২ ক্যালিবারের একটা রিভলবার ডান হাতের কাছে পড়েছিল। সেটা ওঁরই এবং লাইসেন্স করা অস্ত্র। মর্গের রিপোর্টে বলা হয়েছে একই রিভলবারের গুলি মাথার ভেতরকার হাড়ে আটকানো ছিল। বুলেট কেসে ছটা বুলেটের মধ্যে একটা ফায়ার্ড।
তাহলে পুলিশের বক্তব্য, এটা আত্মহত্যা?
শান্তনু শ্বাস ছেড়ে বলল হ্যাঁ!
কিন্তু তুমি বলতে চাইছ এটা আত্মহত্যা নয়, হত্যা?
ডেলিবারেট মার্ডার।
তোমার এই ধারণার কারণ কি একটু আগে যে ঘটনা তিনটি বললেন, তা-ই?
শান্তনু একটু চুপ করে থাকার পর বলল, কোনও সুইসাইডাল নোট পাওয়া যায়নি। কিন্তু পুলিশ বলেছে, খটরাগী স্বভাবের লোকেদের পক্ষে এভাবে আত্মহত্যা স্বাভাবিক। ওঁর কলিগ বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলে পুলিসের ধারণা হয়েছে, উনি শিজোফ্রেনিক টাইপ ছিলেন। অনেক সময় জানতেন না কী করছেন। একবার নাকি একটা গুরুত্বপূর্ণ ফাঁইলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন।
তোমাদের দফতরের সঙ্গে ডঃ রেড্ডির দফতরের সহযোগিতার সম্পর্ক থাকা উচিত।
আছে। আমরা পরস্পর ডেটা বিনিময় করি।
মালবী উঠে গেল পরিচারিকার ডাকে। এতক্ষণে আলো জ্বলল। বললাম, আত্মহত্যার চিঠি না পাওয়া গেলেও তোমার বর্ণনা অনুযায়ী ঘটনাটা আত্মহত্যাই দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু তুমি জোর দিয়ে বলছ হত্যা।
শান্তনুকে ঈষৎ উত্তেজিত মনে হল। কর্নেল! ডঃ রেডিন্ড লেফট্হ্যাঁন্ডার ছিলেন। তার পক্ষে নিজের মাথার ডানদিকে কানের ওপর রিভলবারের নল ঠেকিয়ে গুলি চালানো সম্ভব নয়।
তুমি নিশ্চিত?
অবশ্যই। কিন্তু আশ্চর্য, পুলিশ এবং অন্য কারও মাথায় এল না প্রশ্নটা!
তুমি প্রশ্নটা কেন—
আমার কথার ওপর শান্তনু বলল, সাহস পাইনি। এখানে যত হোমরাচোমরা লোকের বসবাস। কার কোথায় কী ইন্টারেস্ট আছে, জানি না। মালবীর সঙ্গে আলোচনার পর আপনাকে আসতে বলেছি।
মিসেস রেড্ডি কি আছেন, না চলে গেছেন?
কাল বিকেলে চলে গেছেন। মাদ্রাজের ওদিকে কোন্ গ্রামে ডঃ রেড্ডির পৈতৃক বাড়ি। সেখানে ওঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হবে। একটু চুপ করে থাকার পর শান্তনু ফের বলল, এমন হতে পারে, পুলিশের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মিসেস রেড্ডি অর্ধশিক্ষিত মহিলা। তাছাড়া সেকেলে এবং গ্রাম্য স্বভাবেরও বটে।
চুরুট অ্যাশট্রেতে ঘষটে নিভিয়ে বললাম, তাহলে হত্যার সময় ধস্তাধস্তি অনিবার্য ছিল। নিজের রিভলবার খুনীকে পকেট থেকে বের করে দেবেনই বা কেন ডঃ রেড্ডি? কিংবা ধর, খুনীকে শাসাতে বা খুনীর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্রটা বের করেছিলেন। খুনী তা কেড়ে নিয়ে গুলি করে। এনি ওয়ে! ধস্তাধস্তি অনিবার্য ছিল। বিচের নরম বালিতে ছাপ থাকা উচিত ছিল।
ডেডবডির তলা দিয়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের স্তর বয়ে এসেছিল। আমি লক্ষ্য করেছি।
হুঁ। তাহলে তেমন কোন চিহ্ন মুছে যাওয়াই স্বাভাবিক। দাড়ি থেকে অভ্যাস মতো চুরুটের ছাই ঝেড়ে ফেলে বললাম, ডঃ রেড্ডির সঙ্গে এখানে কার ঘনিষ্ঠতা ছিল–মানে বন্ধুত্ব।
শান্তনু মাথা নাড়ল। কারও সঙ্গে না। ওঁর রগচটা স্বভাবের জন্য কেউ ওকে পছন্দ করত না। আমিও না।
মালবী দরজার পর্দার ফাঁকে দাঁড়িয়ে বলল, সেকেন্ড রাউন্ড কফি?
বললাম, জিজ্ঞেস করছ ডার্লিং? ওঃ! তুমি যে ফাদার ক্রিসমাসকে শীতের কলকাতায় দেখেছিলে, সে এই শরতে একটুও বদলায়নি।
মালবী একমুখ হাসি নিয়ে অদৃশ্য হল। ওর মুখে এখনও বালিকার আদল।
