দীপঙ্করের বাংলোয় গিয়ে দেখি গেটে তালা। তখন বিচের দিকে এগিয়ে গেলুম। হ্যাঁ–যা আশা করেছিলুম, ঠিক তাই।
তখনও নুলিয়া ছেলেমেয়ে বুড়োবুড়ির একটা দল আর দুজন কনস্টেবল সুভদ্রার মৃতদেহ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। এস আই ভদ্রলোক নিশ্চয় অ্যামবুলেন্সে খবর দিতে গেছেন।
দীপঙ্কর একটু দূরে একটা পাথরে বসে আছে। একটুকরো প্রাচীন ভাস্কর্য যেন। সমুদ্রের জল এসে আছড়ে পড়ছে পাথরটার ওপর। ভিজিয়ে দিচ্ছে। তাকে। কাছে গিয়ে ডাকলাম, দীপ! ডার্লিং!
দীপঙ্কর তাকাল না।
দীপ, সুভদ্রার খুনী ধরা পড়েছে।
দীপঙ্কর নড়ে উঠল। তারপর একলাফে পাথর থেকে নেমে দৌড়ে এসে মুখোমুখি দাঁড়াল। আঁটো চোয়াল। লাল চোখ। উস্কোখুস্কো চুল মুখের ওপরটা বারবার ঢাকা পড়ছে। হিসহিস করে বলল, কে? সে কে?
আস্তে বললুম, আচ্ছা দীপ, গউর নামে পাণিগ্রাহীর বাংলোর কেয়ারটেকারকে তো তুমি চেনো?
দীপঙ্কর সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠল। বলল, নাও আই আন্ডারস্ট্যান্ড।
কী দীপ?
গউর আমাদের ফলো করে বেড়াত।
সে তোমার বাংলোয় গেছে কখনও?
হ্যাঁ। দীপঙ্কর ভাঙা গলায় বলল। কাজকর্ম করে দিত একটু-আধটু। গতকালও সকালে সে জানতে গিয়েছিল কিছু দরকার আছে নাকি। কিন্তু–
তাকে থামিয়ে দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে চললুম তার বাংলোয়। সেখানে পৌঁছেই ফোন করলুম থানায়। পটনায়ক সাড়া দিয়ে খ্যা খ্যা করে হেসে বললেন, এক গুঁতোতেই কবুল করেছে কর্নেল! শয়তানটা বলছে, সে চুপিচুপি সুভদ্রাকে বলেছিল, মহাপাত্ৰমশাই সুভদ্রার সঙ্গে গোপনে দেখা করতে এসেছেন। ছেলের বিরুদ্ধে তাঁর কিছু বলার আছে, সেটা সুভদ্রাকে গোপনে জানতে চান। তাই শুনেই সুভদ্রা ওর কথামতো ওই ছোট্ট কুঠুরিতে গিয়ে মহাপাত্রমশাইকে খোঁজে এবং–
দীপঙ্করের গলায় বলে উঠলুম, ওক্কে! আই আন্ডারস্ট্যান্ড! বাট–অফ কোর্স ইটস নট দা ট্রাডিশনাল অ্যাফেয়ার অফ দা লাভার্স বিচ। এ একটা নতুন ঘটনা–তাই না মিঃ পটনায়ক?
পটনায়কের খ্যাখ্যা হাসি ভেসে এল দূর থেকে। হ্যাঁ কর্নেল, ট্রাডিশান ভেঙে দিয়েছে হারামজাদা গউড়—অ।…
লাল ফিতের আড়ালে
পূর্ব উপকূলে কুম্ভকোণম নামে ছোট্ট সুন্দর একটি বেলাভূমির কথা জানতাম না যদি না আমার স্নেহভাজন তরুণ পরিবেশ বিজ্ঞানী ডঃ শান্তনু দাস মহাপাত্র সেই খবর দিত।
একটু খটকা অবশ্য লেগেছিল। কারণ শান্তনু খবরটা ট্রাঙ্ককলে দিয়েছিল এবং আমাকে আমার শরৎকালীন ভ্রমণ-সূচী বদলে শিগগির সেখানে যেতে বলেছিল। তার শেষ বাক্যটি ছিল, আপনার আগ্রহ জাগানোর মতো কিছু জিনিস এখানে আছে।
তো গিয়ে দেখলাম, চন্দ্রকলার মতো একটুকরো বিচের মাথায় বিত্তবানদের ডজনখানেক নতুন বাংলো, একপ্রান্তে ছোট্ট জেলেবসতি, সরকারি ট্যুরিস্ট লজ এবং পাশাপাশি দুটি অফিস–একটি সমুদ্রবিজ্ঞান, অপরটি পরিবেশবিজ্ঞান সংক্রান্ত। কিন্তু প্রথমেই চোখে পড়ার মতো বিষয় নির্জনতা। বাইনোকুলারে অবশ্য জেলেবসতির দিকে কিছু মানুষজন চোখে পড়ল। তারা ভেলা নৌকো, জাল, অন্যান্য গেরস্থালি নিয়ে ব্যস্ত। একদঙ্গল কাচ্চাবাচ্চা সমুদ্রের সঙ্গে অকুতোভয়ে খেলছে। ওখানে বিচটা মারাত্মকভাবে ঢালু। মাথার ওপর একটা কাছিমের গড়ন টিলা। তারই গায়ে এলোমেলো সাজানো কুঁড়েঘর।
ওদের কি এই বিচে আসতে দেওয়া হয় না?
আমার এই প্রশ্ন শুনে শান্তনু বলল, কাটাতারের বেড়া দেখতে পাচ্ছেন না? পুরোটা নেটিফায়েড এরিয়া।
এতক্ষণে বেড়াটা বাইনোকুলারে ধরা পড়ল। তবে ওটা না থাকারই শামিল। বালিতে ডুবে গেছে কোথাও এবং কোথাও বা গলিয়ে আসার মতো যথেষ্ট ফাঁক।
শান্তুনু একটু হাসল। কৈফিয়ত একটা আছে। ওরা বিচ নোংরা করে। কিন্তু কোটিপতিদের অনেক সময় প্রকৃতিকে এবং নির্জনতার দরকার হয়। সরকারি ট্যুরিস্ট লজটাও মধ্যবিত্তদের নাগালের বাইরে। সেখানে অবশ্য সরকারি আমলারা কিংবা কোম্পানি-একজিকিউটিভরা ওঠেন। এক্সপেন্স অ্যাকাউন্টে। আর মাঝে মাঝে সেমিনার।
বিচের উল্টো প্রান্তে বাইনোকুলারে সমুদ্রে আছড়ে পড়া একটা ধ্বংসস্তূপ দেখে বললাম, প্রাচীন স্থাপত্য মনে হচ্ছে?
হ্যাঁ। আমার ধারণা, কোনও বৌদ্ধস্তূপ ছিল। এলাকার লোকেরা বলে, ওটাই নাকি সমুদ্রমন্থনে পাওয়া অমৃতকুম্ভের একটা টুকরো। তাই কুম্ভকোণম নাম।
বাইনোকুলার নামিয়ে প্রচণ্ড সামুদ্রিক হাওয়া আড়াল করে চুরুট ধরালাম। তারপর বিচে নেমে গিয়ে বললাম, তবে এই বিচটা চন্দ্রকলার চেয়ে কুম্ভ বা কলসির অর্ধেক ভাঙা কানার মতো। তা থেকেও কুম্ভকোণম নাম হতে পারে। স্থান নামের ব্যাপারে আমার তত্ত্ব হল, সচরাচর সাধারণ লোকেরা খুব চেনাজানা জিনিস দিয়ে কোনও স্থানকে চিহ্নিত করতে চায়। পরে শিক্ষিতেরা মাতব্বরি করে নামটা ভদ্রস্থ করে ফেলেন।
শানু পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বলল, সমুদ্রবিজ্ঞানী রেড্ডি সায়েবের মতে এটা আসলে একটা খাড়ি ছিল। কারণ এমন অদ্ভুত গড়নের বিচ কোথাও দেখা যায় না। তো উনি তা প্রমাণের জন্য নিজেই খোঁড়াখুঁড়ির প্ল্যান করেছিলেন। হঠাৎ মারা গেলেন।
ঘুরে শান্তনুর দিকে তাকালাম। বিকেল পাঁচটাতেই বিচে ছায়া নেমেছে। ওর চোখে কী একটা ছিল। বললাম, কত দিন আগে?
আপনাকে ট্রাঙ্ককল করার আগের দিন। ভোরে এই বিচে জগিং করার অভ্যাস ছিল। এখানেই ওঁর বডি পাওয়া যায়।
