কর্নেল বললেন মিঃ বেঙ্কটেশ, একটু পরেই ব্যাকগ্রাউণ্ডটা আপনাকে জানাব। আপাতত আপনি আপনার কর্তব্য করতে থাকুন।….
.
সী ভিউয়ের গ্রাউণ্ড ফ্লোরে রিসেপশনের পিছনে ম্যানেজারের ঘর। ম্যানেজার ভদ্রলোক বাইরে গিয়েছিলেন। এসে সব দেখে শুনে অনবরত ঠক ঠক করে কাঁপছেন। ওঁর ঘরেই জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। আমার স্টেটমেন্ট ও জেরাপর্ব চুকে যাবার পর তৃণা মৈত্রকে ডাকা হলো। তখন সাড়ে ছটা। বাইরে সমুদ্র অন্ধকারে গর্জন করছে। হোটেলের সবগুলো আলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। তৃণা আস্তে আস্তে মিস আয়ারের কাঁধে হাত রেখে ঘরে ঢুকল। মিস আয়ার চলে গেলে বেঙ্কটেশ বললেন বসুন মিসেস মৈত্র। খুব দুঃখিত আমি আপনার মনের অবস্থা জেনেও আপনাকে বিব্রত করা হচ্ছে। কিন্তু এটা কর্তব্য। তাই ক্ষমা করবেন।
তৃণা বসে বলল বলুন, কী জানতে চান?
–আপনারা কবে এসেছেন এখানে?
–সে তো হোটেলের রেজিস্টারে পাবেন। গতকাল সন্ধ্যা ছটা নাগাদ।
–আপনি জয়ন্তবাবুকে বলেছিলেন, আপনার আসার পর কী সব অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। কী ঘটনা?
তৃণা একটু ভেবে নিল যেন। তারপর বলল কাল রাতে দুবার আমাদের দরজায় কে নক করেছিল। উনি দুবারই দরজা খুললেন, কিন্তু কাকেও দেখতে পেলেন না। প্রথমবার রাত ন’টায়, দ্বিতীয়বার সাড়ে দশটায়। আজ সকালে ব্যালকনিতে দুজনে দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ আমার চোখে পড়ল একটা লোক খাড়ির উপরে পাথরের চাতাল থেকে বন্দুক তাক করছে। উনিই দেখতে পেলেন। অমনি আমাকে টেনে বসে পড়লেন। সেই অবস্থায় গুঁড়ি মেরে আমরা ঘরে ঢুকলুম। উনি ভীষণ কাঁপছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করেও কোনও জবাব পেলুম না।
-বেশ। তারপর? আর কী ঘটনা ঘটল, বলুন।
নীচের ডাইনিংয়ে আজ দুজনে লাঞ্চ খেতে এসেছি, একজন বয় ওঁর হাতে একটা চিঠি গুঁজে দিল। লাউঞ্জে কে একজন তাকে নাকি দিয়েছে চিঠিটা! চিঠি পড়ে ওঁর মুখ শুকিয়ে গেল যেন। জিজ্ঞেস করলুম–কিন্তু এবারও কোনও জবাব দিলেন না। শুধু বললেন–পরে সব বলব। তারপর খুব তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া সেরে নিলেন। লাউঞ্জে গিয়ে দেখলুম-সত্যি, এক ভদ্রলোক বসে আছেন। মিঃ মৈত্র আমাকে ঘরে যেতে বলে ওই ভদ্রলোকের কাছে গেলেন। আমি আমার স্বামীর কোনও ব্যাপারে কখনও কৌতূহল প্রকাশ করিনি। কিন্তু এবার খুব উদ্বিগ্ন বোধ করছিলুম। আধঘণ্টা পরে উনি ফিরলেন। তারপর বললেন–একটু কাজে বাইরে যাচ্ছি। শীগগির ফিরব। ভেবো না। তখন প্রায় দুটো। পাঁচটা পর্যন্ত যখন ফিরলেন না, তখন উদ্বিগ্ন হয়ে বেরিয়ে পড়লুম। তারপর ওই ভদ্রলোক–জয়ন্তবাবুর সঙ্গে দেখা হলো।….
বেঙ্কটেশ হাত তুলে বললেন–এবার, আমার একটা প্রশ্নের জবাব দিন। জয়ন্তবাবুকে ঘরে বসিয়ে রেখে আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?
তৃণা মুখ তুলে নিষ্পলক তাকাল। বলল–আমাদের রুমের ইলেকট্রিক কানেকশান কাটা দেখে নীচে বলতে এসেছিলুম। কিন্তু লাউঞ্জে নেমেই চোখে পড়ল, সেই পাথরের চাতালে সকালের বন্দুকঅলা লোকটা আর কে একজন দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার চেহারা অবিকল মিঃ মৈত্রের মতো–পোশাক একই রকম। বেশ খানিকটা দূর বলে স্পষ্ট চেনা যাচ্ছিল না। তাই তক্ষুণি দৌড়ে সেদিকে গেলুম। কিন্তু আমি যেতে যেতে ওরা পাথরের আড়ালে চলে গেল। তখন কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে হোটেলে ফিরে এলুম। এসেই দেখি…
সে দুহাতে মুখ গুঁজে হু হু করে কেঁদে উঠল। বেঙ্কটেশ বললেন–প্লীজ মিসেস মৈত্র। আমাদের আরও অনেক কিছু জানবার আছে। আপনার স্বামীর হত্যাকারীকে খুঁজে বের করতে আপনার সাহায্য খুবই দরকার।
তৃণা ভেজা চোখ তুলে বলল–বলুন, আর কী জানতে চান।
–আপনার স্বামীর পেশা কী ছিল?
স্থায়ী কিছু ছিল না। খুব খেয়ালী মানুষ। নানারকম ট্রেডিং এজেন্সি নিয়ে থাকতেন। সম্প্রতি নতুন কোনও ব্যবসা করা কথা ভাবছিলেন।
এবার কর্নেল বললেন–মিসেস মৈত্র, আপনার স্বামী নীলাপুরমে কেন এলেন, আপনি নিশ্চয় জানেন।
তৃণা ঘাড় নাড়ল। জানি না। আমি কখনও ওকে প্রশ্ন করতুম না। এটা আমার স্বভাবও বটে–তাছাড়া প্রশ্ন করলেই উনি বলতেন–পরে বলব ‘খন। এবার হঠাৎ নীলাপুরমে আসবেন বললেন, তখন আমি কোনও প্রশ্ন করিনি।
আপনার স্বামীর কি কোনও শত্রু ছিল জানেন?
না। থাকলেও আমাকে বলেননি।
–আপনার স্বামীর নিশ্চয় বন্ধুবান্ধব ছিলেন?
–হ্যাঁ, তা ছিলেন বই কি। তবে উনি খুব ব্যস্ত মানুষ ছিলেন। আড্ডা দিতে ভালবাসতেন।
–খুব ঘনিষ্ঠ এমন কারও-কারও নাম নিশ্চয় বলতে পারবেন?
পুরো নাম আমি বলতে পারব না। যেমন এক ভদ্রলোক মাঝে মাঝে আমাদের কলকাতার বাসায় আসতেন। অবনীবাবু নাম। আরেকজন আসতেন তার নাম মিঃ রক্ষিত।
আপনারা কোন ট্রেনে এসেছেন হাওড়া থেকে?
তৃণা একবার ওঁর দিকে তাকিয়ে বলল–কেন?
–এমনি জিজ্ঞেস করছি।
–হাওড়া থেকে ডিরেক্ট আসা যায় না কোনও ট্রেনে।
সরি! বলে কর্নেল একটু হাসলেন। বিন্ধ্যাচল-অব্দি আসা যায়। বিন্ধ্যাচলে কখন নেমেছিলেন?
গতকাল তিনটে পাঁচটাচ হবে।
–আপনার স্বামীর সঙ্গে কারও দেখা হয়েছিল ওখানে?
তৃণা নড়ে উঠল। হ্যাঁ, হ্যাঁ। হয়েছিল। আমি ভুলে গেছি বলতে–মানে, ওই খাড়ির উপরকার চাতালে যে লোকটাকে দেখেছি, তারই সঙ্গে। বিন্ধ্যাচল স্টেশনে ওকে দেখেই উনি এগিয়ে গেলেন। আমাকে বললেন–তুমি এখানে একটু দাঁড়াও। আমি আসছি। পনের কুড়ি মিনিট লোকটার সঙ্গে কথা বলে ফিরে এলেন। তখন ওঁকে কেমন উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিল।
