ফের বললুম, মানুষের গতিবিধিও আমার পর্যবেক্ষণের বিষয়। তাছাড়া
আমাকে থামিয়ে দিয়ে হিসহিস করে বলে উঠল, তাহলে আপনি সবই দেখেছেন! য়ু আ পার্ভাটেড ওল্ড ম্যান! আই হেট য়ু! তারপর সে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল।
বললুম, শুনুন! আমি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার!
আই কেয়ার আ ফিগ ফর আ গন্ড্যাম কর্নেল অর আ ব্লাডি হেল! এই গজরানি দিয়ে সে দ্রুত হাঁটতে থাকল সিধে বিচ বরাবর দক্ষিণে। ওদিকে সাদা ও লাল লাইটহাউসটি শূন্যনীল শেষবেলার আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ধু ধু করছে ধূসর জনহীন উঁচু টিলার মতো বালিয়াড়ি। নিচের বিচে একটা নেড়ি কুকুর আর একটি ন্যাংটো নুলিয়া বালক আপনমনে খেলা করছে।
যুবকটি তাদের পাশ দিয়ে এগিয়ে বালিয়াড়িতে উঠে গেল এবং ওপাশে অদৃশ্য হলো। তখন আমি আস্তে আস্তে পেছনকার বিধ্বস্ত পাথুরে বাড়িগুলোর ভেতর উঠে গেলুম। গাঢ় ছায়া সেখানে। কী এক অবচেতন কৌতূহলে– কিংবা ইনটুইশান বশে কী যেন খুঁজতে থাকলুম। একটু পরে মনে হলো, কী খুঁজছি এখানে? কী? কেনই বা অনুসন্ধানবৃত্তি পেয়ে বসল ভূতের মতো?
ঘরগুলোর দেয়াল ভাঙাচোরা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও খানিকটা ছাদের টুকরো ঝুলে আছে। সে-সবের ভেতর দিয়ে শেষদিকে উত্তরপ্রান্তে ঘুপটি একটুকরো ঘর আবিষ্কার করলুম। তার এদিকের দেয়ালে একটা প্রকাণ্ড ফোকর। ফোকরে উঁকি দেওয়ার আগে জ্যাকেটের পকেট থেকে টর্চ বের করে নিলুম। ছোট্ট ঘরটা নিশ্চয় গুদাম ছিল। ওপাশে ভাঙা দরজা। ভেতরটা এখনই গাঢ় আঁধারে ভরে গেছে। টর্চের আলোয় মেঝেটুকু স্পষ্ট হয়ে উঠল।
এইসব বিধ্বস্ত পাথরের বাড়িগুলোর ভেতর শুধু বালি আর বালি ভর্তি। এই টিকে থাকা খুদে ঘরটির মেঝেতেও চাপ-চাপ বালি। সেই বালিতে কয়েকটা জুতোর সোলের স্পষ্ট ছাপ এবং ব্যাপারটা অদ্ভুত একারণেই যে ছাপগুলো শেষ হয়েছে এই ফোকরের নিচেই।
হুঁ, কেউ দাঁড়িয়ে ফোকর দিয়ে কিছু লক্ষ্য করেছিল অথবা লক্ষ্য করত। কিন্তু কে সে? কী লক্ষ্য করত সে?
.
চন্দনপুর-অন-সিতে আমি যে ছোট্ট বাংলোবাড়িতে উঠেছি, সেটি আমার এক বন্ধু অরবিন্দ পাণিগ্রাহীর। তিনি ব্যবসায়ী মানুষ। থাকেন মেহেরগঞ্জে এখান থেকে পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার দূরের শহরে। এই বাংলোবাড়ির নাম উদয়াচল। কেয়ারটেকার আছে। তার নাম গউড়-অ। ওড়িয়া ভাষার অ-কারান্ত উচ্চারণ বাংলায় লেখা কঠিন। তাই তাকে বরং গউর বলা যাক, গৌরের বাংলা অপভ্রংশ। তাছাড়া এই গউর বা গউড়-অ-চমৎকার বাংলা বলে। শুধু তাই নয়, সে হিন্দি এবং তেলুগুও বলতে পারে। এই চতুর্ভাষাবিদ লোকটির বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। অতিশয় বুদ্ধিমান এবং মালিকের অতিথির চমৎকার সার্ভিস দিতে পটু। সে রাতে খেতে বসে তাকে জিগ্যেস করলুম, সমুদ্র তার কেমন লাগে?
আমার প্রশ্নটা নিশ্চয় তার অদ্ভুত লাগল। তাই যেন বলল, কেমন লাগবে স্যার? সমুদ্রের ধারে যার জন্ম আর এতকাল থাকা, তার কাছে সমুদ্র তো সমুদ্রই। আপনি যদি নতুন কিছু দ্যাখেন, তাহলে বুঝবেন সেটা ভাল না খারাপ।
একটু হেসে প্রশ্নটা শুধরে দিলুম। ..নামানে, তুমি সকাল-বিকেল বা কোনো সময় ফুরসত পেলে সমুদ্রের ধারে বেড়াতে যাও কি না?
গউর হাসতে লাগল। …তা যাই স্যার। তবে সমুদ্রের আর নতুন কী দেখব? যাই নুলিয়াদের কাছে মাছ-টাছ আনতে। কখনও কারুর সঙ্গে দেখা হলে বিচে একটু বসে গপ্পসপ্প করি–এই আর কী?
আচ্ছা গউর, গত কয়েকদিনে তুমি কি কোনও যুবক-যুবতী–মানে ছেলে মেয়েকে দেখেছ বিচে?
গউর আরও হাসতে লাগল। …স্যার, চন্দনপুর বিচের একটা পুরনো নাম আছে। আজকাল নামটা সবাই ভুলে গেছে। ব্রিটিশ আমলে–তখন আমি এইটুকু ছেলে, তবু মনে আছে, লোকে বলত লাবার্স বিচ! বড় বদনাম ছিল, স্যার!
লাবার্স বিচ, নাকি লাভার্স বিচ?
ওই হলো আর কী। গউর ঈষৎ লজ্জায় আড়ষ্টভাবে বলল। কবছর আগে অব্দি অফ-সিজন বলতে কিছু ছিল না। সব সময় জোড়া-জোড়া–মানে স্যার, বুঝলেন তো? লাজলজ্জার বালাই নেই–সেকালের সায়েবমেমদের মতো নেকিড হয়ে বিচে, নয়তো বালিয়াড়িতে…।
সংকোচে সে থেমে গেলে বললুম, বুঝেছি।
গউর বলল, তো শেষে পুলিশ খুব পেছনে লাগল। মাঝে-মাঝে খুনখারাবিও হতো। মানে কে কার বউ ভাগিয়ে নিজের বউ সাজিয়ে এনেছে, আর তার হাজব্যান্ডো তক্কেতক্কে চলে এসেছে। শেষে–গউর ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে ফের বলল, কাগজে লেখালেখির চোটে পুলিশ ক্যাম্প বসালে বিচের মাথায়। তারপর এই অবস্থা। ওই এক শীতকালটা যা ভিড়ভাট্টা, তারপর বাকি সময় খাঁ খাঁ পড়ে থাকে। যদি বা কেউ এস পড়ে, মন টেকে না। একটা দিন থেকে চলে যায়।
কেন? গউর এ প্রশ্নে একটু অবাক হল। বলল, মানুষ আসলে ভিড়ভাট্টাই বেশি ভালবাসে, স্যার। এখানে আছেটা কী? না বাজার, না কিছু। একটা মোটে হোটেল বা কারুর এইরকম লজ বা বাংলো। আর হোটেল মানে কী, নিশ্চয় দেখেছেন স্যার?
দেখেছি। মাটির ঘর।
মাটির ঘর। গউর রিপিট করল। শীতের সময়টা বাদ দিলে খাঁ খাঁ। না খদ্দের, না কিছু।
খাওয়া শেষ করে জল খাচ্ছিলুম। তখন গউর এঁটো থালাবাটি গোছাচ্ছিল টেবিল থেকে! জল খেয়ে বললুম, হুঁ–তাছাড়া লাইটহাউসের পেছনে ডিফেন্স ডিপার্টের বিভিন্ন দফতর আছে। আর্মি ট্রেনিং সেন্টার আছে। তাই এখানে আসতে স্পেশাল পারমিট লাগে। সেই ঝামেলায় এই অবস্থা হয়েছে।
