–হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলুন।
–আমি একখানে মাটির চাবড়া দেখলুম। কী খেয়াল হলো, সরালুম–দেখি তিথির মাথা! মাথাটা তুলে নিয়ে একদৌড়ে জঙ্গলে ঢুকলুম। ওদিকে একটা জলনিকাশী ন্যাচারাল ড্রেন আছে–রেল ব্রিজ আছে না? তার ষাট-সত্তর মিটার পুব-দক্ষিণে শুকনো বালির তলায় পুঁতে ছিলুম। তারপর ফিরে এসে শালবনের সেই গর্তটা বুজিয়ে দিলুম। কাঠকুটো কুড়িয়ে ছড়ালুম। খুব স্বাভাবিক দেখাল জায়গাটা।
বলে যান, প্লীজ।
কাল বিকেলে গিয়ে দেখি, তিথির মাথাটা জন্তুজানোয়ারে তুলে কোথায় নিয়ে গেছে। কিছু চিহ্ন পড়ে ছিল। আবার বালিতে ঢেলে দিলুম।
–কেন এমন করলেন?
মন্দিরার স্বার্থে।
–তাহলে মন্দিরাদেবীই খুন করেছেন–আপনার মতে?
কী? ও-হ্যাঁ। তাই মনে হয়।
–আপনার স্টেটমেন্ট অনুসারে মন্দিরাদেবীকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারে।
–ও! তাই বুঝি? কিন্তু…..আপনি কে? কে আপনি?
–মেঘেনবাবু, মন্দিরাদেবীকে এইমাত্র বিরক্ত করে এসেছি। তিনি অনেক কিছু বলেছেন।
-অ্যাঁ?
হ্যাঁ। উনি সব জানতে পেরেছিলেন। আপনাদের ফলো করে সেই গার্ডের কামরায় গিয়েছিলেন। রাত বারোটার পর আপনি কোয়ার্টারে আসার একটু আগেও উনি ওখানে লুকিয়ে ছিলেন। আপনি চলে এলে কিছুক্ষণ পরে উনি তিথির দরজায় তিনবার নক করেন। দরজা খোলে তিথি। পরস্পর তীব্র বচসা হয়। কিন্তু মন্দিরার কথামতো–সেটা কান্নায় শেষ হয়। শেষে নাকি মন্দিরা আত্মহত্যার ভয় দেখিয়ে চলে আসেন। আসার পথে রামুর সঙ্গে ওঁর দেখা হয়। রামু ওখানে নাকি পায়খানায় গিয়েছিল। রামুকে ডাকুন না, প্লীজ।
রামু কাল বিকেলে ছুটি নিয়ে জংশনে গেছে। এখনও ফেরেনি। অথচ গতরাতেই ফেরার কথা ছিল। মোহনপুর বলছে, রামুকে কেউ দেখেনি সেখানে।
রামুর কথা আপাতত তাহলে থাক। আপনি নিজের কথা বলুন।
সবই তো বললুম—
–একটা ভাইটাল কথা এখনও বলেননি।
কী?
-রাত এগারোটা পাঁচের ডাউনে মোহনপুর জংশন থেকে একজন নামেন সে রাতে। তার কথা এড়িয়ে গেছেন।
অ্যাঁ! হ্যাঁ–তিথির বাবা নেমেছিলেন।
–আপনি তখন…..
–আমি তখন তিথির শতরঞ্জি বিছানা হাতে রামুর কোয়ার্টার থেকে বেরচ্ছি সবে–পিছনে তিথি আছে, প্ল্যাটফর্মে দেখতে পেলুম রথীনবাবুকে; তক্ষুনি আমরা চলে গেলুম মাঠের দিকে। ফিরে আসার পর রথীনবাবুকে আর দেখতে পাইনি।
–মিথ্যা বলছেন মেঘেনবাবু! গিরিধারী খালাসি আপনাকে ও রথীনবাবুকে কথা বলতে দেখেছিল।
–ও, হ্যাঁ। মনে পড়ছে।
-রাত একটায় রথীনবাবু আপ-সিগনালের দিকে যান। হাতে টর্চ ছিল! গিরিধারী যেতে চেয়েছিল সঙ্গে। ধমক দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর গিরিধারী দেখেছে, রামু হাঁফাতে হাঁফাতে দৌড়ে এসে তার কোয়ার্টারে ঢুকল। তার আগে গিরিধারী মেয়েলি গলায় একটা চিৎকার শুনেছিল দূরে।
রামু কি…..
আমার সিদ্ধান্ত, রামুই রেপ করে তিথিকে।
–স্কাউড্রেল!
-চুপ! আস্তে। গিরিধারী তার একঘণ্টা পরে রথীনবাবুকে ফিরতে দেখে। রথীনবাবু তাকে একটা জিনিস আনতে বলেন।
-ওঃ! একটা বাক্স।
–গিরিধারী সব কবুল করেছে, মেঘেনবাবু।
–কে খুন করেছে তিথিকে?
–ওর বাবা।
–ওঃ তিথি!
–আমার কাজ আপাতত শেষ! শুধু ভয় হচ্ছে, হয়তো রামুকেও…।
–ঠিক এসময় দুজন পুলিশ অফিসার হন্তদন্ত ঢোকেনকর্নেল! লাশটা পাওয়া গেছে। ওই মাঠের নালায় পোঁতা ছিল। স্ট্যাবড বডি। ধস্তাধস্তি হয়েছিল সম্ভবত।
মেঘেন ভারি গলায় বলে রামুর লাশ!
দাড়িওলা বৃদ্ধ একটু হাসেন।-হ্যাঁ, রামুর। রথীনবাবু মেয়েকে খুন করলেন। আর আপনি–মেঘেনবাবু, আপনি করলেন রামুকে। মিঃ ভদ্র, হেয়ার ইজ দা সেকেণ্ড মার্ডারার।
মেঘেনের সামনে পুলিশ অফিসার এসে দাঁড়ায়।
ফাঁদ
এ সমুদ্রে অ্যালবাট্রস পাখি নেই। তবু একটা রেস্তোঁরা-কাম-বারের নাম অ্যালবাট্রস। ভারতের পূর্ব-উপকূলে এমন চমৎকার মিষ্টি স্বভাবের টাউনশিপই বা কটা আছে? সমুদ্রও এখানে বেশ শান্ত। মার্চের দক্ষিণবায়ু দুপুরের দিকে দাপাদাপি করলেও বিকেলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ঢেউগুলো খুব আড়ষ্ট হয়ে বালির বীচে শুয়ে পড়তে চাইছে। আমার জুতোর তলা একটুখানি ভিজে যাচ্ছিল। এটাই আমাকে সমুদ্রস্নানের আনন্দ দিল। আমার বৃদ্ধ সঙ্গী বলেন, অনেকের অনেকরকম আতঙ্ক থাকে। যেমন বেড়ালের জলাতঙ্ক। জানি, উনি আমাকেই ঠাট্টা করেন। কিন্তু স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, সমুদ্র যতই শান্ত হোক, সমুদ্র হচ্ছে সমুদ্রই। তার জল লোনা, বিশ্রী রকমের স্বাদ তার। আত্মহত্যার দরকার না হলে কখনও আমি সমুদ্রে নামব না।
যতক্ষণ বীচে জলের ধার ছুঁয়ে ছুঁয়ে হেঁটে বেড়ালুম, আড়চোখে লক্ষ্য করে গেলুম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার টুপি খুলে অ্যালবাট্রসের লনে বসে আছেন। তাঁর টাকের ওপর নারকেল গাছের ছায়ার ফাঁক দিয়ে রোদের চিরুনি চলছে–অবশ্য বৃথাই। উনি খুবই আলাপী, সদালাপী এবং গায়েপড়া–তা সত্ত্বেও এখনও কোনও আগন্তুক ওঁর পাশে বসে নেই। এতদিন বাদে ওঁকে দারুণ একলা দেখাচ্ছিল। আমার মায়া জাগছিল।
পিছনে পাহাড়ের আড়ালে সূর্য নেমে গেলে সমুদ্রে এতক্ষণে রঙের খেলা শুরু হলো। এই দৃশ্যের বর্ণনা ভাষায় দেওয়া যায় না, ছবি এঁকে খানিকটা যা অনুসরণ করা যায়। আমি না লেখক, না ছবি আঁকিয়ে–নিতান্ত সাংবাদিক। এই ব্যাপারটার রিপোর্টাজ লিখতে হলে আমার চাকরি রাখা কঠিনই হতো। আমি রিপোর্টার। আমার চিফ বলেন, জয়ন্তের মেটিরিয়াল থাকে–কলম থাকে না এবং এটাই হচ্ছে ট্রাজেডি।
