কর্নেল শুধু বললেন–আমার আর কোনও প্রশ্ন নেই। মিঃ বেঙ্কটেশ, ইউ প্রসিড।
বেঙ্কটেশ ঘড়ি দেখে বললেন মিসেস মৈত্র, আপাতত এই। আপনি ওখানে গিয়ে বসুন। মিঃ আচারিয়া, এবার ডাকুন বয় রণদীপকে।
রণদীপ বয়সে তরুণ। ঘরে ঢুকে সেলাম করার পরই তার চোখ গেল আমার দিকে। অমনি ওর ঠোঁটে বাঁকা হাসি উঠল। নির্ঘাৎ ও ব্যাটা আমাকে তখন বেরিয়ে আসতে দেখেছিল ঘর থেকে। সে দাঁড়িয়ে রইল। বেঙ্কটেশ তাকে বসতে বললেও সে বসল না। তখন একটু হেসে বেঙ্কটেশ বললেন–তুমি রণদীপ সিং?
জী হাঁ।
কতদিন সী ভিউতে এসেছ?
–তা বছর খানেক হয়ে গেল স্যার।
–গতকাল তোমার ডিউটি ছিল কখন?
–ছটা থেকে রাত একটা।
–ওই সময়ের মধ্যে মিঃ মৈত্র ছাড়া নতুন কেউ এসেছিলেন হোটেলে?
–দুজন সাহেব এসেছিলেন, ওনারা এখনও আছে। তবে রেজিস্টার দেখলেই সব মালুম হবে, স্যার।
–ঠিক বলেছ। আচ্ছা রণদীপ, ওই সময়ের মধ্যে মিঃ মৈত্রের ঘরে–মানে তের নম্বর ঘরে কাউকেও নক করতে বা ঢুকতে দেখেছিলে?
না স্যার। আমি তো হরদম করিডরেই ঘুরি।
–আজ কখন ডিউটি তোমার?
দুপুর দুটো থেকে রাত নটা অব্দি আছে, স্যার।
–এই সময়ের মধ্যে কাউকে তের নম্বরে… বাধা দিয়ে রণদীপ আমার দিকে আঙুল তুলল। ওই যে স্যার…
না। উনি ছাড়া আর কেউ ঢোকেনি?
–ঢুকেছিলেন। কিন্তু…
ওকে থামতে দেখে কর্নেল ঝুঁকে পড়লেন। জিজ্ঞেস করলেন–যিনি ঢুকেছিলেন, তাকে আর নিশ্চয় বেরোতে দেখনি? তাই না?
রণদীপের ঠোঁট কাঁপছে। সে কী বলতে চায়, অথচ পারছে না–খুব অবাক আর হতভম্ব যেন।
কর্নেল বললেন–এবং যাকে ঢুকতে দেখেছিলে, তারই লাশ বাথরুমে দেখা গেল। তাই তো রণদীপ?
রণদীপ লাফিয়ে উঠল–হ্যাঁ স্যার। তাই বটে স্যার। এতক্ষণে সেটা খেয়াল হয়নি স্যার!
ঘরে সবাই নড়ে উঠেছিল–তারপর ভীষণ স্তব্ধতা। কর্নেল শুধু বললেন–মাই গুডনেস!
তারপর শুনলুম তৃণা মৈত্র চিৎকার করে উঠল–মিথ্যা! একেবারে মিথ্যা! যে খুন হয়েছে, সেই আমার স্বামী!
তারপর দেখলুম সে অজ্ঞান হয়ে কোণার সোফা থেকে মেঝেয় পড়ে গেল। কর্নেল আমাকে ডেকে বললেন–এস জয়ন্ত। বাইরে যাই। মিঃ বেঙ্কটেশ, দরকার হলে রিং করবেন কিংবা আসতেও পারেন। ইউ আর অলওয়েজ ওয়েলকাম। অ্যালবাট্রস রুম নম্বর থ্রি। অ রিভোয়া!
.
রাস্তায় পৌঁছে কর্নেল বললেন–জয়ন্ত, কী ভাবছ?
–ভাবছি, লাশটা তবে পুলকেশ মৈত্রের নয়?
না। তৃণার স্বামীর নয়।
–কিন্তু এর মানেটা কী?
–মানে এখনও বোঝা যাচ্ছে না। মাথাটা পরিষ্কার করা দরকার। তাই ডার্লিং, চলো–আমরা একবার ওই খাড়ির উপর পাথরের চাতালে গিয়ে কিছুক্ষণ বসি। জায়গাটা ভারি চমৎকার।
— একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। বললুম–বন্দুক আর বাইনোকুলারধারী কারো পাল্লায় পড়ব না তো?
কর্নেল হেসে বললেন–তোমার দৃষ্টিবিভ্রম নয় তো জয়ন্ত?
–মোটেও না। স্পষ্ট দেখেছি একজন নীল শার্ট পরা লোক চোখে বাইনোকুলার রেখে দাঁড়িয়ে আছে। অবশ্য, তার হাতে বন্দুক দেখিনি।
পাহাড়ের ঢালুতে নামতে গিয়ে হঠাৎ কর্নেল বললেন বরং তার আগে একবার ওই দি সোয়ান নামে হোটেলটা থেকে ঘুরে আসি।
হঠাৎ ওখানে কেন?
নিছক বিয়ার খেতে। বিয়ার মদ নয়। অন্তত এ বেলা খাওয়া যাক।
দুজনে সোজা এগিয়ে সেই খাড়ির খানিকটা উত্তরে দি সোয়ান নামে ছোট্ট হোটেলের দিকে এগোলুম।
হোটেলটা বাংলোবাড়ির মতো। লাউঞ্জে তেমন ভিড় নেই। একপাশে বার। বারে ঢুকে দেখলুম যা ভিড় তা এখানেই। নীল আলোয় মৌমাছির মতো একঝাঁক মাতাল গুঞ্জন করছে। চাপা সুরে বিলিতি অর্কেস্ট্রা বাজছে। আমরা খালি টেবিল খুঁজতে খুঁজতে কোণায় চলে গেলুম। একটা টেবিলে একজন লোক একা বসে আছে। টেবিলের গ্লাসে রঙিন মদ। কর্নেল ভদ্রতা করে বললেন-বসতে পারি?
লোকটা ঘাড় নাড়ল মাত্র। তারপর গেলাসটা তুলে নিয়ে চুমুক দিল।
আমরা বসে পড়লুম। ওয়েটার আমাদের পেছন পেছন এসে দাঁড়িয়ে ছিল। কর্নেল বিয়ার দিতে বললেন। এই সময় আমার চোখে পড়ল তৃতীয় চেয়ারের ওই লোকটার কোমরের কাছে একটা বাইনোকুলার ঝুলছে। অমনি শিউরে উঠে কর্নেলের ঊরুতে চিমটি কাটলুম। কর্নেল কিন্তু গ্রাহ্যই করলেন না। নির্বিকারভাবে দাড়িতে হাত বুলোতে থাকলেন। তখন আমি লোকটাকে আরও ভাল করে লক্ষ্য করতে থাকলুম। দূর থেকে কম আলোয় দেখেছি, ভুল হতেও পারে। কিন্তু এর পোশাকও স্পষ্ট বলে দিচ্ছে পাথরের চাতালে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিই বটে। বয়স আন্দাজ পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ হবে ওর। বেশ বলিষ্ঠ চেহারা। মুখের চামড়ায় পোড়খাওয়া ভাব আছে। খাড়া নাক আর চৌকো চোয়াল দেখে সহজেই বোঝা যায় লোকটা ডানপিটে না হয়ে পারে না।
বিয়ার এসে গেল। কর্নেল বোতল থেকে গ্লাসে খানিকটা বিয়ার ঢেলে বললেন–জয়ন্ত নিশ্চয়ই এই নিরামিষ পানীয়ে সন্তুষ্ট হবে না?
কর্নেল আমার চিমটিতে সাড়া দেননি বলে ক্ষুব্ধ ছিলুম। তাই গম্ভীর হয়ে মাথাটা দোলালুম মাত্র তার মানে হ্যাঁ এবং না দুই-ই হতে পারে। কর্নেল একটু হেসে গ্লাসটা তুলে ‘চিয়ার্স’ বলে চুমুক দিলেন।
এই সময় তৃতীয় চেয়ারের লোকটা হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। তারপর বেরিয়ে গেল। তখন ব্যস্ত হয়ে চাপা গলায় বললুম–যাঃ। চলে গেল যে!
কর্নেল গ্লাসের দিকে তাকিয়ে বললেন–কে গেল, ডার্লিং?
ক্ষেপে গিয়ে বললুম–ন্যাকামি করবেন না। সেই বাইনোকুলারঅলা লোকটা এতক্ষণ দিব্যি আপনার সামনে জলজ্যান্ত বসে রইল–আমি আপনাকে চিমটি কাটলুম, অথচ গ্রাহ্য করলেন না।
