চন্দনপুর-অন-সি ওড়িশার সমুদ্রতীরে একটি ছোট্ট জনপদ। বেমরশুমে, এই সেপ্টেম্বরে তার বিচ একেবারে জনহীন খাঁ খাঁ। সেই ভোরে–অতি প্রত্যুষে দীর্ঘ বিচের উত্তরপ্রান্তে যেখানে জেলেবস্তি, তেলুগুভাষায় যাদের বলে নুলিয়া, ঝাঁক বেঁধে ছোট-ছোট নৌকো নিয়ে সমুদ্রের সঙ্গে লড়াইয়ে নামে। এ সমুদ্র বড় উদ্ধত। অহঙ্কারী। তবু এক ঝক কালো কালো শীর্ণকায় মানুষের এ লড়াই বেঁচেবর্তে থাকার লড়াই। এই লড়াই দিয়েই আবহমানকালব্যাপী মানুষ প্রকৃতিকে পরাজিত করেছে। এ সমুদ্রও প্রকৃতি। তার বুকে ছোটবড় নানা গড়নের কালো পাথর মাথা উঁচিয়ে আছে। প্রচণ্ড ঢেউ আর ওইসব কালো পাথরের অস্ত্র দিয়ে সমুদ্র মানুষকে রুখতে চায়। পারে না। দুপুর নাগাদ যখন ক্লান্ত নুলিয়ারা ফিরে আসে, তখন তাদের নৌকো-ভরা ঝকঝকে রুপোলি সমুদ্র শস্য। তারপর আবার বিচ জনহীন খাঁ খাঁ-নিরুপদ্রব। পাড়ে বালিয়াড়ির মাথায় শক্ত মাটিতে দাঁড়ানো প্রচীনযুগের পর্তুগীজ আর মুঘল বণিকদের পাথরের বাড়িগুলো নিজস্ব নির্জনতা ফিরে পায়। কী গম্ভীর প্রগাঢ় সেই নির্জনতা–যেন জমহাকালের হাঁ-করা মুখ। সমুদ্রের গর্জন, জলপাখিদের চিৎকার, প্রেমিক-প্রেমিকায় কণ্ঠস্বর আর হাসি, সবকিছুই সেই হাঁ-করা মুখের ভেতর লুপ্ত হয়ে যায়। কোনো শব্দ আর তখন শব্দ নয়। দিনের আলোও দিনের আলো নয়, কিংবা অন্ধকার বা জ্যোৎস্নাও অন্ধকার বা জ্যোৎস্না নয়। সবই ওতপ্রোত একাকার, গম্ভীর এক সময়সত্তা।
ঠিক বোঝাতে পারছি না, চন্দনপুর-অন-সি বেলাভূমিতে আসলে যেন বিরাটেরই স্বাদ অনুভব করতে পারছিলুম। তাই নিজেকে একা আর তচ্ছ লাগছিল। মনে হয়েছিল ছেলেটি ও মেয়েটির সঙ্গে আলাপ করি। কিন্তু ওদের কাছাকাছি পৌঁছুতে পারছিলুম না। যখনই পা বাড়িয়েছি, ওরা দ্রুত সরে গেছে
তৃতীয় দিনের বিকেলে বিচে একটা প্রকাণ্ড পাথরের ওপর বসে আছি, হঠাৎ ঘসঘস শব্দে চমকে উঠলাম। দেখলাম, ছেলেটি ধ্বংসস্তূপের নিচেকার বালিয়াড়ি দিয়ে একরাশ বালি ধসিয়ে অন্যদিনের মতোই নেমে এল। এসে আমার থেকে আন্দাজ পনের মিটার দূরে দাঁড়াল। তার পরনে অন্য দিনের মতোই হাল্কা ছাইরঙা গেঞ্জি আর জি, পায়ে নীলচে কেডস। তার রুক্ষ বড়-বড় চুলের কাঁপ সামুদ্রিক বাতাসে ছত্রখান হচ্ছিল। কয়েক মিনিট সে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। একটা বড় ঢেউ এসে ভেঙে পড়ল এবং সাদা একরাশ ফেনিল জলের হাল্কা একটা স্তর তাকে পেরিয়ে গেল। তবু সে দাঁড়িয়ে রইল।
একটু কাশলুম। তখন সে আমার দিকে একবার মুখটা ঘোরাল। গলা ঝেড়ে নিয়ে তাকে লক্ষ্য করে বললুম, আকাশ আজ দারুণ পরিষ্কার। কালকের মতো বৃষ্টি নামার লক্ষণ নেই। অথচ সমুদ্রকে কেমন যেন পাগলাটে দেখাচ্ছে। তাই না?
ছেলেটির বয়স চব্বিশ-পঁচিশের মধ্যে। দেহের-গড়নে স্পোর্টস-ম্যানের আদল আছে। ওর বাহুর পেশী শক্ত হয়ে ফুলে উঠেছে এবং মুখেও একটা শক্ত ভাব, চোয়াল আঁটো। চোখে কী একটা হিংস্রতানাকি অভিমান, কিংবা ক্ষোভ, সঠিক বুঝতে পারছিলাম না। একটু অবাক লাগছিল ওর চাউনি দেখে। আমার কথা শুনছিল কি না, জানি না। তবু আলাপ করার প্রগলভতায় এবং চিরাচরিত স্বভাবে বলতে থাকলুম, আসলে পাহাড় বলুন, জঙ্গল বলুন, কী মরুভূমি বলুন– প্রকৃতির সবচেয়ে রহস্যময় জিনিস হলো সমুদ্র। ওই গুমগুম চাপা গম্ভীর শব্দটা শুনুন! পর্দার আড়ালে কী তুমুল একটা কাণ্ড ঘটছে মনে হয়। যেন হয়, এবার প্রকাশ্যেই দেখতে পাব সাংঘাতিক কিছু–জাস্ট লাইক অ্যান নিউক্লিয়ার এক্সপ্লোসান!
এইসব কথা বলতে বলতে পাথরটা থেকে নেমে আমি ওর কাছাকাছি গেলুম ও সমুদ্রের দিকে মুখ রেখে আস্তে বলল, আর য়ু আর লেকচারার অফ ফিলসফি?
হেসে ফেললুম। ও নো, নো। জাস্ট অ্যান অবজার্ভেশান।
দেন হু আর য়ু?
নিতান্ত একজন ট্যুরিস্ট।
দীর্ঘ একমিনিট চুপচাপ থাকার পর বলল, আপনার কাছে বাইনোকুলার কেন? আপনি কি বার্ডওয়াচার?
ইংরেজিতেই দুজনের কথা চলছিল। কিন্তু আমার সন্দেহ হচ্ছিল যুবকটি বাঙালি। আজকাল আর আগের মতো বিশেষ করে ছেলেমেয়েদের দেখে বাঙালি-অবাঙালি কিছু বোঝা যায় না। তাহলেও এ চোখ কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের। আমি আরও এক পা এগিয়ে তার কাঁধে হাত রাখলুম। সে দ্রুত, যেন, অপ্রত্যাশিত গায়ে-পড়া অন্তরঙ্গতায় খাপ্পা হয়েই ঘুরে দাঁড়াল আমার মুখোমুখি। আমিও দ্রুত বলে উঠলুম, হোয়াট হ্যাঁপড়, ইয়ং ম্যান? কী ঘটেছে?
আস্তে কাঁধ থেকে আমার হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল, নাথিং! কেন এ প্রশ্ন করছেন?
এবার সেও আমারই মতো দ্বিতীয় বাক্যটি বাংলায় উচ্চারণ করল। একটু হেসে বললুম, আপনার চেহারায় কথাটি লেখা আছে। নানা। সংকোচের কোনো কারণ নেই। এই দূরদর্শন যন্ত্রটি দিয়ে প্রকৃতি এবং মানুষ উভয়ই আমি পর্যবেক্ষণ করি। এ আমার একটা হবি। আপনার বন্ধুটি কি আপনার সঙ্গে ঝগড়া করে চলে গেছে?
যুবকটির মধ্যে মুহূর্তের জন্য হিংসা ঝিলিক দিল–তার ব্যক্তিগত ব্যাপারে এক ধূর্ত বৃদ্ধ নাক গলাচ্ছে বলেই। কিন্তু পরমুহূর্তে সে সংযত হলো। লক্ষ্য করলুম, সে কাকতাড়ুয়ার মতো বিশীর্ণ আর শুকনো হয়ে যাচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে। যেন এখনই ভেঙে পড়বে ভিজে বালির ওপর। সে মুখটা নামাল। তার নাসারন্ধ্র ফুলে উঠল। চোয়াল আরও ঠেলে উঠল।
