সুভদ্রা কোথায়?
দুটো হাত গাল থেকে সরে পুরো মুখে ঢেকে গেল। ভাঙা গলায় বলে উঠল, জানি না। সাড্নলি শি ইজ ভ্যানিশড–আ ট্র্যাজিক ম্যাজিক ইনডিড। তাকে দুপুর থেকে খুঁজে পাচ্ছি না। সারা চন্দনপুর তন্নতন্ন খুঁজেও–বাট শি ওয়জ নট আ গার্ল অফ দ্যাট টাইপ! ও ছিল– দ্রুত কথা কেড়ে বললুম, সুভদ্রা কি তোমার স্ত্রী?
মুখ থেকে হাত-দুটো সরে গেল। দেখলুম, চোখ দুটো লাল এবং ভিজে। নাসারন্ধ্র স্ফুরিত। সেই তখনকার মতো চোয়াল শক্ত। দাঁতে দাঁতে। একটু পরে বলল, শি ওয়জ মাই ফিয়াঁসে! শীগগির আমাদের বিয়ে হতো।
হুঁ–সুভদ্রার বাড়ি কোথায়?
কলকাতা–ফিয়ার্স লেনে। বাবার বিজনেসের সূত্রে ওদের ফ্যামিলির সঙ্গে আমার। পরিচয়। কিন্তু বাবার এ বিয়েতে মত ছিল না। তাই বাবা জানেন না, সুভদ্রাকে নিয়ে এখানে এসেছি। ওর কথামতো স্টেশনে গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলুম লাস্ট ফ্রাইডে। আজ সানডে। স্টেশন থেকে ওকে নিয়ে সোজা এখানে চলে এসেছিলুম।
তোমার বাবা জানেন তুমি চন্দনপুরে আসছ?
বাবা জানেন, আমি একা আসছি।
পারমিট লাগে চন্দনপুরে ঢুকতে। তুমি স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পারমিট নিয়েছিলে?
দ্যাটস ওক্কে।
শেষবার সুভদ্রাকে–মানে কখন সে বাংলো থেকে…
প্রশ্নটা বুঝে দ্রুত বলল, দুপুরে দুজনে রান্না করে খেলুম। একটা ক্যাসেট চালিয়ে মিউজিক শুনতে শুনতে আমার ঘুম এসেছিল। সুভদ্রা পাশে শুয়ে একটা ম্যাগাজিন পড়ছিল। আমার ঘুম ভাঙল তিনটেয়। তারপর ওকে দেখতে পেলুম না। ভাবলুম বিচে গেছে। সেখানে গেলুম। ভাবলুম রোজকার মতো লুকোচুরি খেলছে। কিন্তু–
আমার দুহাতে মুখ ঢাকল। ডাকলুম, দীপ!
বলুন!
ডু য়ু থিংক দেয়ার ইজ এনি ফাউল প্লে সামহোয়্যার?
ইয়া। আই স্মেল সামথিং। বলে উঠে দাঁড়াল হঠাৎ।…আপনাকে দেখাচ্ছি। জাস্ট এ মিনিট!
সে পাশের ঘরে চলে গেল। ঠিক তখনই আবার আমার মনে হলো, কেউ কোত্থেকে আমার দিকে নজর রেখেছে। চিরদিন এ ধরনের রহস্যময় ঘটনার মাঝখানে গিয়ে পড়লে এই অনুভূতিতে আক্রান্ত হই। দ্রুত উঠে গিয়ে বারান্দায় উঁকি মেরে টর্চ জ্বেলে এদিক-ওদিক দেখে নিলুম। পেছনের ন্যাড়া টিলাটা এখন জ্যোৎস্নায় কালো। টর্চের আলো তার কিনারা ছুঁল। কিন্তু কেউ কোথাও নেই। বসার ঘরে ঢুকে দেখি, দীপ ফেরেনি। পাশের ঘরে খসখস শব্দ হচ্ছে। কিছু খুঁজছে যেন ব্যস্তভাবে। খুঁজে পাচ্ছে না হয়তো। সে চাপা অশ্লীল ইংরেজি খিস্তি করছে কানে এল।
তখন সোজা ওঘরে ঢুকে গেলুম পর্দা তুলে। আমাকে দেখে সে স্থির হয়ে দাঁড়াল। ভাঙা গলায় বলে উঠল, খুঁজে পাচ্ছি না। অথচ ওটা আমার জিনসের পেছন পকেটে গোঁজা ছিল। মনে পড়ছে না–তারপর কোথাও রেখেছিলুম কি না। আসলে বিকেল থেকে আমার মাথার ঠিক নেই–দা ব্লাডি হেল অফ আ মেস!
জিনিসটা কী, দীপ!
একটুকরো কাগজ। ওটা ওই কোণের টুলে যে স্কাল্পচারটা দেখছেন, ওখানে খোলা অবস্থায় রাখা দেখেছিলুম। যেন আমার চোখে পড়ার জন্য কেউ রেখেছে। পড়ে দেখে সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলুম, সুভদ্রা মূর্তিটার তলায় কোণাটা চাপা দিয়ে রেখেছে, যাতে আমার চোখে পড়ে।
কী লেখা ছিল কাগজে?
সে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে দীপ বলল, কাগজটা তখনই পেছন পকেটে গুঁজে আবার বিচে চলে গিয়েছিলুম। কিন্তু গিয়ে মনে হলো, দেরি হয়ে গেছে বড়। এখন আর কিছু করার নেই।
তারপর তুমি প্যান্ট বদলেছ। শর্টস পরেছ।
ইয়া।
বাথরুমে ঢুকেছিলে কি?
দীপ তাকাল বড় চোখ করে। বলল, মাই গুডনেস! ইউ আর রাইট, কর্নেল।
তখন ড্রয়িংরুমের দরজা খোলা ছিল কি?
ছিল, ছিল! নড়ে উঠল দীপ। আসলে আমার মাথার ঠিক ছিল না। আপনি আসার জাস্ট কয়েক মিনিট আগে খেয়াল হলে গেটে তালা দিয়েছি। ড্রয়িং রুমের দরজাও বন্ধ করেছি।
আর কোনও দরজা খোলা ছিল না–মানে বাইরের কেউ ঢুকতে পারে এ ঘরে, এমন কোনও দরজা?
নাঃ।
নাও টেল মি প্লিজ, কী লেখা ছিল কাগজে?
একজ্যাক্ট ল্যাঙ্গোয়েজ ভুলে গেছি। জাস্ট মনে পড়ছে, লেখা ছিল : জরুরি একটা কাজে বেরুচ্ছি–বিচে যেও। ওখানে থাকব। …বলে দীপ নাকের ডগা আঙুলে ঘষে বলল ফের, না–বিচে গিয়ে আমার খোঁজ কোরো–অথবা ওইরকম কিছু।
মনে করে দ্যাখো, আর কিছু লেখা ছিল কী না!
দীপ ব্যাকুলভাবে স্মরণ করার চেষ্টা করছিল। একটু পরে বলল, আর তো কিছু মনে–ও, হ্যাঁ! মনে পড়েছে! লাস্ট কথাটা ছিল : ভুল বুঝো না। একটা বোঝাঁপড়া করা উচিত। কিছু বুঝতে পারিনি।
এ ঘরটা বেডরুম। আলো তত উজ্জ্বল নয়। টর্চ জ্বেলে বললুম, কোন প্যান্টটাতে চিঠিটা ছিল?
দীপ খাটের বাজুর মাথায় আটকে ঝোলানো প্যান্টটা দেখাল। সেটার সব পকেট খুঁজে দেখার পর, আবার মেঝে পরীক্ষা করতে থাকলুম টর্চের আলোয়। এবার চোখে পড়ল লাল সিমেন্টের মেঝেয় কিছু বালির ছাপজুতোর ছাপেরই চিহ্ন। অবশ্য ওগুলো দীপের জুতোরও হতে পারে।
বললুম, তোমার বাংলোয় টেলিফোন আছে?
আছে। দীপ আস্তে বলল।…কিন্তু আপনি কি পুলিশকে জানাতে চাইছেন? তাতে আমার আপত্তি আছে। স্ক্যান্ডালাস হয়ে পড়বে পুরো ব্যাপারটা।
ওর চোখে চোখ রেখে বললুম; দীপ! তুমি ফাউল প্লের কথা বলছিলে। হোয়াট ডিড য়ু মিন? সুভদ্রা পালিয়ে গেছে?
দীপ জোরে মাথা নেড়ে অস্থির ভঙ্গিতে বলল, ও নো নো! আই ডিডন্টু মিন দ্যাট কর্নেল! আমার মনে হচ্ছে, ও কারুর ট্র্যাপে পড়েছে–ওর লাইফের সব কথা তো আমি জানি না। জাস্ট মাস কয়েকের পরিচয় ওর সঙ্গে।
