কর্নেল একটু হেসে বললেন–তুমি কি ভাবছ বাইনোকুলার সঙ্গে থাকলেই তাকে খুনী বলে সন্দেহ করতে হবে।
–নিশ্চয়। ওই লোকটাই তো তখন খাড়ির ধারে দাঁড়িয়ে..
কর্নেল হঠাৎ আমার হাত চেপে ধরে বললেন–চুপ। তারপর অদ্ভুত ভঙ্গিতে চোখের তারা ঘুরিয়ে ওঁর ডান-দিকটা নির্দেশ করলেন। আড়চোখে তাকিয়ে দেখি ওই টেবিলে তিনজন লোক বসে আছে। দুজন সর্দারজী, অন্য একজন ধুতিপাঞ্জাবি পরা বাঙালী ভদ্রলোক। বাঙালী ভদ্রলোকটি যে সর্দারজীদের সঙ্গে আসেননি, তা দেখামাত্র বোঝা যায়। উনি আপনমনে একটা পেন দিয়ে একটুকরো কাগজে কাটাকুটি করছেন। পাশের গ্লাসে মদ। মুখের ভাবভঙ্গি দেখেই বুঝলুম, প্রচণ্ড নেশা হয়ে গেছে। কাগজের টুকরোটা বারেরই বিল মনে হলো। তার উপরে যেভাবে কলম চালাচ্ছেন, বাঙালী যে জাত কেরানী তা নির্দ্বিধায় প্রমাণ করা যায়। আমি আর হাসি চাপতে পারলাম না।
হাসি শুনেই ভদ্রলোক মুখ তুলে তাকালেন। দেখি, উনিও গদগদ হয়ে হাসছেন। মাতালের এমন হাসি আমার পরিচিত। আমি ওঁর কাজে সায় দেবার ভঙ্গিতে মাথা দোলালুম। ভদ্রলোক শুধু মাতাল নন, রসিকও বটে। অমনি দ্বিগুণ উৎসাহে কলম চালনা শুরু করলেন এবং মাঝেমাঝে মাথা তুলে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। এমন মজা পেলে ছাড়তে ইচ্ছে করে না।
ব্যাপারটা সর্দারজীদের চোখে পড়ল এতক্ষণে। একজন ভুরু কুঁচকে অস্পষ্ট কিছু বলল। মুখে বিরক্তির চিহ্ন।
হঠাৎ কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন।–আমি একবার বেরুচ্ছি, জয়ন্ত। তুমি আমার জন্যে এখানেই অপেক্ষা করো। বার দশটা অব্দি খোলা। আমি সড়ে নটার মধ্যেই ফিরব।
আমাকে কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বেরিয়ে গেলেন উনি। আমার ক্ষোভ হলো ওঁর ওপর। কিন্তু কী আর করা যাবে? ওঁর কথামতো না চললে উনিও বড্ড বিরক্ত হবেন। বিশেষ করে খুনখারাপির তদন্তের ব্যাপারে উনি তখন অন্যমানুষ। তাই বসে থাকতে হলো।
এই অবস্থায় ভদ্রলোকের সঙ্গে ভাব না জমিয়ে উপায় নেই। নিঃসঙ্কোচে বললুম–চলে আসুন না এখানে!
ভদ্রলোক যেন সেটাই চাইছিলেন। টলতে টলতে কলম কাগজ আর গেলাস নিয়ে আমাদের টেবিলে এলেন। তারপর নমস্কার করে বললেন–বাঁচলুম। আমার নাম পরিতোষ কারফর্মা। টালিগঞ্জে কাঠগোলা আছে। মশাই যে বাঙালী, তা আঁচ করেছিলুম। কিন্তু বুঝলেন? ওই দুই সর্দারজীর ভয়ে টেবিল ছেড়ে উঠতে পারছিলুম না।
-কেন বলুন তো?
–ওদের আমি মশাই ভীষণ ভয় করি। টেবিল থেকে উঠলেই যদি মেরে বসে।
হো হো করে হেসে উঠলুম। বলুলম–একা এসেছেন নীলাপুরমে?
পরিতোষবাবু বললেন–হ্যাঁ। আমি মশাই ব্যাচেলার মানুষ। দোকা-টোকা ভালবাসিনে। আপনি?
–আমিও তাই।
বাচ্চা ছেলের মতো হি হি হেসে পরিতোষবাবু বললেন–খুব ভাল। খুব ভাল! খবর্দার স্ত্রীলোকের ছায়া মাড়াবেন না। মাড়িয়েছেন না মরেছেন। তা ব্রাদারের নামধাম?
পরিচয় দিতেই লাফিয়ে উঠে বললেন–ওরে বাবা কী আনন্দ, কী আনন্দ। তারপর হাস্যকরভঙ্গিতে শিস দিয়ে বেয়ারাকে ডাকলেন। আমার আপত্তি সত্ত্বেও হুইস্কির অর্ডার দিলেন। বললেন–আপনার মতো সঙ্গী যখন পেয়ে গেছি, আজ মশাই বারসুদ্ধ শুষে খাব।
বলুলম–উঠেছেন কোথায়?
পরিতোষবাবু ছাদ দেখিয়ে বললেন–মাথার ওপরে। এই সোয়ানেই। আপনি?
–অ্যালবাট্রসে।
–খুব ভাল, খুব ভাল।…বলে একটু ঝুঁকে চোখ নাচিয়ে জিগ্যেস করলেন ওই বুড়ো সায়েবটি কে? এখানে এসেই আলাপ হয়েছে বুঝি? আমেরিকান নয় তো? দেখবেন ব্রাদার–সি. আই. এ. ঘুরঘুর করছে সবখানে। খুব সাবধান। দেশের কোনও কথা ফাঁস করবেন না। আপনারা জার্নালিস্ট। আপনারা দেশের সব গুহ্যখবর রাখেন কি না। তাই বলছি।…
বাধা দিয়ে বললুম–না, না। উনি ভারতীয়। শুধু ভারতীয় নয়, বাঙালী।
পরিতোষবাবুর চোখের ঢেলা বেরিয়ে গেল। অ্যাঁ? উনি বাঙালী? ওরে বাবা! কী আনন্দ! কী আনন্দ! ওয়েটার। ইধার আও!..
এই আনন্দে আবার হুইস্কি এসে গেল। এমন আমুদে লোক খুব কমই দেখেছি। মেজাজ ভাল হয়ে গেল ক্রমশ। বিয়ারের পর দু পেগ হুইস্কি পেটে পড়ার ফলে নেশাও ধরে যাচ্ছিল। এর পর কীভাবে সময় কেটেছে, বলা কঠিন। যখন কর্নেল ফিরে এসে আমার কাঁধে হাত রাখলেন, তখন আমার চোখে নানারঙের খেলা ভাসছে।…
.
রাত কীভাবে কেটেছে, মনে নেই। সকালে উঠে দেখি পাশের বেডে কর্নেল নেই। মাথা ভোঁ ভোঁ করছিল। তাই স্নান করলুম। বয় এসে ব্রেকফাস্ট দিয়ে গেল। ব্রেকফাস্ট সেরে সিগারেট ধরিয়ে ব্যালকনিতে গেলুম। সকালের শান্ত সমুদ্র রোদে ঝকমক করছে। সমুদ্রের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে কর্নেল এসে গেলেন–হ্যাল্লো ডার্লিং! উঠে পড়েছ দেখছি!
একটু হেসে বললুম–মদে আমার তেমন নেশা হয় না কর্নেল!
-তাই বটে! কর্নেল মৃদু হেসে বললেন। আশা করি, তাহলে গতরাতে কীসব ঘটেছে তোমার সামনে–সব মনে আছে?
নিশ্চয় আছে।
বলে যাও, ডার্লিং।
–পরিতোষবাবু আর আমি জমিয়ে খাচ্ছিলুম। তখন আপনি এলেন। তারপর আমরা দুজনে অ্যালবাট্রসে চলে এলুম।
কর্নেল আবার হেসে উঠলেন।
-হাসছেন যে?
হাসছি। কারণ, গতরাতে তোমার প্রচণ্ড নেশা হয়েছিল।
–প্রমাণ অনেক। তোমাকে নিয়ে সাইকেল রিকশো করে ফিরে আসছি, পথে ঝোপঝাড় আর পাথরের আড়াল থেকে একটা লোক রিভলভার থেকে গুলি ছুঁড়ল। আমাদের সৌভাগ্য, রিকশোটা জোরে যাচ্ছিল তাই লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো।
