একটু হেসে বললাম, তোমার ট্রাঙ্ককলে একটু খটকা লেগেছিল।
শান্তনু হাসল না। বিষণ্ণ মুখে বলল, আগেই আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা ভেবেছিলাম। পরে পতেছি। কর্নেল নীলাদ্রি সরকার ছাড়া এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর মানুষ তো আজকাল দেখি না। পুলিশকে আগ বাড়িয়ে কিছু বলা মানেই হইচই এবং হয়রানি। তাছাড়া ইদানীং এ রাজ্যে শ্রীলঙ্কার জঙ্গি তামিলদের আনাগোনা বেড়েছে। কার কোথায় ঘা লাগবে।
সামুদ্রিক হাওয়া বড্ড বেশি জোরালো হচ্ছিল এবং অস্বস্তিকরও। আমার দাড়ি যেন উপড়ে নেবে সমুদ্র। টুপিটাও সামলানো যাচ্ছে না। বললাম, চলো। ফেরা যাক।
ছোট-বড় নানা গড়নের পাথর বিচের ওপরে ওঠার জন্য প্রায়-নৈসর্গিক একটা সোপান। ওপরে উঠে একজন প্রৌঢ় শক্ত সমর্থ গড়নের ভদ্রলোককে দেখলাম। তাঁর এক হাতে ছড়ি, অন্য হাতে চেনে বাঁধা প্রকাণ্ড অ্যালসেশিয়ান। বললেন, হাই মহাপাত্র!
শাক্তনু পাল্টা মার্কিন রীতিতে বলল, হাই ডঃ কেশবন
কদিন থেকে দেখছি সন্ধ্যার দিকে সমুদ্র যেন খেপে যাচ্ছে! ব্যাপার কী?
ইংরেজিতে কথা হচ্ছিল। শান্তনু আলাপ করিয়ে দিল। ডঃ আর কেশবন। আমার দফতরের প্রধান। ডঃ কেশবন, ইনি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার, উঃ কেশবন আমাকে তীক্ষ্ণদৃষ্টে দেখে নিয়ে সহাস্যে বললেন, আপনা) ভারতীয় ভাবিনি। আপনাকে দেখে আমার ধারণা, আপনি একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল!
বললাম, অবশ্যই। আমার বয়স প্রায় সত্তর হয়ে এল।
আপনার চেহারা ফাদার ক্রিসমাসের মতো! কিছু মনে করবেন না কর্নেল সরকার! এ যাবৎ যত সামরিক মানুষজন দেখেছি, সবার চেহারায় কাঠখোট্টা ছাপ থাকে। আপনার চেহারায় কোমলতা আছে।
ডঃ কেশবন প্রায় অট্টহাসি হাসলেন। শান্তনু কেটে পড়ার ভঙ্গিতে হাঁটতে থাকল। একটু তফাতে গিয়ে বলল, লোকটা বেজায় দাম্ভিক। মেজাজ থাকলে বড় বাজে রসিকতা করে। সব চেয়ে অসহ্য ব্যাপার, সব সময় সঙ্গে ওই কুকুর। অফিসেও কুকুর নিয়ে যায়।
ওর বাংলো ধাঁচের কোয়ার্টারের বারান্দায় বসলাম। এখান থেকে বিচ দেখা যায় না। সমুদ্র বিশাল হয়ে চোখে আটকে যায়। শান্তনু ভুবনেশ্বরের ছেলে। ওর স্ত্রী মালবী কলকাতার মেয়ে এবং বাঙালি। নিজেই ট্রে সাজিয়ে কফি এবং স্ন্যাক্স আনল। মিষ্টি চেহারার মেয়ে। কফি তৈরি করে দিয়ে বলল, ফাদার ক্রিসমাসের চোখে কোনও রহস্য ধরা পড়ল কি?
শান্তনু বিব্রতভাবে বলল, আহ্! বড় বাজে রসিকতা এটা। একটু আগে ডঃ কেশবনও—
ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, আমি এই কথাটা উপভোগ করি। মালবী, তুমি রহস্যের কথা বলছিলে। হুঁ, কুম্ভকোণমের বিচ সত্যিই রহস্যময়।
মালবী অন্যমনস্কভাবে বলল, বিচটা ওপর থেকে দেখতে ভাল লাগে। কিন্তু নামলে কেমন অস্বস্তি হয়। যেন এক্ষুণি সমুদ্র এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
বসো মালবী! বলল, তোমার রিসার্চ কতদূর এগোল?
মালবী বেতের চেয়ার টেনে কাছাকাছি বসে বলল, এগোচ্ছে না। সোর্স মেটিরিয়্যালসের জন্য বারবার কলকাতা ছোটাছুটি। হঠাৎ ওকে এখানে ট্রান্সফার করে দেবে জানলে–
বিয়েই করতে না! শান্তনু বলল। কিন্তু দেখুন কর্নেল, আমি মোটেও ওকে জোর করে এখানে টেনে আনিনি।
বললাম, ডার্লিং! এটা তোমাদের ক্ষেত্রে চমৎকার হনিমুন ধরে নাও।
মালবী বলল, ওসব কথা থাক। কাল বিকেলে অফিস থেকে ফিরে শান্তনু যখনই বলল, আপনি আসছেন, আমি অমনিই ব্যাপারটা হয়ে গেলাম। আচ্ছা কর্নেল, একটা প্রশ্ন। গোয়েন্দা উপন্যাসে দেখা যায় গোয় কোনও হত্যাকাণ্ডের পর তবেই হত্যাকারীকে চিনিয়ে দিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে গোয়েন্দা টের পাচ্ছেন কাউকে হত্যার চক্রান্ত হচ্ছে। অথচ গোয়েন্দা যেন চরম মূহুর্তের অপেক্ষায় আছেন। কেন? আগেভাগে তাকে ধরিয়ে দিলেই তো বেচারা বেঁচে যায়।
বললাম, উপন্যাসে হোক বা বাস্তবে হোক, যতক্ষণ না সত্যিই কোনও হত্যাকাণ্ড ঘটছে, ততক্ষণ হত্যাকারী নিছক বিমূর্ত সত্তা। চরম মুহূর্তের পর সে মূর্ত রক্ত-মাংসের মানুষে পরিণত হয়। আর তুমি হত্যাকারীর চক্রান্ত টের পেয়ে তাকে ধরিয়ে দেওয়ার কথা বলছ। ব্যক্তিগত এবং ডেলিবারেট খুনখারাপির চক্রান্তের কেসে চক্রান্তকারীকে আগে ধরাতে গেলে আইনের ধোপে টেকে না। তাকে জানিয়ে দিলে কিংবা শাসিয়ে দিলে সে প্ল্যান বদলাবে। ভিকটিমের ক্ষেত্রেও তাই। এসব কারণেই যিনি গোয়েন্দাগিরি করেন, তাঁর প্রকৃত ভূমিকা শুরু হয় হত্যাকাণ্ডের পর থেকে।
শানু বলল, কোনও মার্ডারই আটকানো যায় না, যদি তা ব্যক্তিগত পর্যায়ের ডেলিবারেট মার্ডার হয়।
মালবী আস্তে বলল, তুমি যা-ই বল, ডঃ রেড্ডিকে সতর্ক করে দেওয়া উচিত ছিল।
দিলেও কোনও লাভ হত না। মার্ডারার অন্য কোথাও অন্য কোনও ভাবে তাঁকে মারত। শান্তনু চেয়ারে হেলান দিয়ে ফের বলল, কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা, উনি খুন হয়ে যাওয়ার পর আমার মনে হয়েছে, ঘটনাগুলোর যেন গুরুত্ব ছিল। আগে তো আমার কাছে সেগুলো যত অদ্ভুত হোক, অর্থহীন ঘটনা।
বললাম, যেমন?
শানু খুব আস্তে বলল, ডঃ রেড্ডি এবং ওঁর দফতরের ডঃ পোট্টেকাট একদিন বিকেলে বিচের মাথায় দাঁড়িয়েছিলেন। একটু তফাত থেকে শুনতে পেলাম ডঃ পোট্টেকাট ওঁকে বলছেন, তুমি ওসবে নাক গলাতে যেও না। মারা পড়বে। ডঃ রেড্ডি খটরাগী মানুষ ছিলেন। চটে উঠে বললেন, আমার হাতে প্রমাণ আছে। আর একদিন ডঃ রেড্ডিকে সন্ধ্যাবেলায় ওঁর কোয়ার্টারের গেটে দেখে যেই পেছন থেকে ডেকেছি, অমনিই ভীষণ চমকে ঘুরে দাঁড়ালেন। কিন্তু সেটা অদ্ভুত লাগেনি। অদ্ভুত লাগল ওঁকে প্যান্টের পকেট থেকে দ্রুত ফায়ারআর্মস বের করতে দেখে। তারপর অবশ্য সেটা লুকিয়ে ফেলে নার্ভাস হেসে আমাকে বললেন, ও! তুমি? আমি ভাবলামকাকে ভেবেছিলেন বললেন না। আমারও জিজ্ঞেস করা ঠিক হত না। সবচেয়ে অদ্ভুত লেগেছিল, বিচের উত্তর প্রান্তে যে ধ্বংসস্থূপ দেখলেন, সেখান থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে ছুটে পালিয়ে আসা। কাছাকাছি পৌঁছুলে জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে? উনি বললেন, ওখানে সামুদ্রিক অজগর আছে। ভুলেও ওদিকে পা বাড়িয়ো না।
