জানি না। মেঘেন মাথা দোলায়।
–গার্ডের কামরার মেঝেতে রক্ত পাওয়া গেছে মেঘেনবাবু।
মেঘেন সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড চেঁচিয়ে ওঠেনা না না! তিথি… না না!
–প্লীজ, আস্তে।
–গেট আউট! গেট আউট! চলে যান আপনি বেরিয়ে যান!….মেঘেন হাত মুঠো করে উঠে দাঁড়ায়! গলা আরও চড়িয়ে চেঁচায়–গেট আউট!
-আমার আরও প্রশ্ন আছে মেঘেনবাবু!
শাট আপ। আপনাকে আমি খুন করে ফেলব। গেট আউট ইউ ওল্ড ফুল!
বৃদ্ধ হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ান। তারপর অমায়িকভাবে নমস্কার করে চলে যান।
তিনি বাঁদিকে স্টেশনের রাস্তায় ওঠেন। থমকে দাঁড়ান হঠাৎ। তারপর ফিরে আসেন বাঁজা জমিটার ওপর এবং মেঘেনের কোয়ার্টারের সামনে দিয়ে পশ্চিমের সেই শালবনে এগিয়ে যান।
বনের ভেতরে ঢুকে ছায়ায় সেই বৃদ্ধ দু’পকেটে হাত ভরে দাঁড়িয়ে আছেন। কুকুরটা তেমনি চুপচাপ শুয়ে আছে একই জায়গায়। মেঘেন তাকিয়ে দেখে। মাথার ভিতরটা খালি, দৃষ্টিতে ক্রমশ একটা নীল চওড়া কিছু এসে আটকে থাকে। একটু পরে তিনি নেমে আসেন। তারপর বাঁদিকে ঘুরে স্টেশনে চলে যান। মেঘেন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
.
পরদিন মেঘেন স্টেশনে সকালের ডিউটিতে আছে, সেই বৃদ্ধ এলেন। স্টেশনের ভেতরে আর কেউ নেই। পশ্চিমের জানলার বাইরে কুয়োয় পুরুষ ও স্ত্রীলোকেরা জল তুলছে, কাপড় কাঁচছে, স্নান করছে। তার ওপাশে বেড়া, বেড়ার ওধারে কয়লার স্তূপ, দুটো কাক বসে আছে।
নমস্কার মেঘেনবাবু!
–আবার কী চান?
—অনেক কিছু।
কিছু বলার নেই আর।
–আছে। এক মিনিট। ..বলে তিনি পকেট থেকে একটা নোটবই বের করে পাতা ওল্টান। তারপর একটা খালি চেয়ারে বসে পড়েন। মেঘেন টেবিলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
–মেঘেনবাবু, আপনি-সরি, আপনার সঙ্গে তিথি যতক্ষণ ছিল, এমন কোনও কথা বলেছিল কি যাতে আপনার স্ত্রীর উল্লেখ ছিল?
মেঘেন তেতো মুখে বলে খুবই থাকা উচিত।
–আমি পজিটিভ উত্তর চাই, মেঘেনবাবু।
–তাহলে ছিল।
–তিথি কি মন্দিরাদেবীর দ্বারা কোনও বিপদের আশঙ্কা করেছিল?
–তাই স্বাভাবিক।
–ঠিক কী ধরনের আশঙ্কা?
–আমি অন্তর্যামী নই।
–আপনি তিথিকে নিয়ে চলে যেতে চেয়েছিলেন বলেছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে কী কিছু স্পষ্ট নির্দেশ ছিল?
তার মানে?
তার মানে-ধরুন, আপনি গিয়ে গার্ডের কামরার দরজায় নক করবেন, অথবা ডাকবেন–এমন কিছু?
–ডাকা নিরাপদ মনে করিনি! তিনবার নক করার কথা ছিল।
–দেখুন তিথির লাশ আমরা পেয়েছি।
–পেয়েছেন? মেঘেন প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে।
–হাওড়া এক্সপ্রেসের কামরায়। কিন্তু মাথাটা পাইনি।
–আমি লুকিয়ে রাখিনি। না, না!
বলছি না। মেঘেনবাবু, আপনার স্ত্রী তিথিকে খুন করেছে বলে মনে করেন?
–আমি কিছুই মনে করি না।
–কিন্তু আপনি সিওর যে আপনি নিজে তিথিকে খুন করেননি। কেমন?
না। সিওর নই। মেঘেন দৃঢ়কণ্ঠস্বরে জবাব দেয়!
–সিওর নন?
না।
বৃদ্ধ হাসেন। কয়েক সেকেণ্ড পরে বলেনতিথির পেটে বাচ্চা ছিল।
মেঘেন তাকায়। ঠোঁটে ফাঁক করে কিছু বলার জন্যে কিন্তু বলে না।
–ফোরেনসিক এক্সপার্টদের মতে তিথির মৃত্যু হয়েছে সে রাতে ঠিক বারোটা থেকে ভোর পাঁচটার মধ্যে কোনও একসময়ে। আর…আর তার দেহে সেক্সয়াল ইন্টারকোর্সের লক্ষণ স্পষ্ট পাওয়া গেছে। সেও ওইসময়ের মধ্যে ঘটেছে। মনে হয়, তিথি বাধা দিয়েছিল–পারেনি। এইতে সিদ্ধান্ত দাঁড়ায় যে কোনও পুরুষমানুষই খুনী। কিন্তু রেপ–হ্যাঁ, রেপই বলছি আপাতত-রেপ এবং খুন দুটো আলাদা ঘটনা হওয়া সম্ভব, অর্থাৎ যে খুন করেছে–সেই রেপ করেছে–এটা ঠিক হতেও পারে।
মেঘেন আবার ঠোঁট ফাঁক করে। কিন্তু কিছু বলে না।
গতকাল অন্তত দুপুরের মধ্যে এসব জানা গেলে আপনাকে আমরা নিয়ে যেতুম এবং মেডিক্যাল একজামিন করা হতো। কিন্তু টু লেট!
–আমি তিথির সঙ্গে শুইনি। সে প্রশ্নই ওঠে না। কারণ আমরা চলে যেতে চেয়েছিলুম। তারও কারণ তিথি রথীনবাবুর নির্বাচিত বিগ অফিসারকে ফেলে সামান্য একজন এ. এস. এমের ঘর করবে–যার একটি বিবাহিতা স্ত্রীও রয়েছে, এটা রথীনবাবু বরদাস্ত করতেন না। আর মন্দিরা……
বলুন। মন্দিরা….
–মন্দিরাও তা বরদাস্ত করত না। তাছাড়া আইনও সইত না।
–তাই নিরুদ্দিষ্ট হতে চেয়েছিলেন দুজনে?
হুঁ।
–মেঘেনবাবু, আমাদের ধারণা, তিথির মুণ্ডুটা সম্ভবত বাক্সে ধরাতে পারেনি খুনী। তিথির মাথায় নাকি প্রচুর চুল ছিল। ওঁর মা বলছিলেন-বংশের ধারা।
-হ্যাঁ। খুব ঘন আর সুন্দর চুল ছিল ওর। ওতেই ওকে সুন্দর লাগত। নয়তো স্বাস্থ্য বা দেহের দিক থেকে মন্দিরার চেয়ে অনেক কুৎসিত ছিল তিথি।
–আপনি স্বাভাবিক হয়েছেন দেখে খুশি হলুম।
–তিথির আর এক সৌন্দর্য ছিল ওর অস্ফুট কণ্ঠস্বর। অর্ধেক বলা অর্ধেক না বলা কথা ওকে রহস্যময়ী করে রাখত। ওর শরীরে শরীর রাখলে ও ছটফট করতবারবার না না না বলত, কিন্তু ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিত না, বারবার বলত– এ তুমি কী করছকী করছ তুমি–কেন এমন করছ….
–মেঘেনবাবু, আবার ধন্যবাদ যে আপনি এখন এত স্বাভাবিক।
হঠাৎ মেঘেন পকেটে হাত ভরে একটা মোড়ক বের করে। ব্যগ্রস্বরে বলে– খুলে দেখুন। এর মধ্যে তিথির কয়েক গোছা চুল আছে।
সে ব্যস্ত হয়ে মোড়ক খোলে। বৃদ্ধ শান্ত মুখে বলেন আই সি! কোথায় এ চুল পেলেন মেঘেনবাবু?
কাল ভোরে ওই শালবনের তলায়। শুকনো ঘাসে। তারপর….
