এক মিনিট পরে পটনায়কের সাড়া পেলুম। …হ্যালো ওল্ড ম্যান। ইউ আর হেয়ার অ্যাট লাস্ট! ও মাই গড! শুনেছি, প্রবাদ আছে : কর্নেল যেখানে, ডেডবডি সেখানে। উঃ! আপনাকে নিয়ে পারা যায় না মশাই! কবে এসেছেন? একবার রিং করবেন তো! সেই কবে ভুবনেশ্বরে ডঃ সীতাকান্তের বাড়িতে দেখা–এক বছর আগে! তো–
দ্রুত বললুম, শিগগির দলবল নিয়ে সি-বিচে চলে যান। আমি সেখানেই ওয়েট করব।
ফোন রেখে উঠে দাঁড়ালুম। এবার একটা কাজ বাকি। জরুরি কাজ। গউর ফেরার আগেই সেটা সেরে ফেলতে হবে। জানি না সফল হব, না ব্যর্থ। কিন্তু এই কাজটাই এখন আসল কাজ।…
.
কে যেন বলেছিলেন, সমুদ্র অন্যের কিছু নেয় না নিলে তা ফিরিয়ে দেয়। ফিরিয়ে দিয়েছে সুভদ্রাকে।
একদল নুলিয়া ভিড় করে দাঁড়িয়েছিল বিচের একখানে-কাল বিকেলে বিচের যে পাথরটায় বসেছিলুম, সেখানে। আমিও পৌঁছেছি বালিয়াড়ির মাথায়, পটনায়কের জিপও এসে পড়েছে একই সময়ে। সঙ্গে দুজন কনস্টেবল আর একজন এস আই। পটনায়ক জিপ থেকে নেমেই সহাস্যে বললেন, হোয়্যার ইজ ইওর ডেডবডি, কর্নেল?
আঙুল দিয়ে নিচের বিচের নুলিয়াদের ভিড়টা দেখিয়ে দিলুম। পুলিশবাহিনী বালিয়াড়ি ভেঙে ধস ছাড়ার মতো নেমে গেল। আমি গেলুম–অন্তত এক মিনিট পরে।
গলায় শাড়ির ফঁস শক্ত করে আটকানো ধূসর এক মৃতদেহ প্রায় উলঙ্গ যুবতীর নিস্পন্দ শরীর। নোনাজলে সাদাটে দেখাচ্ছে। জিভ দাঁতের ফাঁকে। ব্লাউস ফর্দাফাই–একাংশ টিকে আছে। ব্রা নেই।
পটনায়ক ঠোঁট কামড়ে ধরে দেখছিলেন। এসে আমার একটা হাত নিয়ে একটু তফাতে গিয়ে চাপা স্বরে বললেন, বলুন কর্নেল!
সংক্ষেপে দ্রুত সব বললুম। শোনার পরই পটনায়ক চাপা গর্জন করলেন, দা ব্লাডি বাস্টার্ড! তারপর আমার দিকে ঘুরে একটু হাসবার চেষ্টা করে বললেন, লাভার্স বিচের ট্রাডিশন, কর্নেল! এই বিচে কী আছে জানি না, এই এক বছর ধরে দেখছি–এ নিয়ে তিনটে মেয়ের ডেডবডি পাওয়া গেল। আগের দুটোকেও মারতে নিয়ে এসেছিল তাদের প্রেমিক। আগের বহু কেস-হিসট্রিতেও একই ব্যাপার দেখেছি। এবার আমার আমলে দিস ইজ দা থার্ড কেস। আই ড্যাম কেয়ার অফ দা ওয়েলদি বিজনেসম্যান মহাপাত্র! শুনেছি, তার পলিটিক্যাল গার্জেন ইজ দা মোস্ট পাওয়ারফুল ম্যান ইন ওড়িশা! সো হোয়াট? আইন তার নিজের পথে চলবে।
মিঃ পটনায়ক! ডাকলুম ব্যস্তভাবে।
পটনায়ক ঘুরে বললেন, বলুন কর্নেল!
দীপঙ্কর তার ফিয়াসেকে খুন করেনি।
হোয়াট? পটনায়ক উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। ফের বললেন, হোয়াই নট? পয়েন্টটা কি আপনার?
শান্তভাবে বললুম, সুভদ্রাকে একটা লোক মিথ্যা কথা বলে ডেকে এনে ওই কুঠুরির ভেতর রেপ করেছিল কাল বেলা আড়াইটের মধ্যে। হ্যাঁ-ওটাই সম্ভাব্য সময়। শি ওয়াজ বুটালি রেল্ড অ্যান্ড কিল্ড বাই হিম। কারণ রেপ করার পর এ ছাড়া তার বাঁচার উপায় ছিল না।
পটনায়ক আস্তে বললেন, কে সে?
পকেট থেকে দলা-পাকানো একটুকরো ভাঁজ করা কাগজ–যা আমি ভজ করেছি, ওঁর হাতে গুঁজে দিলুম। বললুম, সুভদ্রা–যা বুঝতে পেরেছি, খুব সরল আর বোকা মেয়ে ছিল। তাকে বহুবার–গত দু-দিন ধরে বাইনোকুলারে ওয়াচ করেছি। হ্যাঁ–সে হাসিখুশি সরল মেয়েই ছিল। পাছে ওভাবে গতকাল বেলা দুটোর পর দীপঙ্কর তাকে একা বেরুতে দেখলে কী ভাববে, তাই সরল মনেই এই চিঠিটা লিখে রেখে এসেছিল। দীপঙ্কর ঘুমুলে তার একা আসা হতো না। আর একটা কথা, লোকটা জানলার ফাঁক দিয়ে অথবা কোনোভাবে সুভদ্রাকে চিঠিটা লিখতে দেখেছিল বলেই আমার ধারণা। তাই সে গতরাতে সাতটা নাগাদ এক সুযোগে ওটা চুরি করে নিয়ে আসে। দীপঙ্কর তখন বাথরুমে ছিল। দরজা ও গেট ছিল খোলা। ওর মাথার ঠিক ছিল না তখন।
পটনায়ক বললেন, কিন্তু-কিন্তু চিঠিটা দীপঙ্কর কোথায় রেখেছে সে জানল কীভাবে?
বললুম, খুব সহজে। দীপঙ্কর চিঠিটা পেয়েই বিচে খুঁজতে আসে সুভদ্রাকে। আততায়ী তার দিকে লক্ষ্য রেখেছিল। চিঠিটা স্বাভাবিকভাবেই দীপঙ্করের হাতে এই বিচে দাঁড়িয়ে আবার তাকে পড়তে দেখেছিল আততায়ী। তার ভয়ও ছিল, দীপঙ্কর ডেডবডিটা খুঁজে পায় যদি! অবশ্য তখন ডেডবডিটা ওই কুঠুরির ভেতর বালিতে পোঁতা ছিল। কাল রাতে একই কারণে সে ঢিল ছুঁড়ে আমাকে ওদিকে পা বাড়াতে দেয়নি।
পটনায়ক শ্বাস ছেড়ে বললেন, ওকে! কিন্তু আপনি এটা পেলেন কোথায়?
পাণিগ্রাহীর উদয়াচল বাংলোর কিচেনের পেছনে ছাইগাদায়।
হোয়াট? পটনায়ক আবার প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন। হোয়াট ডু য়ু মিন বাই দ্যাট কর্নেল? হু ইজ দা ব্লাডি কিলার? কে সে?
আমার সঙ্গে চলুন। আপনি একাই যথেষ্ট। ওঁদের বলে আসুন, বডি মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে।
এই কথা বলে ধীরে সুস্থে আমি বালিয়াড়ির দিকে পা বাড়ালুম।…
.
গউর আমার ব্রেকফাস্ট রেডি করছিল। একবার তাকিয়েই কিচেনে গিয়ে ঢুকল। পটনায়ক এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। সোজা কিচেনে ঢুকেই তার জামার কলার আঁকড়ে ধরলেন।
অমনি চমকে উঠে কয়েক সেকেন্ডের জন্য গোবেচারা ধরনের ওই মধ্যবয়সী লোকটির মধ্যে হিংস্র চিতাবাঘের রূপ দেখলুম। তারপর আবার তার রূপা ঘটল। আগের মতো গোবেচারা সরল মুখ। পটনায়ক তাকে টানতে টানতে আমার সামনে দিয়ে নিয়ে গেলেন। একটিবারও সে মুখ খুলল না।
আর তার তৈরি ব্রেকফাস্ট খাওয়া অসম্ভব আমার পক্ষে। নিজে ব্রেকফাস্ট তৈরি করতে ইচ্ছে করছিল না। পটনায়কের জিপের শব্দ মিলিয়ে গেলে তালা এঁটে বেরিয়ে পড়লুম।
