শিউরে উঠে বললুম–সর্বনাশ!
–রিভলভারে তোমার আঙুলের ছাপ রয়েছে। কাজেই জজসাহেব তোমাকে অনায়াসে ফাঁসিতে ঝোলাতে পারেন।
এই অব্দি শুনেই আঁতকে উঠে বললুম–ওরে বাবা! তাই তো!
কর্নেল এবার উঠে দাঁড়ালেন। পা বাড়িয়ে বললেন–দেখা যাক কী করতে পারি!
দুজনে অ্যালবাট্রসের লাউঞ্জে ঢুকে সোজা রিসেপশনে গেলুম। তারপর কর্নেল ফোন তুলে ডায়াল করতে থাকলেন। আমি উদ্বিগ্ন মুখে কাচের দেয়ালের বাইরে সমুদ্র দেখতে থাকলুম। হঠাৎ চোখে পড়ল, বাঁদিকে দূরে সমুদ্রের খাড়ির উপর পাথরের চাতালে কে একজন দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার চোখে বাইনোকুলার। সমুদ্রের দিকে পিছু ফিরে দাঁড়িয়ে সে কী যেন দেখছে। তৃণা যাকে সী ভিউ থেকে দেখেছিল, নিশ্চয় ওই লোকটা সেই। ওখানেই তো পাহাড়ের পিঠে সী ভিউ হোটেলটা রয়েছে–এখান থেকে যদিও সেটা দেখা যাচ্ছে না। তৃণা বলেছিল– লোকটা গুলি ছুঁড়তে পারে। কিন্তু তৃণাই বা হঠাৎ উধাও হলো কেন?…।
কর্নেলের ডাকে সংবিত ফিরল। চাপাস্বরে বললুম– কর্নেল! এই দেখুন সেই লোকটা!
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন জয়ন্ত, থাক্। আর গোয়েন্দাগিরি, করতে যেও না। কেউ বাইনোকুলার দিয়ে কী দেখছে, তাতে আপাতত তোমার কিছু সুবিধে হবে না। এখন চলো, আমরা সী ভিউতে যাই। পুলিশ অফিসাররা এখনই সেখানে এসে পড়বেন।
ইতস্তত করে বললুম–কিন্তু আমার যাওয়া কি ঠিক হবে?
হ্যাঁ। তোমার গ্রেফতার হবার সম্ভাবনাটা তো আছেই।
বুক ঢিপঢিপ করতে থাকল। বললুম–তাহলে আমি বরং ঘরে গিয়ে থাকি।
–মোটেও না।…বলে কর্নেল আমার ডানহাতের কবজি চেপে ধরলেন এবং বলির পাঁঠার মতো আমাকে টানতে টানতে বেরোলেন।
আগের রাস্তা দিয়ে ঘুরে আমরা সী ভিউ পৌঁছলুম। কিন্তু এখন সেখানে অন্য দৃশ্য। ছোটখাটো একটা ভিড় জমে আছে। ভিড়টা চাপাগলায় কী সব আলোচনা করছে। মাদ্রাজী রিসেপশনিস্ট মিস আয়ার শুকনো মুখে ফোন ধরে কার সঙ্গে কথা বলছে। বেয়ারারা সিঁড়িতে হন্তদন্ত হয়ে উঠছে আর নামছে। কলে মিস আয়ারকে কিছু বলার জন্যে ঠোঁট ফাঁক করছেন, এমন সময় একজন বেয়ারা আমার দিকে আঙুল তুলে চেঁচিয়ে উঠল–এই লোকটা! এই লোকটা! মিস আয়ারও ঘুরে আমাকে দেখেই বলে উঠল-মাই গড! এই তো সেই লোক!
অমনি বেয়ারার দল তুমুল হইচই করে আমাকে ঘিরে ফেলল। দারোয়ানকেও দেখলুম এগিয়ে আসতে। আমি বিকট চেঁচিয়ে বললুম–আমি নই, আমি নই!
ভিড়সুদ্ধ পাল্টা চেঁচালো–পাকড়ো! পাকড়ো! শালা খুনীকো পাকড়া!
ভয়ে চোখ বুজে ফেললুম। মুখের সামনে অনেকগুলো হাতের মুঠো নড়ছিল। প্রচণ্ড মার আমাকে দেবেই–এই ভয়েই চোখ বুজে ফেললুম। অমনি শুনি কর্নেল তাঁর সামরিক গর্জনে সী ভিউকে যেন ফাটিয়ে দুভাগ করে ফেললেন–খবর্দার! যে যেখানে আছেন, চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকুন। যা করার, পুলিশকে করতে দিন।
মারমুখী ভিড়টা হকচকিয়ে গেল। তারপর দেখি, লন থেকে কয়েকজন পুলিশ অফিসার আর কনেস্টবল হন হন করে এগিয়ে আসছে। একজন অফিসার কর্নেলের সামনে এসেই হাত বাড়ালেন–হ্যাল্লো ওল্ড বস! এবারও দেখছি, আসামাত্র খুন খারাপি করে ফেলেছেন!
কর্নেল একটু হেসে করমর্দন করে বললেন–হ্যাঁ, মিঃ বেঙ্কটেশ! এই আমার ভাগ্য। যেখানে যাই, সেখানেই এক ইটার্নাল মার্ডারার আড়াল থেকে একটা ডেডবডি সামনে ফেলে দিয়ে তামাশা করে।
বেঙ্কটেশ বললেন–তাই বটে! চলুন, দেখি।…
বেয়ারারা আগে আগে উঠতে থাকল। তিনজন পুলিশ অফিসার, কর্নেল আর আমি তৃণা মৈত্রদের ঘরে চললুম। নীচে দুজন অফিসার আর কনেস্টবলরা রয়ে গেল। আর কাউকেও উঠতে দেওয়া হলো না।
সেই ভয়ঙ্কর ঘরে ঢুকতেই আমার দম আটকে এল। তবে একদিক থেকে আশ্বস্ত বোধ করছিলুম যে বেয়ারাদের করিডরে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওরা আমাকে ধরিয়ে দেবার জন্যে এখনও খুব ছটফট করছে নিশ্চয়। ভাগ্যিস, কর্নেল সঙ্গে আছেন।
বাথরুমে লাশটা তেমনি পড়ে আছে। কিন্তু এবার নতুন দৃশ্য চোখে পড়ল। লাশের ওপর মুখ গুঁজে উপুড় হয়ে পড়ে আছে সেই তৃণা মৈত্র। বেঙ্কটেশ ঝুঁকে ওর নাড়ি দেখে নিয়ে বললেন–শক খেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছেন। মিঃ আচারিয়া! আপনি দেখুন–ডাক্তার এলেন নাকি।
একজন অফিসার তক্ষুণি চলে গেলেন। কর্নেল ও বেঙ্কটেশ তৃণাকে সাবধানে তুলে সংলগ্ন বেডরুমের খাটে শুইয়ে দিলেন। কর্নেল বললেন–জয়ন্ত। ওই গ্লাসে জল ঢালো।
কর্নেলের হুকুম তামিল করছি, সেই সময় বাথরুমে বেঙ্কটেশের কথা শুনে চমকে উঠলুম। কী আশ্চর্য। এটা দেখছি একটা খেলনা রিভলভার।
কর্নেল বললেন–টয় রিভলভার? মাই গুডনেস!
–হ্যাঁ, কর্নেল সরকার।
–ভারি অদ্ভুত ব্যাপার তো।…বলে কর্নেল আমার হাত থেকে জলের গ্লাস নিয়ে তৃণার মুখে জলের ঝাপটা দিলেন।
একটু পরেই তৃণা চোখ খুলল। অস্বাভাবিক লাল চোখ। নিষ্পলক তাকিয়ে সে কর্নেলকে দেখল। তারপর আমাকে দেখেই আর্তনাদ করে উঠল–ওই, ওই লোকটা ওকে খুন করেছে। পুলিশ! পুলিশ!
আঁতকে উঠে বললুম–ছি ছি! কী সব যা-তা বলছেন। আপনিই তো আমাকে…..
বেঙ্কটেশ ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়েছেন। কর্নেল চোখ টিপে আমাকে থামতে ইশারা করলে আমি থেমে গেছি। তৃণা দুহাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কাঁদতে থাকল। কান্নার মধ্যে যা বলছে, তা একটু একটু বুঝতে পারছি। এখনও কেন আমাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না, এই অভিযোগ করছে সে। এতক্ষণ ভয় পাচ্ছিলুম, কিন্তু এবার রাগ এসে সাহস বাড়াল। মনে মনে বললুম–—শয়তানী, এ সবই তোমার ষড়যন্ত্র। নিজের স্বামীকে এভাবে খুন করিয়ে কারও কাঁধে চাপাবার মতলব করেছিলে। সেই মতলবে তুমি সী বীচে গিয়ে উপযুক্ত লোক খুঁজছিলে। আমিও বোকার মতো তোমার ফাঁদে ধরা দিতে এসেছিলুম। রোস, তোমার মজা দেখাচ্ছি।
