তাহলে কী ঘটতে পারে? ট্র্যাপ বলতে তুমি কী বোঝাতে চাইছ? দীপ আবার দুহাতে মুখ ঢেকে নিচু খাটের বিছানায় বসে পড়ল। ভাঙা গলায় বলে উঠল, আমি জানি না। কিছু জানি না।
তার কাধ আঁকড়ে বললুম, দীপ, দীপ! মাথা ঠাণ্ডা রাখো। শক্ত হও। এমন ভেঙে পড়লে কিছু করা যাবে না। বি স্টেডি, ডার্লিং!
দীপ শান্ত হবার চেষ্টা করে বলল, বাট হোয়াট ক্যান আই ডু?
আমার মূল প্রশ্নের জবাব দাও। কেন তুমি ভাবছ, সুভদ্রা তোমাকে ছেড়ে পালিয়ে যায়নি? তুমি বলছ চিঠিতে লেখা ছিল : ভুল বুঝো না। এতেই তো বোঝা যায়, সে কারুর সঙ্গে কিছু নিয়ে রফা করতে গিয়েছিল–ধরো, তার আগের কোনও প্রেমিকের সঙ্গে–
দীপ প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, অসম্ভব। আমি বিশ্বাস করি না। তাহলে সে আমাকে বলত।
কোনও মেয়ের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়, দীপ।
দীপ আমার চোখে চোখ রেখে ঈষৎ শান্ত হয়ে বলল, ওকে! কিন্তু সুভদ্রার সঙ্গে আপনার পরিচয় নেই, তাই একথা ভাবতে পারছেন। যদি তার আগের প্রেমিক কেউ থাকে, সে ওকে ফলো করে এখানে আসে–আমার চোখে পড়ত। কারণ আমি একমাত্র একটা লোককে ভয় পাই, তিনি আমার বাবা। বাবা নিজে বা কাউকে পাঠিয়ে চন্দনপুর-অন-সিতে আমি কী করছি, সে খবর নিতে পারেন–সেটা তার মতো লোকের পক্ষে অসম্ভব নয়। তাই আমি চারদিকে চোখ রেখেছিলুম। এক আপনি বাদে এখানে আর কোনও আউটসাইডারকে দেখিনি। তাছাড়া সবসময় সুভদ্রা আমার সঙ্গে থেকেছে। তারও কোনও সন্দেহজনক লোককে চোখে পড়েনি। পড়লে সে আমাকে বলত।
কিন্তু আজ তুমি দুপুরে যখন ঘুমিয়ে ছিলে, তখন যদি কেউ এসে ওকে। ডেকে নিয়ে গিয়ে থাকে?
বাবার লোক, কিংবা বাবা নিজে?
দীপের কণ্ঠস্বরে চমক লক্ষ্য করে বললুম, না। ধরো-সুভদ্রার আগের কোনো প্রেমিক?
দীপ হঠাৎ যেন পাগল হয়ে গেল। গর্জন করে দরজার দিকে আঙুল বাড়িয়ে বলে উঠল, গেট আউট ইউ ওল্ড ফুল! গেট আউট ইউ ব্লাডি হ্যাগার্ড! আই সে–। আউট! লিভ মি অ্যালোন।…
বেগতিক বুঝে দ্রুত বেরিয়ে এলুম। একালের ছেলেমেয়েদের রীতিনীতি সত্যি অদ্ভুত! গেট দিয়ে বেরিয়ে সংকীর্ণ এবড়ো খেবড়ো রাস্তায় ডাইনে পুবের দিকে পা বাড়ালুম। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, সব সময় মনে হচ্ছিল কেউ আড়ালে থেকে আমাকে অনুসরণ করছে। কিছুতেই এই অস্বস্তিকর অনুভূতি এড়াতে পারলুম না। প্রতি মুহূর্তে পিছন বা পাশ থেকে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে শেষ পর্যন্ত জ্যাকেটের ভেতর-পকেট থেকে ২২ ক্যালিবারের খুদে নতুন কেনা পিস্তলটি বের করতে হলো। এতে আঠারোটি গুলি ভরা আছে। সুতরাং অজানা
আততায়ীর সঙ্গে লড়াই করার পক্ষে এটি যথেষ্ট।
আজ রাতে সমুদ্রকে জ্যোৎস্নায় একটা বিশাল বিস্ফোরণের মতো দেখাচ্ছিল। প্রচণ্ড হাওয়া দিচ্ছিল। জনহীন বিচে একটা সাদা কুকুরকে বালি শুকে বেড়াতে দেখছিলুম। গউর বলেছিল, বিচের বালি শুকে ওরা টের পায়, কোথায় পাঁকাল জাতীয় সাপ-মাছ ঢুকে আছে। বালি নখের আঁচড়ে সরিয়ে কিলবিলে সামুদ্রিক প্রাণীটিকে ওরা তারিয়ে তারিয়ে খায়। তাছাড়া কঁকড়াও কুকুরদের প্রিয় খাদ্য– যদিও বিদ্যুতের মতো গতিশীল এইসব কাকড়া পাকড়াও করা ওদের কাছে আকাশকুসুম সাধ!
বেশ বলতে পারে বটে রসিক গউর। কিন্তু এ মুহূর্তে গউর বা তার রসিকতা অথবা ওই একলা অনুসন্ধানী ক্ষুধার্ত সাদা কুকুরটির চেয়ে আমার মনে অন্য একটি ভাবনা পাথরের মতো আটকে গেছে। আর প্রতিমুহূর্তে অতর্কিতে আক্রান্ত হওয়ার অস্বস্তি!
পাথরের ভাঙাচোরা বাড়িগুলোর ধ্বংসস্তূপের ভেতর ঢুকতে গিয়ে মনে হলো, ঠিক করছি না। মানুষখেকো বাঘের মতো অদৃশ্য আততায়ী আমাকে আত্মরক্ষার সুযোগ দেবে না এমন একটা পরিবেশে। ধ্বংসপুরীটি আন্দাজ তিনশো মিটারের বেশি লম্বা। বিচে খোলামেলায় নেমে উত্তর প্রান্তের বালিয়াড়ি দিয়ে আবার ওপরে উঠলুম। ঘুরে দক্ষিণমুখী হতেই সেই ছোট্ট টিকে থাকা কুঠুরিটি সামনে পড়ল, যার ওপাশের দেয়ালের ফোকর দিয়ে মেঝের বালিতে জুতোর ছাপ দেখেছি।
পিস্তল ও টর্চ বাগিয়ে ধরে মরিয়া হয়ে কয়েকটি পা বাড়িয়েছি সেদিকে, অমনি আমার পাশে ধপাস করে একটুকরো পাথর বা কিছু পড়ল। থমকে যেতেই আবার একটা ঢিল বা পাথর পড়ল। টর্চ জ্বেলে কিছু দেখতে পেলুম না সামনে। অথচ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সামনের ধ্বংসপুরীর দিক থেকেই আসছিল।
টর্চের আলোয় পিস্তলটি বাড়িয়ে চেঁচিয়ে বললুম, গুলি ছুঁড়ব বলে দিচ্ছি। সাবধান!
কিন্তু অদৃশ্য আততায়ী গ্রাহ্য করল না। হয়তো, সে নিরাপদে দেয়াল বা পাথরের স্কুপের আড়ালে আছে বলেই। আবার পাথরের টুকরো এসে পড়তে শুরু করল। আলোয় দেখতে পাচ্ছিলুম, সেগুলো খুবই ছোট্ট। খাপ্পা হয়ে আন্দাজ করে ট্রিগারে চাপ দিলুম। গুলি বেরিয়ে গেল। প্রচণ্ড সামুদ্রিক হাওয়ায় পিস্তলের গুলির শব্দটা অতিরিক্ত কোনও সাড়া জাগাল না। আর আরও অদ্ভুত ব্যাপার, পাথর ছোঁড়া কিন্তু থেমে গেল না।
জনহীন জ্যোৎস্নারাতে পর্তুগিজ আর মুঘলদের ধ্বংসপুরীতে এতক্ষণে অন্য এক অস্বস্তির তীব্র শিহরন ঘটে গেল মনে। এ কি কোনও অশরীরী আত্মার ক্রিয়াকলাপ? এই কর্নেল নীলাদ্রি সরকার এ জীবনে অসংখ্য অদ্ভুত..অদ্ভুত ভৌতিক রহস্যের মোকাবিলা করেছে। কিন্তু এমন ভৌতিক ঘটনার মুখোমুখি কখনও হয়নি। আবার ঢিল পড়তে শুরু করলে কী এক দুজ্ঞেয় আতঙ্ক আমার রক্ত হিম করে ফেলল। আমি হনহন করে ফিরে চললাম পাণিগ্রাহীর বাংলো উদয়াচলের দিকে।
