উত্তেজিত হয়ে বললুম–কেন গুলি ছুঁড়বে? ব্যাপারটা কি?
তৃণা বলল বলছি, সব বলছি। আপনি বসুন প্লীজ। একটু…একটু স্থির হতে দিন!
তার চেহারা লক্ষ্য করে ঘাবড়ে গেলুম। সে কাঁপছে, মুখটা সাদা হয়ে গেছে। টলতে টলতে সোফার কাছে এসে দাঁড়ালে বললুম–মিসেস মৈত্র! আপনি একটুও ভয় পাবেন না, অন্তত আমি থাকতে ভয় পাবার কিছু নেই। আপনি বসুন। বসে সব বলুন।
তৃণা বসল না। ভয়ার্ত মুখে আমার দিকে তাকাল শুধু।
বললুম–আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। কারণ, শুধু আমি নই–আমার সঙ্গে নীলাপুরমে যিনি এসেছেন, তার নাম আপনি শুনে থাকবেন কর্নেল নীলাদ্রি সরকার প্রখ্যাত প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটার।
তৃণা বলে উঠল–তার মানে, গোয়েন্দা?
-হ্যাঁ। অ্যালবাট্রসের লনে নিশ্চয় কোনও টাকমাথা বুড়ো ভদ্রলোককে দেখে থাকবেন! মুখে সাদা দাড়ি আছে। ইউরোপীয়ান বলে ভুল হতে পারে কিন্তু।
–যেন দেখেছিলুম!..হ্যাঁ, হা–দেখেছি।
–উনিই আমার ফ্রেণ্ড ফিলসফার অ্যাণ্ড গাইড বলতে পারেন। আপনার ভয়ের কোনও কারণ নেই। এক্ষুণি ওঁকে আমি খবর দিতে পারি। দেব?
তৃণা একটু ভেবে বলল–দেখুন, আমার মনে হচ্ছে ব্যাপারটা নিয়ে এত শীগগির হইচই করলে নিশ্চয় আমাদের কোনও ক্ষতি হবে। আপনি আগে সবটা শুনুন। তারপর যদি মনে হয়, তাকে জানানো দরকার–জানাব।
বেশ, বলুন।
তৃণা নড়ে উঠল হঠাৎ। করুণ ধরনের হাসল–ওই দেখুন! আমি কী ভীষণ অভদ্র! আমার ঘরে গেস্ট-আর আমি সব ভদ্রতা ভুলে বসেছি! এক মিনিট!
বলে সে কোণার টেবিল থেকে ফোনটা তুলল। তারপর আমার দিকে ঘুরল। মুখটা আবার ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে।
একটু বিস্মিত হয়ে বললুম–কী ব্যাপার?
ফোনটা রেখে সে ব্যস্তভাবে বলল–আশ্চর্য তো! ফোনটা ডেড।
–ডেড?
–হ্যাঁ। এক মিনিট…আমি দেখছি করিডরে বেয়ারারা কেউ আছে নাকি!
সে দরজার দিকে যাচ্ছে দেখে বললুম–কলিং বেল নেই?
–তাই তো! সরি!…বলে তৃণা কাছেই দেয়ালে সুইচ টিপল।
কোনও শব্দ শোনা গেল না। আরও কয়েকবার টিপল, তবুও না। সে আমার দিকে ফ্যাকাশে মুখে তাকাল। আমি ততক্ষণে বেশ ঘাবড়ে গেছি। বললুম–আশ্চর্য তো! আচ্ছা–দেখছি!
উঠে আলোর সুইচ টিপলুম। জ্বলল না। সেই সময় চোখে পড়ল সুইটে এয়ার কনডিশানের ব্যবস্থা আছে। হন্তদন্ত হয়ে যন্ত্রটার চাবি ঘোরাতে শুরু করলুম। কোনও সাড়া নেই। তখন ঘুরে বললুম–লোডশেডিং চলছে না তো?
তারপর দেখলুম তৃণা দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
বাইরে রোদ মুছে গেছে ততক্ষণে। ঘরের ভিতরটা ধূসর হয়ে উঠেছে। ব্যালকনির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখতে দেখতে তৃণার অপেক্ষা করতে থাকলুম। একটা রহস্যময় ঘটনার মধ্যে এসে পড়েছি, তাতে কোনও ভুল নেই। মনে মনে কর্নেলের উদ্দেশে বললুম–ওহে বৃদ্ধ ঘুঘু, তুমি সব সময় আমাকে অতি বুদ্ধিমান বলে ঠাট্টা করো। আমি গোয়েন্দা হলে নাকি বিস্তর ওলট-পালট কাণ্ড ঘটবে! এবার তুমি বসে বসে দেখবে, গোয়েন্দা হবার এবং রহস্যের পর্দা ফাঁস করবার মতো বুদ্ধি জয়ন্তের ঘিলুতে প্রচুর পরিমাণেই আছে। মাননীয় গোয়েন্দামহোদয়! অপেক্ষা করো এবং দেখ!
কিন্তু তৃণা ফিরছে না। পাঁচ মিনিটের বেশি অপেক্ষা করেও তার কোনও পাত্তা নেই। তখন উদ্বিগ্ন হয়ে পায়চারি শুরু করলুম। সেই সময় একটা আইডিয়া মাথায় এল। এখন তো তদন্তের চমৎকার সুযোগ হাতে পাওয়া গেছে। এই দম্পতির ব্যাকগ্রাউণ্ডটা জানার মতো কোনও জিনিস কি সুইটে নেই?
যেমন কথাটা মাথায় আসা, অমনি বেডরুমে ঢুকে পড়লুম। চমৎকার আধুনিক উপকরণে সাজানো ঘর। সঙ্গে টয়লেট। তার দরজাটা একটু ফাঁক হয়ে আছে। আলো খুব কম। কিন্তু ওই ফাঁকে স্পষ্ট একজোড়া জুতো-পরা পা দেখতে পেলুম। পাদুটো মেঝেয় শুয়ে থাকা মানুষের।
বুকের মধ্যে রক্ত শিসিয়ে উঠল সঙ্গে সঙ্গে। এক লাফে এগিয়ে দরজাটা পুরো ফাঁক করতেই যা দেখলুম, তাতে কাঁপুনি শুরু হয়ে গেল।
সুটপরা এক ভদ্রলোক চিত হয়ে পড়ে আছেন। কপালে দুটো রক্তাক্ত ক্ষত। একপাশে একটা রিভলভার পড়ে আছে।
ওটা মৃতদেহ তাতে কোনও ভুল নেই। প্রথমে ঝোঁকের বশে রিভলভারটা তুলে নিলুম। আচ্ছন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলুম সেটার দিকে। কেন এমন করলুম, জানি না।…
.
অ্যালবাট্রসের লনে বেঞ্চে বসে শেষ বেলায় দরদর করে ঘামছি আর কর্নেল আমাকে প্রশ্ন করে যাচ্ছেন। যন্ত্রের মতো জবাব দিচ্ছি। গোড়ায় উনি হাসছিলেন। ক্রমশ দেখলুম, ওঁর হাসিটা মিলিয়ে গেল। গম্ভীর মুখে বললেন–তাহলে রিভলভার তুমি হাতে নিয়েছিলে?
হ্যাঁ।
-কেন?
–এমনি। হঠাৎ যেন পরীক্ষা করতে ইচ্ছে হল।
–বোকার মতো কাজ করেছ ডার্লিং!
–সে তো এখন বেশ বুঝতে পারছি।
–আসার সময় করিডরে কেউ তোমাকে বেরিয়ে আসতে দেখেনি?
–সম্ভবত না।
–সম্ভবত কেন?
–তখন তো আমি ভীষণ ভয় পেয়ে পালিয়ে আসছি। খুঁটিয়ে দেখার মতো মনের অবস্থা ছিল না।
–সিঁড়িতে কারও সঙ্গে দেখা হয়েছে?
-হ্যাঁ। একজন বেয়ারার সঙ্গে। সে চায়ের ট্রে নিয়ে উঠছিল। আমার সঙ্গে তার একটু ধাক্কা লাগে।
কর্নেল আরও গম্ভীর হয়ে বললেন–রিসেপশনে মিসেস মৈত্রের সঙ্গে দেখা হয়নি বলছ। রিসেপশনিস্ট মেয়েটিকে ওঁর কথা জিজ্ঞেস করেছিলে?
না। তখন আমার মনের অবস্থা তো বুঝতেই পারছেন।
কর্নেল আপনমনে মাথা দোলালেন। তারপর বলেলেন–খুব বোকার মতো কাজ করেছ, জয়ন্ত। তুমি এমন বোকামি করবে, তা ভাবাই যায় না। পারিপার্শ্বিক এভিডেন্সে তোমাকেই খুনী সাব্যস্ত করা এখন খুবই সহজ।
