গউর ঘুমোচ্ছিল। দরজা খুলে দিয়েই টলতে টলতে যেভাবে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল এবং একটি কথাও বলল না, তখন বুঝলাম লোকটা গাঁজাখোর।
পোশাক বদলে ফোনের কাছে গেলুম। কিন্তু ফোন তুলেই দেখলুম, ডেড! অথচ আজ দুপুরেও ফোন ঠিক ছিল। মেহেরগঞ্জে পাণিগ্রাহীর সঙ্গে বাক্যালাপ করেছি ফোনে। অবাক হয়ে একটু বসে থাকার পর চুরুট ধরালুম এবং তারপরই একটা কথা মাথার ভেতর নড়ে উঠল।
এতগুলো ঢিল ছুঁড়ছিল কেউ, কিন্তু একটাও আমার গায়ে লাগেনি। ভূতের ঢিল নাকি মানুষের গায়ে লাগে না। কিন্তু ওই, অশরীরী–যে আমাকে অতক্ষণ ধরে আড়াল থেকে অনুসরণ করছিল, তার ঢিলগুলো টর্চের আলোয় স্পষ্ট দেখেছি, সবই আমার আশেপাশে পড়ছিল!
তার মানে, সে আমাকে লক্ষ্য করে ঢিল ছুঁড়ছিল ঠিকই কিন্তু আমার শরীর তার লক্ষ্যস্থল ছিল না। কেন?
সে যেই হোক, আমাকে আঘাত করা তার উদ্দেশ্য ছিল না। যেন উদ্দেশ্য ছিল, আমাকে ওই কুঠুরিতে ঢোকা থেকে নিবৃত্ত করা? কেন?
মাই গুডনেস! আমি নড়ে বসলুম। সাদা দাড়ি আঁকড়ে ধরলুম উত্তেজনায়।…
.
পরদিন ভোর ছটায় গউর বেড-টি দিয়েছিল যথারীতি। আমিও চিরাচরিত নিজস্ব অভ্যাসে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছিলুম। সমুদ্রতীরে ধ্বংসপুরীর সামনে পৌঁছে রাতের কথা ভেবে যুগপৎ হাসি ও দুঃখে বিচলিত বোধ করছিলুম। দিনের প্রথম ধূসর আলো, সমুদ্রে পূর্ব দিগন্তে আজ ঘন মেঘ এবং বাতাসও জোরালো, আমাকে অকুতোভয়ে সেই ছোট্ট কুঠুরিতে পৌঁছে দিতে সাহায্য করল। ভেতরে ঢুকেই থমকে দাঁড়ালুম।
কোণের দিকে একখানে বালির মেঝে কেউ যত্ন করে সমান করে রেখেছে। একই জুতোর সোলের অনেকগুলো ছাপ। কাল দিনশেষে দেখা ছাপের ওপর এই ছাপগুলো দেবে বসেছে। কেউ ভারী কিছু তুলেছে যেন! তারপরই ফোকরটার দিকে চোখ পড়ল। ফোকরের কিনারা এবড়ো-খেবড়ো এবং ধারালো। সেখানে কয়েকটা লম্বা কালো চুল আটকে আছে।
দেখা মাত্র ফোকর গলিয়ে ওপাশে গেলুম। বালির ওপর বড়-ছোট পাথরের ধসে পড়া চাঁই পড়ে আছে। সেই বালিতেও দেবে যাওয়া জুতোর ছাপ। বাঁদিকে ঘুরে গেছে ছাপগুলো। একটা ফুট তিনেক খাড়া দেয়ালের ভাঙা অংশের নিচে সটান ঢালু বালিয়াড়ি বিচের কিনারায় শেষ হয়েছে। সেই ঢালু বালিয়াড়িতে একটা জায়গা ধস ছেড়েছে এবং এখন জোয়ারের সময় সমুদ্রের ফেনিল জলের হাল্কা স্তরগুলো বিচের কিনারা অব্দি ধুয়ে দিয়ে যাচ্ছে। ধস ছাড়া জায়গাটা দেখে বুঝলুম, এখান দিয়েই ভারী জিনিসটা বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বিচে। বিচের সব চিহ্ন জোয়ার এসে ধুয়ে ফেলেছে। কিন্তু সবই স্পষ্ট হয়ে গেল আমার কাছে।
হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেলুম প্রথমে দীপের বাংলোয়। কিন্তু ডাকাডাকি করেও তার সাড়া পেলুম না। তখন থানায় যাওয়ার জন্য পা বাড়ালুম।
কিন্তু কয়েক পা এগিয়ে কী একটা বোধ মাথার ভেতর ঝিলিক দিল। ডাইনের ঘাস-জমিতে পায়ে চলা রাস্তাটা দিয়ে ফিরে গেলুম উদয়াচলে–আমার ডেরায়। গিয়ে দেখি, গেটে তালাবন্ধ করে গউর রোজকার মতো সাইকেলে চেপে বাজারে গেছে। সাড়ে ছটা বাজে। ডুপ্লিকেট চাবি আছে আমার কাছে। গেট খুলে বারান্দায় পৌঁছুতে দু সেকেন্ডও লাগল না। প্রথমে ঘরে ঢুকেই ফোনের লাইন চেক করলুম। ফোন তেমনি ডেড। তখন তারটি টেনে বের করলুম ওয়াড্রোবের পেছন থেকে। তারপর আবিষ্কার করলুম–হ্যাঁ, আমি তো এটা জানতুমই, তারটা কাটা রয়েছে।
কিটব্যাগে কখন-কী-কাজে-লাগে ভেবে সব সময় টুকিটাকি স্কুড্রাইভার, খুদে ছুরি এসব মজুত রাখি। ঝটপট তার জোড়া দিতেই লাইন চালু হলো। প্রথমেই রিং করলুম আর্মিক্যাম্পের কমান্ডান্ট মিঃ চোপরাকে। চোপরা আমার এক সামরিক অফিসার বন্ধুর ছেলে। তাকে যখন জিগ্যেস করলুম, চন্দনপুর বিচে পৌঁছুনোর জন্য এনট্রি-গেট ছাড়া আর কোনও পথ আছে কি না– বিশেষ করে গাড়ি নিয়ে, সে খুব অবাক হয়ে হাসতে লাগল। বলল, না। সি-বিচের দক্ষিণে লাইটহাউসের পর ব্যাকওয়াটার–ভীষণ কাদা আছে। আর উত্তরে বিচের শেষদিকে চোরাবালি আছে। প্রটেক্টেড এরিয়া। এছাড়া উত্তরে আর্মির গুলিগোলা প্র্যাকটিসের জায়গা। কাজেই প্রটেক্টেড এরিয়া। দক্ষিণে আর্মিক্যাম্প। পশ্চিমে ওই গেট আর দুধারে খাড়া পাহাড়ের দেয়াল। অতএব গাড়ি নিয়ে ঢোকার প্রশ্নই ওঠে না। পায়ে হেঁটে? অসম্ভব। মিলিটারির চোখ এড়িয়ে কোনো ট্রেসপাসারের ঢোকার সাধ্য নেই। কিন্তু এসব প্রশ্ন কেন?
পরে জানাব, বলে ফোন রাখলুম। এবার ডায়াল করলুম এনট্রি গেটের অফিসারকে। গত এক সপ্তাহের মধ্যে–গতকাল পর্যন্ত কেউ চন্দনপুরে ঢুকেছে কি না? অফিসারটি চোপরার সুবাদে আমাকে খাতির করেন। জানালেন, তিনজন ঢুকেছেন এই সময়ের মধ্যে। এক : আমি। দুই : মেহেরগঞ্জের বিখ্যাত ব্যবসায়ী মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্রের পুত্র দীপঙ্কর এবং পুত্রবধূ সুভদ্রা।
পুত্রবধূ! আমার মুখ দিয়ে কথাটা বেরিয়ে গেলে অফিসার ভদ্রলোক হাসতে লাগলেন। বললেন, ওকে কর্নেল! মে বি হিজ ফিয়াসে অর আ লাভ-গার্ল! আপনি নিশ্চয় শুনেছেন চন্দনপুর বিচকে লাভার্স বিচ বলা হয়?
ফোন রেখে চুরুট ধরালুম। ছটা পঁয়তাল্লিশ বাজে। একটু ইতস্তত করে থানায় রিং করলুম। ডিউটি অফিসারকে নিজের পরিচয় দিয়ে বললুম, প্লিজ ও সি মিঃ মোহন পটনায়ককে বলুন, আমি একটা খুব জরুরি কথা বলব।
