দ্রুত ওয়েটিং রুমে গিয়ে ঢুকলুম। কিন্তু রাখী কোথায়? প্রায় দৌড়ে গিয়ে দেখি শুধু আমার সুটকেসটা পড়ে আছে–আমার মগজ খালি হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। মাথা ঘুরতে লাগল। পাশের টেবিল ধরে সামলে নিলুম। তারপর চারদিকে ঘুরে ঘটনাটা বাস্তব কি না টের পেতে চাইলুম।
সেই সময় দরজায় দেখা গেল কর্নেলকে। মুখে স্বভাবসিদ্ধ হাসি বুডোর। গা জ্বলে যাচ্ছিল। কাছে এসে বাও করে বললেন–গুডমর্নিং মাই ডিয়ার চৌধুরী। তাহলে সত্যি সত্যি চন্দনপুর ছেড়ে চললেন? আপনার স্ত্রী কোথায়?
হঠাৎ আমার সব উত্তেজনা ঝিমিয়ে গেল। বললুম– কর্নেল, আমি হয়তো ভুল করেছিলুম কোথাও কিছু সাংঘাতিক একটা ভুল ঘটেছে। আমার ইনটুইশন বলছে একথা! রিয়্যালি কর্নেল–আমি যেন বড্ড ঠকে গেছি।
কর্নেল আমাকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে হাত তুলে বললেন–নেভার মাইণ্ড গৌতমবাবু! আপনারা সাহিত্যিকরা বড্ড আবেগপ্রবণ এবং বেহিসেবী মানুষ। তাই এটা স্বাভাবিক। তবে দুশ্চিন্তা করে লাভ নেই–পস্তেও ফল হবে না। স্টেশনটা পুলিস ঘিরে ফেলেছে। আপনার জাল প্রেমিকা পালাতে পারবে না।
চমকে উঠে বললুম–জাল প্রেমিকা মানে?
-মানে রমা রায়!
–কিন্তু রমা রায় তো মৃত!
না গৌতমবাবু, যে সমুদ্রের জলে পড়ে মারা গেছে সেই হচ্ছে খাঁটি রাখী–আপনার সত্যিকার প্রেমিকা–মানে, সরি। পাঠিকা–গুণমুগ্ধা পাঠিকা।
–আমি কিছু বুঝতে পারছি না কর্নেল।
–খুবই সহজ। বহরমপুর গার্লস স্কুলের দুই শিক্ষিকা–একজন রমা রায়– কুখ্যাত ডাকাতের উইডো, অন্যজন রাখী মিত্র-সরলমনা কালচার্ড মেয়ে। কিন্তু যেভাবে হোক, দুজনের মধ্যে ভাব ছিল। এমন কি বিশ্বাস করে রাখী রমাকে আপনার সব চিঠিই দেখিয়ে থাকবে। এসব কিন্তু হাইপথিসিস। এখনও বাস্তবে প্রমাণিত হয়নি। তবে আমার সিদ্ধান্ত প্রায়ই ভুল হয় না। যাই হোক, রমার লক্ষ ছিল মিসেস জেভিয়ারের নেকলেসটার প্রতি। একদা এখানে এসে, হয়তো তার স্বামীও সঙ্গে ছিল-ওটার খবর পেয়ে যায়। কিন্তু কোনও সুযোগ পায়নি। অথচ ওটার কথা ভোলেনি রমা। এবার সে একটা চান্স নিল। রাখীকে সেই সম্ভবত প্ররোচনা দিল চন্দনপুরে বেড়াতে যেতে-সাজতে হবে গৌতম চৌধুরীর স্ত্রী। তাই পুলিস বা কেউ ভুলেও সন্দেহ করবে না। এবার একটা প্রশ্ন করি। আপনি রাখীকে বহরমপুরে কোন ট্রেন ধরতে বলেছিলেন?
-পাঁচটা পাঁচের। ভোরে। পরের ট্রেন ছটা তেইশে। ওটাতেও হাওড়া এসে চন্দনপুরের ট্রেন ধরা যায়–তবে লেট করলে যায় না। তাই প্রথম ট্রেনেই আসতে বলেছিলুম।
–হুঁম্! রেডিও মেসেজে বহরমপুর পুলিসের পাওয়া তথ্য শুনুন। স্কুলে দুজনেই ছুটি নেয়। ওইদিন সাড়ে পাঁচটায় হোস্টেলে রমাদের ঘরের দরজায় ধাক্কার শব্দ শুনে অন্য ঘরের একটি মেয়ে দেখে ভিতরে রাখী বন্দী। বাইরে কেউ শেকল তুলে দিয়েছে। ঘরে রমা ছিল না। রাখী তখন সেজেগুজে বেরিয়ে যায়। বলে– কলকাতা যাচ্ছে কথামতো। রাখী তাহলে বোধহয় ছটা তেইশের ট্রেন ধরেছিল। ট্রেনটা হয়তো লেট করেনি। ফলে আপনাদের দেখে থাকবে। অভিমান হওয়া স্বাভাবিক। সে চন্দনপুরের ট্রেনে চেপে বসেছিল। কোনও এক সুযোগে ব্যাপারটা ফাঁস করে দেবার ইচ্ছে নিশ্চয় ছিল–আপনার সঙ্গে গোপনে দেখা করত হয়ত। এবার বাকিটা সহজ। রমা এখানে এসে কোনও ভাবে ওকে আবিষ্কার করুক, কিংবা রাখী নিজেই রমাকে একা পেয়ে মুখোমুখি চার্জ করার সুযোগ নিক কিছু একটা ঘটেছিল।
–ঠিক বলেছেন কর্নেল। আমার মনে পড়ছে যখন জাল রাখীকে ঘরে রেখে আমি নীচে এসেছি, হঠাৎ ওই মেয়েটি কখন ওপরে চলে গিয়েছিল।
–তাহলে বোঝা যাচ্ছে, রাখীই গিয়েছিল রমার কাছে। রমা কোনও অজুহাতে তাকে তার নিজের ঘরে নিয়ে যায় এবং ব্যালকনিতে গিয়ে বোঝাপড়া করার অছিলায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় সমুদ্রে।
ইস্! কী সাংঘাতিক মেয়ে।
ব্যাপারটা প্রথমে টের পাই, রাখীর পড়ে যাওয়া ব্যাগে আপনার কিছু চিঠি দেখে। মুহূর্তে অনেকটা বুঝতে পারি কী ঘটেছে। দ্বিতীয় আবিষ্কার–মিসেস জেভিয়ারের ফিরে পাওয়া নেকলেস–যা নকল!
নকল!
–হ্যাঁ! ওটা নকলই। আসলটা রমা মেরে দিয়েছিল এবং নকলটা …
বলছি। সে আমাকে ভুল বুঝিয়ে সিঁড়ির মুখে পাহারা দিতে বলল, এবং নেকলেসটা রাখতে গেল। আঃ, তখনই সন্দেহ করা আমার উচিত ছিল। কারণ। তেতলার ঘরের চাবি…
–চাবি কোনও প্রশ্ন নয় ওর কাছে। দেখবেন, কবে ওই তালার ছাঁচ নিয়ে গিয়ে চাবি তৈরি করিয়ে নিয়েছিল। ধরা পড়ে যাবে। আর কয়েকটা মিনিট পর দেখতে পারবেন আপনার জাল প্রেমিকাকে!
কর্নেল হাসতে লাগলেন। আমার মন দুঃখে ভেঙে পড়ছিল। হায় রাখী! চিঠিতে অত গভীর প্রেম আর সৌন্দর্যময় ব্যক্তিত্বের প্রমাণ দিয়েছিলে–বাস্তবে তুমি যাই হও, তোমাকে মনেপ্রাণে বরণ করে নিতে এতটুকু বাধত না!
কর্নেল বললেন–দুঃখ হওয়া স্বাভাবিক গৌতমবাবু। আপনারা সাহিত্যিকরা অনুভূতিপ্রবণ মানুষ। কিন্তু তত চালাকচতুর নন। প্র্যাকটিকাল হওয়া আপনাদের ধাতে নেই।
এমন সময় সেই গুঁফো সেন দৌড়ে এল–কর্নেল! আসামী ধরা পড়েছে। আসল নেকলেস আর একগোছ চাবি পাওয়া গেছে। পিস্তল ছোঁড়ার চেষ্টা করেছিল কী সাংঘাতিক মেয়ে!
কর্নেল বললেন–এই যে আলাপ করিয়ে দিই–বহরমপুরের ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর রমেন সেন। ইনিই রমাকে সারা পথ ফলো করে এসেছিলেন!
