আঁতকে উঠে বললুম–সর্বনাশ!
কর্নেল বললেন–যাই হোক, আমি তৈরি ছিলাম। পাল্টা গুলি ছুঁড়ে ওর রিভলভারটা ফেলে দিলুম। হাত চেপে ধরে সে পালালো। তখন রিকশোঅলাকে বললুম– তোমাকে পৌঁছে দিতে। আর আমি সেই রিভলভারটা খুঁজে নিয়ে মিঃ বেঙ্কটেশের কাছে গেলুম। ফোরেন্সিক টেস্টে নিশ্চয় ধরা পড়ছে–ওটাই মার্ডার উয়েপন।
–এত কাণ্ড! অথচ কিচ্ছু টের পাইনি!
–পাবে কীভাবে? পরিতোষবাবু তোমাকে মাতাল করে দিতেই চেয়েছিলেন যে!
-কেন? ওঁর কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে?
তুমি মদে বেহুঁশ থাকলে ফেরার পথে আমাকে একা খতম করাটা খুব সহজ হবে ভেবেছিলেন!
কর্নেল, খুলে বলুন।
কর্নেল পা ছড়িয়ে বসে বললেন–জয়ন্ত, এই কেসটা ইন্সিওরেন্স-ঘটিত।
বুঝলুম না।
–পুলকেশ মৈত্রের তিনটে ইন্সিওরেন্স করা আছে তিন দেড়ে সাড়ে চার লাখ টাকার। সে মরলে টাকাটা তৃণা পায়। অতএব পুলকেশ ঠিক করেছিল, সে মরবে। আত্মহত্যার কেসে আজকাল ইন্সিওরেন্স অনেক ঝামেলা করে। কিন্তু কোথাও বেড়াতে গিয়ে খুন হলে ঝামেলা নেই। পুলকেশ ও তৃণা ঠিক করল যে নীলাপুরমে গিয়ে পুলকেশ খুন হবে। হলোও। তার মানে স্ত্রী যদি কোনও ডেড বডিকে স্বামীর বলে চালায়, অসুবিধে নেই। এবার তৃণাকে বাকিটা করতে হবে। ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে ইন্সিওরেন্সে স্বামীর টাকা ক্লেম করবে। টাকা পেয়ে যাবে। তখন পুলকেশ অজ্ঞাতবাস থেকে বেরিয়ে তৃণার সঙ্গে কোনও নতুন এলাকায় পাড়ি জমাবে। আবার সে অন্য নামে, ইন্সিওর করবে। আবার খুন হবে। আবার তৃণা টাকা ক্লেম করবে–তখন সেও অবশ্য আর তৃণা নয়, অন্য নাম তাকেও নিতে হয়েছে। এটা হলো ওদের তিন নম্বর কেস। এর আগে পুলকেশ আর তৃণা ছিল অরুণ আর মাধবী।
তার আগের নাম ছিল পরিমল আর কেতকী। প্রত্যেকবারই তৃণার নির্বোধ প্রেমিকরা খুন হয়।
বাঃ! বেড়ে বুদ্ধি তো! কিন্তু এবারকার ডেড বডিটা কার?
তৃণার আরেক নির্বোধ প্রেমিক অবনী রায়ের। হাওড়াতে পুলকেশ একটা মারাত্মক ভুল করে। এ ভুল সব বুদ্ধিমান শয়তানের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। না হলে তাদের ধরা যেত না। পুলকেশ তিনটি বার্থ রিজার্ভ করেছিল একই শ্লিপে। কিন্তু এখানে পৌঁছে সে অবনীকে নিয়ে যায় দি সোয়ানে। ওখানে অবনীর নামে কিন্তু রুম বুক করা নেই। আছে পরিতোষ কারফর্মার নামে। পুলকেশ অবনীকে বলেছিল–ওর এক বন্ধু পরিতোষ কারফর্মার নামে দি সোয়ানে একটা ডাবল রুম বুক করা আছে। পরিতোষ হঠাৎ অন্য কাজে আটকে গেছে। তাই আসছে না। অতএব ওই রুমে সে থাকতে পারে। কোনও অসুবিধে হবে না। কিন্তু পরিতোষ তো একজন চাই। তা না হলে দি সোয়ান অবনীকে থাকতে দেবে কেন? অতএব পুলকেশ অবনীকে বলে–সে নিজেই বরং পরিতোষ হয়ে পরিচয় দেবে। রসিদ তো তার কাছেই আছে। এতে ব্যাপারটা দাঁড়াল বেশ মজার। পুলকেশ ধুতি-পাঞ্জাবি পরে খাঁটি বাঙালী বেশে পরিতোষ নামে দি সোয়ানে অবনীর সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটায়। আবার সী ভিউতে সাহেব সেজে পুলকেশ নামে স্ত্রীর কাছেও থাকে। অবনী নির্বোধ এবং তৃণার প্রেমে অন্ধ না হলে ফাঁদটা টের পেত। দি সোয়ানে তদন্ত করার পর ব্যাপারটা আমরা টের পেয়ে গেলুম।
— পুলকেশকে অ্যারেস্ট করতে পেরেছে তো পুলিশ?
–হুঁউ। গতরাতেই। দি সোয়ানে সেই ঘরটায় ব্যাটা শুয়ে কাতরাচ্ছিল। হাতে জখম। রুমাল বেঁধেও রক্ত বন্ধ হচ্ছিল না। বেসিনে ডেটলের ছড়াছড়ি। তাকে অবশ্য তক্ষুণি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল।
–সব তো বুঝলুম। কিন্তু ওদের ব্যাকগ্রাউণ্ড এত শীগগির পেলেন কোথায়?
কর্নেল অন্যমনস্কভাবে জবাব দিলেন তৃণা সব কবুল করেছে।
একটু পরে বললুম–বাইনোকুলার চোখে রেখে খাড়ির ওপর যে লোকটা সী ভিউয়ের দিকে লক্ষ্য রেখেছিল, সে নিশ্চয় পুলকেশ। কিন্তু লক্ষ্য রাখত কেন?
তৃণার কাছে সংকেত পাবার জন্যে। গ্রিন সিগন্যাল পেলেই সে স্ত্রীর কাছে যেত।…..বলে কর্নেল হেসে উঠলেন।–তবেই দেখ জয়ন্ত, তোমাকে বলেছিলুম–আমার খুনের কপাল। সত্যি ডার্লিং, কোথাও বেড়াতে গিয়ে আরামে কাটাব, তার উপায় নেই। দা ইটার্নাল মার্ডারার সবসময় আমাকে অনুসরণ করে বেড়াচ্ছে।…
লাভার্স বিচ
দুদিন ধরে ওদের এই অদ্ভুত লুকোচুরি খেলা দেখছি। ছেলেটি এসে সমুদ্রতীরে উঁচু বালি-মাটিতে ভাঙাচোরা পাথরের বাড়িগুলোর ভেতর দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর মেয়েটিকে আসতে দেখলেই লুকিয়ে পড়ে। মেয়েটি এসে তাকে খোঁজে। যেই টের পায় তার অস্তিত্ব, অমনি শুরু হয় ওই লুকোচুরি। কখনও বা উল্টোটা। আগে মেয়েটি এসে অপেক্ষা করে। তারপর ছেলেটিকে আসতে দেখলে অমনি লুকিয়ে পড়ে। একই লুকোচুরি খেলা শুরু হয়। শেষে দেখি, ঢালু পাড়ের বালিয়াড়ি ভেঙে দুজনে হাত ধরাধরি, গড়াতে-গড়াতে বিচে নামে। এবং ছেলেটি, কখনও মেয়েটি আগে দৌড়ুতে থাকে। দুর্বিনীত সামুদ্রিক বাতাসে দুজনের চুল ওড়ে। শাড়ির আঁচল খসে পড়ে। পরস্পরকে তাড়া করার ভঙ্গিতে প্রলম্বিত সংকীর্ণ বিচ ধরে কতদূর-বহুদুর ছটে চলে। তারপর শালীনতাবশে আমি বাইনোকুলার নামিয়ে ফেলি চোখ থেকে। আমি এক বৃদ্ধ মানুষ। চিরকুমার। আমার জীবনে কখনও এমনতরো ঘটনা ঘটেনি, যদিও আমার একদা ওই বয়স ছিল। চপলতা ছিল। আবেগ ছিল। উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়তে পারতুম। অথচ কখনও সে-বয়সে কোনো তরুণীর সঙ্গে এমন খেলা খেলার সুযোগ পাইনি। তাই ওদের ওই খেলাটাকে ঈর্ষাজনক এবং অদ্ভুত লাগে। কী সুখ এমন খেলায় আমি জানি না, বুঝতে পারি না।
