আজ্ঞে, আজ্ঞে। গউর সায় দিয়ে বেরিয়ে গেল কিচেনের দিকে।
আরাম করে বারান্দার ইজিচেয়ারে বসে চুরুট টানছি, সবে জ্যোৎস্না ফুটেছে, মনে পড়ল, ওই যা! গউর তো আমার মূল প্রশ্নের জবাব দেয়নি। তাকে ডাকলুম। বললুম, হুঁ–তোমার কাছে যা জানতে চাইছিলুম তখন। গত দু-তিন দিনে বিচে কোনও ছেলেমেয়েকে
এ পর্যন্ত শুনেই গউর খ্যাখ্যা করে হাসল। …বুঝেছি। আপনি মেহেরগঞ্জের মহাপাত্ৰমশায়ের ছেলের কথা বলেছেন তো? ওনাকে দেখেছি বৈকি। সঙ্গে, বউমা ছিল, তাও দেখেছি। তবে স্যার, দীপবাবু ছেলেটা গোয়ারের হদ্দ। জিগ্যেস করতে গেলুম, বিয়েতে অধম নেমন্তন্ন কেন পায়নি, তো এমন চোখ করে তাকাল!
আস্তে বললুম, কেমন করে বুঝলে মেয়েটি ওর বউ?
গউর মাথা চুলকে বলল, তাছাড়া আর কে হবে? সিথেয় সিঁদুর ছিল মনে পড়ছে।
ওরা কি বাঙালি?
তা বলতে পারেন। মেদিনীপুরের কাথির লোক মহাপাত্রমশাই। কঁথিতে আমার বোনের বিয়ে হয়েছে স্যার। তাছাড়া পাণিগ্রাহীমশাই ওনার বন্ধু বটেন। সেই লাইনে চেনাজানা আমার সঙ্গে।
ওরা কোথায় উঠেছে জানো কি?
গউর ঝটপট বলল, কেন? ওই তো রাস্তার ওধারে ন্যাড়া পাথরের টিলার নিচে মহাপাত্ৰমশাইয়ের বাংলোবাড়ি।
ঘড়ি দেখলুম। রাত সাড়ে আটটা বাজে মোটে। সামুদ্রিক আবহাওয়ায় কী যে রাক্ষুসে খিদে পায় মানুষের। খুব সকাল-সকাল খাওয়া হচ্ছে। উঠে দাঁড়িয়ে বললুম, গউর! আমি একটু ঘুরে আসি। তুমি শুয়ে পড়তে পারো।
গউর বলল, নানা, আপনি ঘুরে আসুন বিচে। আমার ঘুমুতে রাত একটা দুটো।…
.
বিচের দূরত্ব এই বাংলোবাড়ি থেকে বড়জোর সিকি কিলোমিটার। কৃষ্ণপক্ষের ঈষৎ ক্ষয়াটে হলুদ জ্যোৎস্নায় সমুদ্রতীর অবশ্যই আমার পক্ষে এখন লোভনীয়। কিন্তু সেই ইনটুইশন-চিরদিন যে অতীরিন্দ্রিয়জাত বোধ আমাকে কাটার মতো খোঁচা মারে, এদিনই শেষ বেলায় বিচের মাথায় ভাঙা পাথুরে ঘরের ভেতর যা আমাকে উঁকি মারতে বাধ্য করেছিল, তাই আমাকে ঠেলে নিয়ে চলল রাস্তার ওধারে ন্যাড়া পাথরের টিলার নিচে একটি বাড়ির দিকে।
একটা বিশাল ও কাছিমের খোলের গড়ন ঘাসে ঢাকা জমির ওপারে বাড়িটার একটা জানালায় আলো দেখা যাচ্ছিল। ঘাসের জমিটা চিরে আবছা জ্যোৎস্নায় একফালি পায়েচলা পথ চোখে পড়ল। সেই পথে অনেকটা এগিয়ে গেছি, মনে হলো কেউ যেন আমাকে অনুসরণ করছে। দ্রুত ঘুরে কাউকে দেখতে পেলুম না! হয়তো মনের ভুল। জমিটার (৫ ৭ ঘন অস্থির জঙ্গল। তারপর একটা সরু এবং খোয়াঢাকা রাস্তা। শাল বাড়িটার গেটে পৌঁছুলে আবার মনে হলো, পেছনে কেউ আসছে। আবার দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালুম এবং এবার টর্চ জ্বাললুম। কেউ নেই।
কিন্তু তারপরই বাড়িটার আলোজ্বলা জানালা থেকে কেউ বলে উঠল, হুজ দেয়া?
হুঁ, সেই ছেলেটি–দীপ। যে কণ্ঠস্বর কর্নেল নীলাদ্রি সরকার জীবনে একবার শোনে, আর তা ভোলে না। একটু কেশে সাড়া দিয়ে বললুম, হ্যাল্লো দীপ!
হু আর য়ু?
দ্যাট ওল্ড ফেলা, হুম ইউ মেট অন দা সি-বিচ!
কিছুক্ষণ পরেও! এখানে আপনি কী করছেন?
আপনার–তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি, দীপ!
আমি গায়ে-পড়া আলাপ ডিজলাইক করি মিস্টার! হোয়াট দা হেল য়ু থিংক য়ু আর গোয়িং টু ডু উইথ মি?
আমি মনে মনে হাসছিলুম। কাথির কোনও এক ব্যবসায়ী, যিনি মেহেরগঞ্জে ব্যবসা করতে এসে বসবাস করছেন, তাঁর ছেলে দীপের এই অ্যাংলিয়ানা। অবশ্য ছেলেটি নিশ্চয় কলকাতায় থেকে ইংলিশ মিডিয়ামে লেখাপড়া শিখেছে এবং ইদানিংকার রীতি অনুসারে ব্ল্যাসে পরিণত হয়েছে, এতে অস্বাভাবিকতার কিছু নেই।
কিন্তু তারপর দেখলুম, সে বেরিয়ে এসে গেটের তালা খুলে দিল। তার হাতের টর্চ আমাকে কয়েক সেকেন্ড ঝলসে দিয়ে নিভে গেল।
তারপর শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে আস্তে বলল, ওক্কে। আসুন!
ছোট্ট লনের ডাইনে গ্যারেজ একটা ঝকমকে গাড়ি দেখতে পেলুম– সরাসরি তার ওপর জ্যোৎস্না পড়েছে বলেই। বারান্দায় উঠে সে ফের চাপা গলায় বলল, প্লিজ কাম ইন!
ড্রইং রুমটি ছোট এবং সাজানো। ওর পরনে শর্টস আর হাতকাটা গেঞ্জি। গলায় সরু রুপোলি চেন। আমি বসলে বলল, এনি ড্রিংক?
ধন্যবাদ। সদ্য ডিনার সেরে আসছি। …নিভন্ত চুরুটটি জ্বালিয়ে নিলে সে। অ্যাসট্রেটি এগিয়ে দিল। তারপর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বললুম, হোয়াট হ্যাঁপ দীপ?
প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল, আমার নাম কে বলল আপনাকে?
গউর। তুমি–তুমি বলার জন্য কিছু মনে কোরো না ডার্লিং, এ আমার অভ্যাস–তো তুমি আজ বিকেল থেকে একা কেন?
একটু চুপ করে থাকার পর নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে বলল, হু আর য়ু? আপনি কে?
আমার নাম তোমাকে বিকেলে বলেছিলুম। বলে বুঝতে পেরেছিলুম এই নামটির সঙ্গে তোমার পরিচয় নেই। আমি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। আমি একজন ন্যাচারালিস্ট–নেচার পর্যবেক্ষণ আমার হবি। নেচারকে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে তার অন্তর্ভুক্ত আরও অনেক কিছু আমার চোখে পড়ে যায়।
মুখ নামাল এবং দু হাত দুই গালে রেখে নগ্ন হাঁটুতে দুটি কনুই রেখে আস্তে বলল, য়ু হ্যাঁভ আ বাইনোকুলার!
ইয়া। একটু হেসে বললুম।
আপনাকে আমরাও–আমি ওয়াচ করেছিলুম। প্রথমে ভেবেছিলুম, আপনি একজন ফরেন ট্যুরিস্ট। ইউ লুক জাস্ট অ্যান য়ুরোপিয়ান। সুভদ্রা বলল, বাজি রাখছি, হি ইজ আ খ্রীস্টিয়ান ফাদার!
