কোয়ার্টারের পিছনদিক এটা। বেড়ায় ঘেরা একটুকরো সবজিক্ষেত বা বাগিচার জন্য জমি আছে। এদিকে কারও আসার কথা নয়।
-নমস্কার। আপনি কি মেঘেনবাবু?
মেঘেন পাল্টা নমস্কার করে বাঁ হাতে, কারণ ডানহাতে চায়ের পেয়ালা।
–আমি মোহনপুর জংশন থেকে আসছি।
বলুন?
বৃদ্ধ কপালের ঘাম মুছতে মুছতে হাসেন।বসব। না বসে তো বলা যায় না।
মেঘেন হন্তদন্ত হয়ে ওঠে। আসুন, আসুন! খালি মোড়াটার দিকে আঙুল বাড়ায় সে। বেড়ার গেট দিয়ে লোকটা ঢোকে। মোড়ায় বসে পড়ে। হাসিমুখে তাকিয়ে বলে–কাল ইভনিং-এ কখন থেকে কখন অব্দি ডিউটি ছিল আপনার?
-কেন বলুন তো? বিকেল পাঁচ থেকে রাত বারোটা।
বরমডিহি তো খুব বড় স্টেশন নয়।
নয়। কেন বলুন তো?
–আপনার দেশ কোথায়?
পশ্চিমবঙ্গ। বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ। কেন ব…..
এখানে ছমাস এসেছেন?
–হ্যাঁ কিন্তু কেন……..
এর আগে মোহনপুরে ছিলেন?
–ছিলুম। কে…….
–মোহনপুরের ডিভিসনাল সুপারিন্টেন্টে রথীনবাবুও তো বহরমপুরের লোক?
–আজ্ঞে হ্যাঁ। কিন্তু…..
রথীনবাবুর মেয়ে তিথিকে তো চেনেন?
–চিনি। কী ব্যা…….
–গতকাল সন্ধ্যা সাতটা ত্রিশের ডাউন ঠিক ক’টায় ইন্ করেছিল মেঘেনবাবু?
-সাতটা সাঁইত্রিশে। আগের স্টেশনে মেল পাস ক…
–তিথি নেমেছিল স্টেশনে?
এ্যাঁ? তি… … …।
দরজায় মন্দিরা এসে দাঁড়িয়েছিল। প্রথমে চোখ দুটো বড় ছিল। তারপর ছোট হয়েছে, ভুরু কুঁচকে গেছে, ঠোঁটের নিচে ভাজ ফুটেছে–যা তাকে সুন্দর করে। সে মুখ খোলে।
আপনি কে?
বৃদ্ধ অমনি নমস্কার করেন তাকে। আপনি মিসেস মন্দিরা বোস?
–হ্যাঁ! আপনি কে?
–আপনি ভাগলপুরের মেয়ে?
–সবই তো জানেন দেখছি? আমার বলা কেন? কে আপনি শুনি?
–গত মাসের এগারো তারিখে আপনি নারায়ণগড় মন্দিরে যাচ্ছি বলে মোহনপুরে গিয়েছিলেন?
মন্দিরা লাল মুখে প্রায় গর্জায়। হ্যাঁ, গিছলুম। কিন্তু তাতে আপনার এত মাথাব্যথার কী আছে? আগে বলুন তো, কে আপনি–নয়তো…রাগে সে কথা হারিয়ে ফেলে।
বৃদ্ধ মিটিমিটি হাসেনা হাত তুলে বলেন–প্লীজ! প্লীজ! আচ্ছা, মন্দিরাদেবী, আপনি সেদিন তিথিকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন? হ্যাঁ কিংবা না বলুন, প্লীজ!
বলব না।
–প্লীজ!
না! চলে, যান আপনি! এখুনি চলে যান। নয়তো লোক ডাকব!..মন্দিরা হাঁফাতে হাঁফাতে কথা বলে। তারপর মেঘেনের দিকে ঘোরে। তুমি চুপচাপ এই অপমান হজম করছ? একটা কোথাকার কে এসে যা খুশি জিগ্যেস করবে বাড়ি চড়াও হয়ে, তার জবাব দিতে হবে? কী–ভেবেছে কী? মগের মুলুক?
মেঘেন গম্ভীর ও অপ্রস্তুত হয়ে থাকে। বৃদ্ধ হাসতে হাসতে বলেন–ভীষণ রেগে গেলেন দেখছি! প্লীজ, শান্ত হোন। আচ্ছা মেঘেনবাবু!
–উ?
–আপনার স্ত্রী গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে বাসায় ছিলেন? নাকি বেরিয়েছিলেন–আপনার কী ধারণা?
–ওকে জিগ্যেস করুন!
–আপনার ধারণাটাই আমি জানতে চাই।
হয়তো….
বলুন! বলুন!
–হয়তো ছিল, হয়তো বেরিয়েছিল। জানি না।
–তিথির সঙ্গে কথা বলতে বলতে আপনি মাঠের দিকে গিয়েছিলেন তাই না?
মন্দিরা চেঁচাল। –কোনও কথা না! চুপ করে থাকো!
–মেঘেনবাবু!
–উ? হুঁ। তিথি আমাকে জরুরি কিছু কথা আছে বলে ডেকে নিয়ে গেল।
তারপর?
–কিন্তু তেমন কিছু বলল না। শুধু…
–! বলুন!
রাতকাটানোর আশ্রয় চাইল। বলল বাড়ি থেকে চলে এসেছে! আর ফিরবে না।
–আপনি কী করলেন তখন?
–আমি বললুম– আমার বাসায় তো অসম্ভব! তবে রামু সিগন্যালম্যানের কোয়ার্টার এখন খালি আছে। তিথি আপত্তি করল। তখন আমি ওই যে দেখছেন জঙ্গলের ওপাশে লাইনের ওপর খালি একটা ওয়াগনের সঙ্গে গার্ডের কামরা রয়েছে–ওইযে!
–হ্যাঁ। দেখতে পাচ্ছি।
ওটাই সিলেক্ট করলুম। রামুকে কিছু খাবার তৈরি করে দিতে বলেছিলুম। তিথি তা খায়নি। বিছানার তেমন ব্যবস্থা হলো না। একটা মাত্র শতরঞ্জি দিল রামু। একটা বাড়তি লণ্ঠন দিল।…মেঘেন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
বাসায় ফিরেছিলেন ঠিক কটায়?
–একটা প্রায়।
–তখন আপনার স্ত্রী ছিলেন?
মেঘেন মন্দিরার দিকে তাকাল। মন্দিরা মুখ ঘুরিয়ে মাঠ দেখছে। নাকের ফুটো কাঁপছে। চোখ দুটো লাল। চাপা শ্বাসপ্রশ্বাস ফেলছে।
মেঘেন বলেনা। তারপরই মাথাটা কয়েকবার দোলায়।
আপনার নিশ্চয়ই বাকি রাত ঘুম হয়নি?
হয়নি। জেগেই ছিলুম। কারণ রাত তিনটে চল্লিশের ডাউনে…
–থামবেন না, প্লীজ।
রাত ৩-৪০-এর ডাউনে কলকাতা যাবার কথা ছিল! তিথির সঙ্গে।
মন্দিরা চকিতে মেঘেনকে দেখে নিয়ে আবার মাঠের দিকে ঘুরল। বিশাল ঢেউ খেলানো মাঠ–শস্যহীন, বেশির ভাগই অনুর্বর রুক্ষ মাটি, দুরে টিলার সার এবং খড়কুটো উড়িয়ে ছোটখাট ঘূর্ণি হাওয়া চলেছে কোনাকুনি। কাছাকাছি ফণিমনসার ঝোপের গায়ে একটা সাপের খোলস উড়ছে, এক ফালি পতাকা যেন।
–কিন্তু শেষঅব্দি যাওয়া হলো না?
না। হলো না। মন্দিরা–আমার স্ত্রী আমাকে আঁকড়ে ধরে ঘুমোচ্ছিল।
একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরা সাঁৎ করে ভেতরে চলে গেল। তারপর কয়েকটা সেকেণ্ড বারান্দায় স্তব্ধতা। পাখির ডাকও স্তব্ধতা বলে ভুল হয়। তারপর মাঠ থেকে ঘূর্ণি নিয়ে একটা বাতাস এসে বারান্দায় উঠল। দরজার পর্দা দুলিয়ে ঢুকে গেল ঘরে।
কখন উঠলেন মেঘেনবাবু?
–সাতটার কাছাকাছি।
–সেই গার্ডের কামরায় গেলেন না?
না।
–কোথাও গেলেন না?
গেলুম। ওই শালবনটায়। রোজ ভোরে ওখানে বেড়ানো অভ্যাস আছে। এক মিনিট স্তব্ধতা। তারপর…–তিথি কোথায় মেঘেনবাবু?
