যন্ত্রের মতো গুঁফো সেনকে নমস্কারের জবাব দিলুম। সে বলল–আপনি হাওড়ায় আমাকে জিগ্যেস করলেন চন্দনপুর এক্সপ্রেস কোন প্লাটফর্মে? মনে পড়ছে?
না তো।
গুঁফো সেন হাসল–তখন অত লক্ষ করার মুড ছিল না আপনার।
কর্নেল বললেন–তাহলে এগোনো যাক্। আসুন গৌতমবাবু, আপনার কিছুক্ষণের সঙ্গিনীকে এবার অন্যরূপে দেখবেন আসুন।
আমি করজোড়ে বললুম–ক্ষমা করবেন কর্নেল।
–কিন্তু আপনাকে এখন পুলিশের দরকার হবে স্যার। গুঁফো সবিনয়ে বলল।–এবার আপনাকে আগাগোড়া একটা স্টেটমেন্ট দিতে হবে যে।
–ঠিক আছে, দেব। চলুন–। কিন্তু ওই শয়তানীর সামনে নয়–নেভার।
ওঁরা দুজনে হেসে উঠলেন। সুটকেসটা তুলে নিয়ে ভারি পা দুটো কোনও ভাবে টেনে নিয়ে চললুম। যেতে যেতে গুঁফো সেন বলল–গত রাত্রে আর এক মিনিট আগে ওপরে গেলে হতভাগিনী রাখীকে বাঁচাতে পারতুম। আমি ব্যাপারটা এভাবে দেখিনিজানেন? অর্থাৎ রাখীই যে আপনার সত্যিকার প্রেমিকা এবং সে এতদূর চলে এসেছে, জানতুম না। কীভাবে জানব বলুন? শুধু নির্দেশ আছে রমা যেখানে যাচ্ছে ওকে ফলো করতে হবে। এটা কর্তাদের স্ট্যাণ্ডিং নির্দেশ। তাই বরাবর হোস্টেলের দিকে আমাদের লক্ষ রাখতে হয়েছে চব্বিশ ঘণ্টা। হাওড়া স্টেশনে এসে আপনার সঙ্গে রমাকে দেখে ভাবলুম নিশ্চয় বড় শিকারে যাওয়া হচ্ছে। আপনাকেও ভাবলুম কোনও বড় মাল। সাহিত্যিক গৌতম চৌধুরী যে আপনি, কেমন করে জানব? পরে জেভিয়ার্স লজে এসে জানলুম। তখন আরও শিউরে উঠলুম। সর্বনাশ, নিরীহ শিল্পী ভদ্রলোককে শয়তানী ফাঁদে ফেলেছে যে। সাবধান করার স্কোপ পেলুম না।
গুঁফো সেন অনর্গল বকবক করতে করতে একটা জিপের সামনে দাঁড়াল। দেখলুম পুলিশের জিপ। উঠে বসলুম তিনজনে। জিপটা স্টার্ট দিল।
আমাদের আগে-আগে একটা কালো প্রিজনভ্যান যাচ্ছিল। জানি, ওর মধ্যে সেই রহস্যময়ী যুবতীটি খাঁচায় বন্দী বাঘিনীর মতো ছটফট করছে। এখন তো আমি ওর কেউ নই। সামনে গেলে মাংস ছিঁড়ে খাবে। এখন আমি ওর ঘোর শত্রু।
বাঁকের মুখে সমুদ্র দেখা দিল। সেই সমুদ্রবর্ষার দুরন্ত উচ্ছ্বাসে বিক্ষুব্ধ। এখন তাকে মনে হলো না প্রেমের আবেগে চঞ্চল হয়েছে। মনে হলো প্রচণ্ড দুঃখে ক্রোধে কান্নায় ফেটে পড়ছে। চোখে জল এসে গেল। রুমাল চাপলুম।
প্রেম, হত্যা এবং কর্নেল
বারান্দা থেকে কয়েক একর পাথুরে জমির ওধারে কয়েকটা শালগাছ আছে। দুটো কুকুর ভোরবেলা থেকে শালগাছ ঘিরে খুব খেলা জমিয়েছিল। তারপর একটা মাটি শুঁকতে শুঁকতে স্টেশনের দিকে চলে গেছে। অন্যটা মদ্দা, একটা কিছু আঁচ করে দাঁড়িয়ে থেকেছে মুখ তুলে–যেন গন্ধ শুঁকেছে কিছু। তারপর দু-পা সামনে ছড়িয়ে থাবায় চিবুক রেখে টানটান বসে আছে। ওর গায়ে আস্তে আস্তে একটা ছায়া সেঁটে যায়। সাদা কুকুরটা ধূসর হয়ে বস্তুজগতের সঙ্গে ওতোগোতভাবে সংলগ্ন হয় এবং স্তব্ধতায় গুপ্ত থাকে।
মেঘেন–বরমডিহি স্টেশনের রেলবাবু মেঘে লাল বোস, তার লাল কোয়ার্টার থেকে সকালের অবসরে সবুজ বনের খেলা দেখছিল। সাদা কুকুরটা শুলে সে বারান্দা থেকে নামল। খানিক দূরে গিয়ে একটুকরো পাথর ছুঁড়ল। কুকুরটা মুখ ঘুরিয়ে দাঁত বের করল। দ্বিতীয়বার মেঘেন পাথর তুললে সে গরগর করে তেড়ে এল। মেঘেন পিছিয়ে আসে।
বারান্দা থেকে মন্দিরা চেঁচায় কী হচ্ছে ওখানে? ওর পিছনে লাগলে কেন?
মেঘেনও ঘুরে দাঁত বের করে–অর্থাৎ হাসে।
–পাগলা কুকুর ওটা। শীগগির চলে এস।
স্ত্রীলোকের ইনটুইশান। মেঘেন ভাবে। কিন্তু পাগলা কুকুর কি সঙ্গিনী নিয়ে। খেলে? কে জানে! পৃথিবীর অনেক ব্যাপারের অনেকটাই মানুষের জানা হয় না। জানা যায় না। প্রাণীজগতটা তো মনে হয় একেকটি দুরুহ কোডে ভরা জিনপুঞ্জসমন্বিত দুয়ে ক্রোমোসোম নিয়ে তৈরি। তার মধ্যে মানুষ বিশেষত স্ত্রীলোক, যাদের রামকৃষ্ণদেব বলতেন, প্রকৃতির অংশ। অংশ কেন–হাতের পুতুল। কী করে কী বলে নিজেরাও বোঝে না। যেমন মন্দিরা। কেন সে সারারাত মেঘেনের পিঠ আঁকড়ে শুয়ে থেকেছে, কে বলবে? পিঠটা আয়নায় দেখেছে সে, নখের চেরা লাল দাগ পড়ে গেছে। কারও কারও নখে নাকি বিষ থাকে। মন্দিরার নেই তো?
জামার ভেতর হাত চালিয়ে পিঠের দাগটা ছুঁতে-ছুঁতে মেঘেন বারান্দার সামনে রোদ্দুরেই দাঁড়িয়ে যায়। চৈত্রের আকাশ এই এলাকায় এত নীল কখনও সে দেখেনি। ঈশানকোণে কয়েকটা পাখি বিন্দুর মতো নড়ছে। শকুন নাকি? মেঘেনের চোখ নিস্পলক হয়ে ওঠে।
মন্দিরা সকালের স্নান সেরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। কী ভাবছে সে হয়তো নিজেও জানে না। খুব পবিত্রতা দিয়ে নিজেকে ঢেকে রেখেছে, এমনি শান্ত অবস্থিতি। মেঘেনের মনে মন্দিরা, চোখে দূরের কয়েকটা সাংঘাতিক বিন্দু অবশেষে সে বড় করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
–রোদ্দুরে কী করছ? চলে এস।
মন্দিরার গলাটাও এখন পবিত্র, স্নেহে ভিজে, শান্ত। মেঘেনের ভাল লাগে ডাকটা। অনেকদিন এমন করে সে যেন ডাকেইনি।
একটু পরে মেঘেন বারান্দায় বসে যখন চা খাচ্ছে, ফাদার খ্রিস্টমাস চেহারার বৃদ্ধ এক ভদ্রলোক এলেন। বয়স মেঘেনের বাবার সমান মনে হয়। কিন্তু টাক পড়েছে মাথায়। খাড়া নাক, চাপ চাপ সাদা দাড়ি, বড় বড় কান, চওড়া কপালে তিনটে ভঁজ! মেঘেন ফ্যালফ্যাল করে তাকায়।
